সোহেল খান দূর্জয় নেত্রকোনা প্রতিনিধি ৩০ অক্টোবর ২০২৬ , ৩:১০:১৬ প্রিন্ট সংস্করণ
নেত্রকোনা, ৩০ অক্টোবর: প্রচণ্ড খরা, অনাবৃষ্টি ও জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাবে নেত্রকোনায় কমে যাচ্ছে নারিকেল ও সুপারিগাছের সংখ্যা। ফলন কমে যাওয়ায় অনেক গাছ শুকিয়ে মারা যাচ্ছে। একসময় বাড়ির আঙিনা, উঠানের ধারে ও জমির আইলে সারি সারি নারিকেল-সুপারিগাছ দেখা গেলেও এখন সেই দৃশ্য ক্রমেই বিরল হয়ে উঠছে। এর প্রভাব পড়েছে বাজারেও। বেড়েছে নারিকেল ও সুপারির দাম।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, আগে এলাকার অনেক বাড়িতেই নারিকেল ও সুপারিগাছ ছিল। সারা বছর এসব গাছ থেকে ডাব, নারিকেল ও সুপারি পাওয়া যেত। প্রতিবেশী কিংবা অতিথি এলে পান-সুপারি দিয়ে আপ্যায়ন করা ছিল গ্রামবাংলার প্রচলিত রীতি। কিন্তু গাছের সংখ্যা ও ফলন কমে যাওয়ায় সেই পরিচিত চিত্র বদলে যাচ্ছে।
নেত্রকোনা পৌর শহরের মাছুয়া বাজারের পান-সুপারির দোকানগুলোতে প্রতি পিস সুপারি ১০ টাকা দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে। ফলে দৈনন্দিন অভ্যাসের অংশ হিসেবে পান-সুপারি খাওয়াও অনেকের জন্য ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে।
শহরের সুপারি ও নারিকেল বিক্রেতা কপিল উদ্দিন বলেন, একসময় গ্রামে সারি সারি নারিকেল ও সুপারিগাছ ছিল। এসব গাছে প্রচুর ডাব, নারিকেল ও সুপারি ধরত। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে অতিরিক্ত খরায় গাছ শুকিয়ে মারা যাচ্ছে। যেসব গাছ এখনো টিকে আছে, সেগুলোতেও ফলন কম। অনেক সময় ফল পরিপক্ব হওয়ার আগেই ঝরে পড়ে।
কপিল উদ্দিন বলেন, ‘৫ বছর আগেও সুপারি বিক্রি করে বাজারসদাই করে চলতাম। কিন্তু এখন আমি নিজেই নারিকেল, সুপারি কিনে খাই। ১ গা (১০টা) সুপারির দাম অহন বাজারে ১শ’ টাহা। আমরা কিভাবে বাপ-দাদার পুরানা অভ্যাস বদলামু।’
কলমাকান্দা উপজেলার রংছাতী ইউনিয়নের পাঁচগাঁও গ্রামের বাসিন্দা আজাহার উদ্দিন বলেন, আগে খাল-বিল ও নদ-নদীতে প্রচুর পানি থাকত। আবহাওয়াও ছিল তুলনামূলক আর্দ্র। এখন খরা ও অনাবৃষ্টির কারণে মাটিতে পানির ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এতে নারিকেল ও সুপারিগাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে এলাকায় এসব গাছ লাগানোর আগ্রহও কমছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ফসলি জমিতে সেচের ব্যবস্থা করা সম্ভব হলেও বাড়ির আঙিনা কিংবা পতিত জমির গাছগুলোতে নিয়মিত পানি দেওয়ার সুযোগ অনেকের ছিল না। ফলে দীর্ঘদিন বৃষ্টির অভাব ও মাটির আর্দ্রতা কমে যাওয়ায় অনেক গাছ শুকিয়ে গেছে। গ্রীষ্মের খরা ও শীতের ঘন কুয়াশার প্রভাবেও গাছের স্বাস্থ্য ও ফলন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে তাঁরা মনে করেন।
নেত্রকোনা শহরের নারিকেল ব্যবসায়ী ইসমাইল হোসেন বলেন, দীর্ঘদিনের খরা ও অনাবৃষ্টিতে এলাকার নারিকেলগাছের ক্ষতি হয়েছে। ফলে ডাব, নারিকেল ও সুপারি আগের মতো পাওয়া যাচ্ছে না।
তিনি জানান, এবারের মৌসুমে কয়েক দফা বৃষ্টির পর কিছু গাছে নতুন করে ডাবের কড়ি ও সুপারির বাদা দেখা গেছে। তবে এসব ফল শেষ পর্যন্ত গাছে টিকে থাকবে কি না, তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। ইঁদুরের উপদ্রবেও ফল নষ্ট হচ্ছে বলে তিনি জানান।
নেত্রকোনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আমিরুল ইসলাম বলেন, জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাব নারিকেল ও সুপারিগাছের ফলনে পড়েছে। এর প্রভাব বর্তমান বাজারেও দেখা যাচ্ছে। টাকা দিয়েও আগের মতো সহজে নারিকেল ও সুপারি পাওয়া যাচ্ছে না।
স্থানীয়দের মতে, নারিকেল ও সুপারিগাছের সংখ্যা এবং ফলন কমে যাওয়ায় শুধু কৃষি ও ব্যবসা নয়, গ্রামীণ জীবনযাত্রার পরিচিত একটি ঐতিহ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় গাছের উপযোগী পরিচর্যা, পানির ব্যবস্থা এবং জলবায়ু সহনশীল চাষাবাদ পদ্ধতি নিয়ে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।





















