সারাদেশ

‘জিনের কাজ’ অপপ্রচারে আড়াল কিশোরী ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড: মাধবপুরে বিচারহীনতার অভিযোগ

  মাধবপুর (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধি ১৮ জানুয়ারি ২০২৬ , ৪:১২:৪৬ প্রিন্ট সংস্করণ

 

হবিগঞ্জের মাধবপুরে ২০২৩ সালে সংঘটিত এক কিশোরী ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডকে ‘জিনের কাজ’ বলে অপপ্রচার চালিয়ে মূল অপরাধ আড়াল করার চাঞ্চল্যকর তথ্য নতুন করে আলোচনায় এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, পরিকল্পিত কুসংস্কার ও ভয়ভীতির মাধ্যমে বিচারপ্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করা হয়; উল্টো ভুক্তভোগী পরিবারকেই হয়রানির শিকার হতে হয়।

ঘটনাটি ঘটে মাধবপুর উপজেলার আদাঐর ইউনিয়নের মেহেরপুর গ্রামে। নিহত সুলতানা আক্তার (১৪) মৌজপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী ছিলেন। তিনি ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। ঘটনার পর স্থানীয় একটি প্রভাবশালী মহল এটিকে ‘জিনের মাধ্যমে খুন’ বলে এলাকায় প্রচার চালায়। এমনকি নিহতের পরিবারকেও এই গল্প বিশ্বাসে বাধ্য করার চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ।

নিহতের পরিবার চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করত। সুলতানার বাবা শহীদ মিয়া মানসিক প্রতিবন্ধী এবং মা রেহেনা বেগম কন্যা হারানোর শোকে এখনো মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। রেহেনা বেগম জানান, তিনি কখনোই ‘জিনের গল্প’ বিশ্বাস করেননি; শুরু থেকেই ঘটনাটিকে তিনি হত্যাকাণ্ড হিসেবেই দেখেছেন।

বিষয়টি তৎকালীন হবিগঞ্জের পুলিশ সুপারের নজরে এলে মরদেহ পুনরায় পোস্টমর্টেম করা হয়। তদন্তে ধর্ষণ ও হত্যার আলামত পাওয়া যায়। পুলিশের মামলায় প্রতিবেশী দুইজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালী মহলের চাপ ও হুমকির মুখে মামলার অগ্রগতি থেমে যায়।

নিহতের পরিবার দাবি করে, মামলা তুলে নিতে নিয়মিত হুমকি দেওয়া হয়। এক পর্যায়ে নিরাপত্তাহীনতায় তারা এলাকা ছাড়তে বাধ্য হন। বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরেও ন্যায়বিচারের কোনো অগ্রগতি না পেয়ে শেষ পর্যন্ত তারা আপোষনামায় বাধ্য হন—তবে মামলাটি এখনো নিষ্পত্তি হয়নি।

পরিবারটির অভিযোগ, উল্টো হয়রানির অংশ হিসেবে নিহতের বাবা শহীদ মিয়ার বিরুদ্ধে পাল্টা মামলা করা হয়। এফআইআর নম্বর–১০৭ মামলায় তিনি দীর্ঘদিন ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি হিসেবে পলাতক জীবনযাপন করতে বাধ্য হন।

রেহেনা বেগম বলেন, “আমরা মামলা করেই আজ ফেরারি। রাষ্ট্র আমাদের নিরাপত্তা দেয়নি। তবুও আমরা ন্যায়বিচার চাই।”

শহীদ মিয়া বলেন, “মামলা করাই আমাদের জন্য অপরাধ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমার মেয়ের বিচার রাষ্ট্র করতে পারেনি।”

এ বিষয়ে হিউম্যান রাইটস কংগ্রেস ফর বাংলাদেশ মাইনোরিটিস (এইচআরসিবিএম)–এর সিলেট বিভাগীয় সমন্বয়ক রাকেশ রায় বলেন,

“ধর্ষণ ও হত্যাকে ‘জিনের কাজ’ বলে চালিয়ে দেওয়া এবং পরে ভুক্তভোগী পরিবারকে উল্টো মামলায় হয়রানি—এটি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার গুরুতর ব্যর্থতা। নতুন করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।”

এ বিষয়ে মাধবপুর থানা–র ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মাহবুব মোরশেদ খান বলেন, “বিষয়টি অনেক আগের। ভিকটিম পরিবারের কোনো নিরাপত্তাজনিত সমস্যা হলে আমাদের জানালে আমরা সহযোগিতা করব।”

আরও খবর

Sponsered content