জাতীয়

উচ্চ শুল্ক দিয়ে শিল্প রক্ষা সম্ভব নয়: এফবিসিসিআই প্রশাসক

  প্রতিনিধি ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ , ৯:২১:২৪ প্রিন্ট সংস্করণ

শুধু উচ্চ শুল্ক ও কৃত্রিম প্রশাসনিক বিধিনিষেধ দিয়ে দেশীয় শিল্পকে দীর্ঘদিন টিকিয়ে রাখা বা বিশ্ববাজারে টেকসই করা সম্ভব নয় বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন বাংলাদেশ ফেডারেশন অব চেম্বারস অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) প্রশাসক মো. ফজলুল হক। তিনি বলেন, অভ্যন্তরীণ শিল্পের সুরক্ষার পাশাপাশি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা অর্জন এবং ব্যবসা পরিচালনার সার্বিক পরিবেশ সহজ করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।

আজ মঙ্গলবার পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআরআই) ও বিশ্বব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এক জাতীয় কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ‘বাংলাদেশের বাণিজ্যনীতি এক সন্ধিক্ষণে: জাতীয় শুল্কনীতি, এলডিসি উত্তরণ এবং পরবর্তী প্রজন্মের বাণিজ্য চুক্তির প্রমাণভিত্তিক বিশ্লেষণ’ শীর্ষক এ সেমিনারে দেশের শীর্ষ নীতিনির্ধারক, ব্যবসায়ী নেতা, অর্থনীতিবিদ ও উন্নয়ন সহযোগীরা অংশ নেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পিআরআই-এর চেয়ারম্যান ড. জাইদী সাত্তার।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে এফবিসিসিআই প্রশাসক দেশের সামগ্রিক বাণিজ্য চিত্র তুলে ধরে বলেন, ‘শুল্ক সংস্কার যে প্রয়োজন, তা নিয়ে দ্বিমত নেই। কিন্তু শুধু শুল্ক কাঠামোর পরিবর্তন এনেই কি বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব? কখনোই তা যথেষ্ট নয়।’

বাস্তব চিত্র তুলে ধরে তিনি উল্লেখ করেন, শিল্পে বিনিয়োগ ও সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহের অভাব, অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং অর্থায়নের চড়া ব্যয় এখনও সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গ্যাস ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের অভাবে কারখানাগুলোর উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহার নতুন বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করছে। এসব মৌলিক কাঠামোগত দুর্বলতা দূর না করে কেবল শুল্ক পুনর্বিন্যাস করলে দেশীয় শিল্প কাঙ্ক্ষিত সুফল পাবে না।

সরকারের বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা এবং হঠাৎ নীতিগত পরিবর্তন ব্যবসায়ীদের চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দিচ্ছে বলে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন মো. ফজলুল হক। সাম্প্রতিক এক উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, বন্ড লাইসেন্সের বিপরীতে তুলা সুতা আমদানি সীমিত করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে একটি কাস্টমস এসআরও জারি করা হয়েছে। অথচ তৈরি পোশাক খাতের দুই শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ-র ভাষ্য মতে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে এ সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিক বৈঠকে এমন কোনো সিদ্ধান্ত বা আলোচনা হয়নি।

মো. ফজলুল হক বলেন, এক দপ্তর সিদ্ধান্ত নেয় অথচ অংশীজন বা অন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় তা জানে না—এমন প্রক্রিয়া নীতিনির্ধারণের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করে। ব্যবসায়ীদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়ার সুযোগ দিতে নীতি প্রণয়নে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও আগাম সতর্কবার্তা নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।

স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণ এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষরের ক্ষেত্রে বেসরকারিখাতের সর্বাত্মক অংশগ্রহণের ওপর জোর দেন তিনি।

কর্মশালায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশ্বব্যাংকের ম্যাক্রোইকোনমিক্স, ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট বিভাগের সিনিয়র ইকোনমিস্ট ড. নোরা ডিহেল। তিনি তার গবেষণায় দেখান, অতিরিক্ত প্যারা-ট্যারিফ (নিয়ন্ত্রণমূলক ও সম্পূরক শুল্ক) দেশে ব্যবসা পরিচালনার খরচ প্রায় দ্বিগুণ করে দিচ্ছে।

