উলিপুর (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি ৭ জানুয়ারি ২০২৬ , ৬:১৫:৫৯ প্রিন্ট সংস্করণ
কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার ৯নং গুনাইগাছ ইউনিয়ন পরিষদে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম, দায়িত্বহীনতা ও চরম অব্যবস্থাপনার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, ইউনিয়ন পরিষদের সচিব মোছাঃ ববি পারভিনের সরকারি আইডি ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণ করছেন হিসাব সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর নাজমুল হুদা, যার ফলে জন্ম নিবন্ধনসহ বিভিন্ন নাগরিক সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ইউনিয়ন পরিষদের সচিবের মূল দায়িত্ব জন্ম নিবন্ধন, মৃত্যু সনদ, ট্রেড লাইসেন্স, ওয়ারিশ সনদসহ গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক সেবা সময়মতো প্রদান করা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ইউপি সচিব নিয়মিত অফিসে উপস্থিত থাকছেন না এবং সেবা কার্যক্রমে চরম অনীহা দেখাচ্ছেন। অভিযোগ রয়েছে, সচিবের অনুপস্থিতিতে সাবেক ইউপি সচিব নুরুন নবী সরকার কার্যত দায়িত্ব পালন করছেন, যদিও তার কোনো বৈধ নিয়োগ বা প্রশাসনিক দায়িত্ব নেই।
এ বিষয়ে নুরুন নবী সরকারের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন,“আমি শুধু সচিব ও সহকারীদের কাজে হেল্প করি।”
কাজের বিনিময়ে কোনো সম্মানী পান কি না—এ প্রশ্নে তিনি বলেন, “কিছুই পাই না, কোনো প্রজেক্ট এলে কাজ করি।”
এদিকে অভিযোগ রয়েছে, জন্ম সনদ, মৃত্যু সনদ, ট্রেড লাইসেন্স ও উত্তরাধিকার সনদসহ বিভিন্ন সেবায় নির্ধারিত সরকারি ফি’র চেয়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে টাকা নেওয়ার পরও দিনের পর দিন সেবাগ্রহীতাদের ঘোরানো হচ্ছে।
ভুক্তভোগীদের দাবি, ইউপি সচিব সপ্তাহে এক বা দুই দিনের বেশি অফিসে আসেন না। দেরিতে আসা, হাজিরা দিয়ে চলে যাওয়া এবং সেবাগ্রহীতাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার যেন নিত্যদিনের চিত্র।
সরেজমিনে গত রবিবার (৪ জানুয়ারি) দুপুর ১টার দিকে ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে দেখা যায়, পরিষদের সব কক্ষ তালাবদ্ধ। বহু সেবাগ্রহীতা পরিষদের বারান্দায় অপেক্ষা করছিলেন। ওই সময় ইউপি সচিব কিংবা হিসাব সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর—কেউই উপস্থিত ছিলেন না।
কিছুক্ষণ পর ইউপি সচিব এসে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করে আবার চলে যান। অপরদিকে, নাজমুল হুদার নাম ২০২৬ সালের চলতি মাসে হাজিরা খাতায় উঠেনি, নেই কোনো স্বাক্ষরও।
নিয়মিত অফিসে না আসার বিষয়ে জানতে চাইলে ইউপি সচিব বলেন,“আমার উপজেলায় স্যার আছেন, সেখানে কাজ করতে হয়।”
সেবাগ্রহীতারা সেবা পাচ্ছেন না—এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “সব কাজ নাজমুলকে দেওয়া হয়েছে।”
নাজমুল কয়েকদিন ধরে অনুপস্থিত থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে ইউপি সচিব জানান, তিনি ফোন করেছেন কিন্তু নম্বর বন্ধ পেয়েছেন।
নাজমুল হুদার বিরুদ্ধে অতিরিক্ত টাকার বিনিময়ে জন্ম নিবন্ধন অনলাইন করে দেওয়া এবং টাকা নিয়েও দিনের পর দিন কাজ না করার অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে মন্তব্য চাইলে ইউপি সচিব বলেন,“কেউ অবৈধভাবে কাজ করলে তার দায়ভার তাকেই নিতে হবে।”
তবে সচিব নিজেই স্বীকার করেন, তার সরকারি আইডি নাজমুল ব্যবহার করছেন। আইডি ব্যবহার ও অনিয়মিত উপস্থিতি বিষয়ে সুনির্দিষ্ট জবাব না দিয়ে তিনি ব্যস্ততার অজুহাতে এড়িয়ে যান।সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগের শেষ নেই।
গুনাইগাছ কেবলকৃষ্ণ এলাকার মোছাঃ মেনেকা বেগম বলেন,“এক মাস ধরে জন্ম নিবন্ধনের জন্য ঘুরছি। রবিবার এসে দেখি অফিস তালাবদ্ধ।”
একই এলাকার মোঃ শহিদুল রহমান বলেন,“ওয়ারিশ সনদের জন্য কয়েকদিন ঘুরছি, আজও পাইনি।”
৯নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা উম্মে সালমা বলেন,“পাঁচ দিন আসার পর আজ ট্যাক্সের রশিদ পেয়েছি।”
জুম্মার হাট রামধন এলাকার মোছাঃ আনজুনা বেগম অভিযোগ করেন,“নাজমুলকে ২০০ টাকা দিয়েছি, ১৫ দিনেও কাজ হয়নি।”
দূরবর্তী মহিদেব এলাকা থেকে আসা শাহিনুর বেগম বলেন,“জন্ম নিবন্ধনের জন্য ৬০০ টাকা দাবি করা হয়েছে। ৪০০ দিয়েছি, তবু কাজ হয়নি।”
এ বিষয়ে গুনাইগাছ ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক কেএম মাসুদুর রহমান জানান, সচিব ও হিসাব সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটরের অনুপস্থিতির বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও জেলা প্রশাসককে অবহিত করা হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহামুদুল হাসান বলেন, “বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে শোকজসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”




















