জাতীয়

বালুতে মূল্যবান খনিজের খোঁজে পরমাণু শক্তি কমিশন

  প্রতিনিধি ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ , ৯:৩৮:৩৯ প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের নদী ও উপকূলের বালুতে থাকা মূল্যবান খনিজের সম্ভাবনা যাচাইয়ে নতুন করে অনুসন্ধানে যাচ্ছে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন (বিএইসি)। ভোলা, পটুয়াখালী ও নোয়াখালীর বিভিন্ন এলাকায় বালুর নমুনা সংগ্রহ করে খনিজের ধরন, পরিমাণ ও মান যাচাই করা হবে। পাশাপাশি এসব খনিজ আলাদা করা এবং শিল্পে ব্যবহারের উপযোগী করার প্রযুক্তি নিয়েও গবেষণা হবে।

এ কাজে বেসরকারি অংশীদার হিসেবে যুক্ত হয়েছে অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক এভারলাস্ট মিনারেলস লিমিটেড (ইএমএল)। আজ মঙ্গলবার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে তিন বছরের সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করেছে বিএইসি। কমিশনের চেয়ারম্যান ড. এম. মঈনুল ইসলাম ও এভারলাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দেলোয়ার হোসাইন টিটু নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এতে সই করেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন।

এভারলাস্টের জন্য বাংলাদেশে খনিজ বালু নিয়ে কাজ অবশ্য নতুন নয়। ২০২৪ সালের ২০ জুন খনিজসম্পদ উন্নয়ন ব্যুরোর (বিএমডি) সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির ১০ বছরের খনি ইজারা চুক্তি হয়। এর আওতায় গাইবান্ধা সদর ও ফুলছড়ি উপজেলার ব্রহ্মপুত্র-যমুনা অববাহিকা ও চর এলাকায় তিনটি ব্লকে প্রায় ২ হাজার হেক্টর জমিতে ভারী খনিজ বালু নিয়ে কাজের সুযোগ পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। চুক্তিটির মেয়াদ ২০৩৪ সালের ১৯ জুন পর্যন্ত।

গাইবান্ধার পর এভারলাস্টের কার্যক্রম উত্তরাঞ্চলে আরও বিস্তৃত হয়েছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে কুড়িগ্রামে প্রায় ৪ হাজার হেক্টর এলাকায় খনিজ অনুসন্ধানের জন্য প্রতিষ্ঠানটিকে লাইসেন্স দেওয়ার তথ্য রয়েছে। নতুন সমঝোতার ফলে এবার দেশের দক্ষিণাঞ্চলের নদী ও উপকূলীয় এলাকাতেও প্রতিষ্ঠানটির গবেষণার সুযোগ তৈরি হলো।

সমঝোতা অনুযায়ী, ভোলা, পটুয়াখালী ও নোয়াখালীর বিভিন্ন এলাকায় মাঠপর্যায়ে বালুর নমুনা সংগ্রহ করা হবে। এসব নমুনা পরীক্ষা করে এর ভৌত ও রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য এবং খনিজের গঠন নির্ণয় করা হবে। ইলমেনাইট, রুটাইল, জিরকন, গারনেট ও ম্যাগনেটাইটের মতো ভারী খনিজের উপস্থিতি ও গুণমানও যাচাই করা হবে।

বাংলাদেশের বিভিন্ন উপকূলীয় ও নদী অঞ্চলের বালুতে এসব ভারী খনিজের উপস্থিতি আগে গবেষণায় উঠে এসেছে। এর মধ্যে জিরকন সিরামিক, স্যানিটারি পণ্য ও কাচ শিল্পে ব্যবহৃত হয়। ইলমেনাইট থেকে টাইটানিয়াম ডাই-অক্সাইড তৈরি করা হয়, যা রং, প্লাস্টিক ও কাগজ শিল্পে লাগে। গারনেট ও অন্যান্য ভারী খনিজেরও শিল্পে ব্যবহার রয়েছে।

নতুন উদ্যোগে শুধু খনিজের সন্ধান বা নমুনা পরীক্ষা নয়, বালু থেকে খনিজ আলাদা করার পদ্ধতি, মান উন্নয়নের প্রযুক্তি এবং শিল্পে ব্যবহারের সম্ভাবনাও যাচাই করা হবে। দেশের শিল্পের প্রয়োজন অনুযায়ী এসব খনিজ কীভাবে কাজে লাগানো যায়, সে বিষয়েও যৌথ গবেষণা করবে দুই পক্ষ।

বিএইসির পক্ষে কাজগুলো বাস্তবায়ন করবে ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার জিওলজিক্যাল সায়েন্সেস (আইএনজিএস)। সংগৃহীত নমুনা কমিশনের নিজস্ব গবেষণাগারে বিশ্লেষণ করা হবে। মাঠপর্যায়ে প্রয়োজন হলে এভারলাস্ট আধুনিক হাইড্রলিক কোর ড্রিল রিগ ও নৌযান সরবরাহ করবে। এভারলাস্টের অনুসন্ধান ও খনন প্রকল্প এবং খনিজ বালু প্রক্রিয়াজাতকরণ প্ল্যান্ট পরিদর্শনের সুযোগও পাবেন কমিশনের প্রতিনিধিরা।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, প্রাকৃতিক সম্পদের বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবহার নিশ্চিত করতে সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারিখাতের অংশীদারত্ব জরুরি। এই সমঝোতার মাধ্যমে খনিজ বালুর সম্ভাবনা যাচাই, প্রযুক্তি উন্নয়ন ও শিল্পে ব্যবহারযোগ্যতা পরীক্ষার ভিত্তি তৈরি হয়েছে।

দেশে খনিজ বালুর অনুসন্ধান অবশ্য কয়েক দশকের পুরোনো। বিএইসি ১৯৬৭ সাল থেকে উপকূলীয় এলাকায় এ নিয়ে কাজ করছে। কক্সবাজার ও আশপাশের উপকূলে ১৭টি ভারী খনিজের মজুদের সন্ধান পাওয়ার তথ্য রয়েছে। অন্যদিকে, দেশের প্রধান নদ-নদীর বালুতেও মূল্যবান খনিজের উপস্থিতি যাচাইয়ে বিভিন্ন সময়ে জরিপ চালিয়েছে বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর।

তবে সম্ভাবনা থাকলেও এসব খনিজের বড় পরিসরে বাণিজ্যিক ব্যবহার এখনও সীমিত। কোথায় কী পরিমাণ মজুদ রয়েছে, উত্তোলন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কতটা লাভজনক এবং পরিবেশের ওপর এর প্রভাব কী হতে পারে—এসব বিষয় নিশ্চিত করেই বাণিজ্যিক উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। নতুন গবেষণায় সেই সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে আরও নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

তিন বছরের এই সমঝোতা পরে দুই পক্ষের লিখিত সম্মতিতে নবায়ন করা যাবে। এটি কোনো ব্যবসায়িক চুক্তি নয়; দেশের খনিজ বালুর গবেষণা, প্রযুক্তি উন্নয়ন ও শিল্পে ব্যবহার বাড়ানোর পথ তৈরি করাই এর মূল লক্ষ্য।

আরও খবর

Sponsered content