ড. নোরা বলেন, ২০২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের বাণিজ্য-ভারযুক্ত গড় এমএফএন (মোস্ট ফেভার্ড নেশন) শুল্ক ছিল ৭ শতাংশ। তবে নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক (আরডি) ও সম্পূরক শুল্ক (এসডি) যুক্ত হওয়ার পর নামমাত্র সুরক্ষার হার দাঁড়িয়েছে ১৫ দশকি ৪ শতাংশে। বিশেষ করে জুতা, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাথর, কাচ এবং পরিবহন সরঞ্জাম খাতে মূল শুল্কের ওপর অতিরিক্ত ২০ থেকে ৪৫ শতাংশ পয়েন্ট পর্যন্ত প্যারা-ট্যারিফ চাপানো রয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, শুধু চূড়ান্ত পণ্য নয়, উৎপাদনের কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী উপকরণের ওপরও চড়া শুল্ক থাকায় রপ্তানিকারকদের উৎপাদন ব্যয় অস্বাভাবিক বেড়ে যাচ্ছে এবং তারা বৈশ্বিক বাজারে দরকষাকষির সক্ষমতা হারাচ্ছে। তাই মধ্যবর্তী পণ্যে শুল্ক কমানো এবং ধাপে ধাপে প্যারা-ট্যারিফ প্রত্যাহারের মাধ্যমে একটি সমন্বিত কর ব্যবস্থার সুপারিশ করেন তিনি।

সভাপতির বক্তব্যে পিআরআই চেয়ারম্যান ড. জাইদী সাত্তার বলেন, বাংলাদেশের জন্য আর হাত গুটিয়ে বসে থাকার কোনো অবকাশ নেই। গত ২৫ বছরে জমে থাকা সংস্কারের বড় এজেন্ডাগুলো এখন বাস্তবায়ন করতে হবে। নব্বইয়ের দশকের অভিজ্ঞতা বলে, সাহসী সংস্কার কখনো রাজস্ব কমায় না; বরং জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান বাড়ায়।

বাণিজ্যনীতির গভীর ক্ষত তুলে ধরে তিনি বলেন, মাত্রাতিরিক্ত শুল্ক সুরক্ষার কারণে তৈরি পোশাকের বাইরে অন্য যেকোনো পণ্য স্থানীয় বাজারে বিক্রি করা বৈশ্বিক বাজারে রপ্তানি করার চেয়ে অনেক বেশি লাভজনক। এই বড় ব্যবধানটি অর্থনীতিতে এক মারাত্মক ‘রপ্তানি-বিরোধী পক্ষপাত’ (অ্যান্টি-এক্সর্পোট বায়াস) তৈরি করে রেখেছে, যার ফলে পোশাক খাতের বাইরে রপ্তানি বহুমুখীকরণ সম্ভব হচ্ছে না।

ড. সাত্তার প্রস্তাব করেন, ২০২৯ সালের মধ্যে নিয়ন্ত্রণমূলক ও সম্পূরক শুল্ক বিলোপ করে সর্বোচ্চ কাস্টমস ডিউটি ১৫ শতাংশ এবং সম্পূরক শুল্ক ১০ শতাংশে নামিয়ে বাণিজ্য-নিরপেক্ষ পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। তিনি আরও সতর্ক করেন, বর্তমান উচ্চ শুল্ক কাঠামো বহাল রেখে অন্য দেশের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ এফটিএ করা সম্ভব নয়; সেক্ষেত্রে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ বা সিইপিএ) করা তুলনামূলক বাস্তবসম্মত হতে পারে।

পিআরআই-এর পলিসি ফেলো ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে এখন আমূল ও সাহসী সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই। তিনি বলেন, ‘আগামী পাঁচ বছরে ধাপে ধাপে সব ধরনের কাস্টমস ডিউটি বিলোপ করলে দেশের বড় কোনো বিপর্যয় হবে না। এতে হয়তো সাময়িকভাবে ৩ বিলিয়ন ডলারের শুল্ক রাজস্ব হারাতে হতে পারে, কিন্তু ৪০০ থেকে ৫০০ বিলিয়ন ডলারের একটি বড় অর্থনীতিতে এই ৩ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করতে গিয়ে যে ভোগান্তি ও অর্থনৈতিক অপচয় হয়, তার ক্ষতি প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলারের সমান।’

সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, সুরক্ষামূলক প্যারা-ট্যারিফের বিকল্প হিসেবে কাস্টমস শুল্ক বা অভ্যন্তরীণ কর কাঠামো ব্যবহার করা উচিত। শুল্ক কমানোর ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) এবং শ্রমবাজারের ক্ষতি সামাল দিতে একটি পর্যায়ক্রমিক রূপরেখা প্রণয়ন জরুরি।

সানেম-এর নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান বলেন, ইইউ কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট মেকানিজমসহ (সিবিএএম) আন্তর্জাতিক টেকসই মানদণ্ড অর্জনে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. নাজনীন আহমেদ দক্ষ মানবসম্পদ ও প্রযুক্তিকে অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখার আহ্বান জানান।

সমাপনী বক্তব্যে পিআরআইয়ের নির্বাহী পরিচালক ড. খুরশীদ আলম বলেন, শুল্ক সংস্কার একা কোনো জাদুকরী সমাধান নয়। শিক্ষা, আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান এবং ব্যবসা পরিচালনায় সার্বিক সহজীকরণ না হলে এই সংস্কারের পূর্ণ সুফল অর্জন করা সম্ভব হবে না।

আরও খবর

Sponsered content