প্রতিনিধি ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫ , ৯:০০:৩৯ প্রিন্ট সংস্করণ
গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর প্রথম জাতীয় নির্বাচনের সামনে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ। তবে ‘প্রতিশোধের রাজনীতির’ চলমান চক্র ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা গণতান্ত্রিক সংস্কারের আশাকে মøান করে দিচ্ছে বলেই মনে করছেন ব্রিটিশ সাংবাদিক জেমস অর। লন্ডনভিত্তিক আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক নিবন্ধে তিনি লিখেছেনÑ বাংলাদেশের এখন দরকার একটি গণতান্ত্রিক ‘রিসেট’। কিন্তু আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন কি তা দিতে পারবে?
কয়েক দশক ধরে চলে আসা ‘প্রতিশোধের রাজনীতি’ থেকে বেরিয়ে এসে গণতান্ত্রিক ধারায় ফেরার চেষ্টায় বাংলাদেশ আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ২০২৪ সালের অগাস্টে (সাবেক প্রধানমন্ত্রী) শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী মুহাম্মদ ইউনূস; ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি রমজান শুরুর আগেই সাধারণ নির্বাচন দেওয়ার জন্য তাঁকে চাপের মুখে পড়তে হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে কয়েক সপ্তাহের আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত হন টানা চারবারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা; তাঁর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ছিল।
বিশ্লেষকদের ধারণা, ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের সবচেয়ে সম্ভাব্য ফল হতে পারে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ক্ষমতায় ফেরা। দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান (৬০) প্রায় দুই দশক ধরে লন্ডনে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন।
জুলাই সনদের গণভোট
নির্বাচনের পর নতুন সরকার আদৌ সংস্কার বাস্তবায়ন করতে পারবে কি না এবং জুলাই সনদে ২৫টি রাজনৈতিক দল যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, সে অনুযায়ী দেশের নির্বাচনব্যবস্থা, সংবিধান ও প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠন করতে পারবে কি না, তা এখনও অনিশ্চিত। এসব সংস্কার অনুমোদনের প্রশ্নে জনসমর্থন যাচাই হবে ফেব্রুয়ারির গণভোটে।
লন্ডনের চ্যাথাম হাউসের এশিয়া-প্যাসিফিক কর্মসূচির দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক জ্যেষ্ঠ গবেষক চিয়েতিগজ বাজপেয়ি বলেন, ‘গত বছর আগস্টে যা ঘটেছিল, যাকে ‘বর্ষা বিপ্লব’ বলা হচ্ছে, অনেকে এটিকে দেশের দ্বিতীয় স্বাধীনতা হিসেবে দেখছেন। কিন্তু আমার মনে হয়, বাস্তবে পরিবর্তনের চেয়ে ধারাবাহিকতাই বেশি থাকবে।’ তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের ইতিহাসজুড়ে প্রায়ই সহিংস প্রতিশোধের রাজনীতি দেখা গেছে, প্রকৃত জাতীয় পুনর্মিলনের দিকে তেমন কোনো অগ্রগতি আমরা দেখিনি। বরং পেন্ডুলামকে এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে দুলতে দেখেছি কেবল।’
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আন্দোলন দমাতে চালানো অভিযানে ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হন, যা ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের পর বাংলাদেশের সবচেয়ে ভয়াবহ সহিংসতা।
লন্ডনের এসওএএস বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক নাওমি হোসেন বলেন, ‘সবচেয়ে সম্ভাব্য ফল হলো বিএনপির জয়, আর জামায়াতে ইসলামী হবে প্রধান বিরোধী দল।’ তবে তিনি এও বলেন, ‘বিএনপি খুবই অজনপ্রিয়। মানুষ নাক চেপে ভোট দেবে। যারা ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকটা মনে করতে পারেন, তাঁরা জানেন দলটি কতটা সহিংস, গুণ্ডামি আর দুর্নীতিতে জড়িত ছিল।’
প্রতিশোধের রাজনীতির চক্র
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতি ধারণা সূচকে গত বছর ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৫১তম, যা বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি। বিশেষজ্ঞদের মতে, শেখ হাসিনার শাসনের আগে রাষ্ট্রের বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান কার্যকর ছিল এবং নির্বাহী বিভাগ থেকে আলাদা অবস্থানে ছিল; এখন আর তা নেই।
এখন দেশের আমলাতন্ত্র এবং একসময়কার স্বাধীনভাবে কাজ করা বহু প্রতিষ্ঠান, যেগুলো শাসন ও জবাবদিহির কিছুটা নিশ্চয়তা দিত, সেগুলো ফাঁপা হয়ে গেছে। সেনাবাহিনী, পুলিশ ও গণমাধ্যমও আওয়ামী লীগের কর্তৃত্ববাদী ঝোঁকের কবলে পড়েছিল।
বাজপেয়ি আরও বলেন, ‘হাসিনা সরকারের সময় আমরা বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর ওপর নিপীড়ন দেখেছি, আর এখন দেখছি আওয়ামী লীগের ওপর শুদ্ধি অভিযান। প্রশ্ন হলোÑ এই চক্র কীভাবে ভাঙা যাবে? আশঙ্কার বিষয় হলো, পুরনো রাজনৈতিক পরিবারতন্ত্র আবার ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠা পেলে মানুষ আরও হতাশ হয়ে পড়বে, আর রাজনীতি আগের পথেই ফিরে যাবে, যা জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মধ্যে কিছুটা দেখা যাচ্ছে।’
অর্থনীতির দিক থেকেও বাংলাদেশের অবস্থা নাজুক। গত দুই দশকে জিডিপি দ্রুত বেড়েছিল, কিন্তু কোভিড মহামারীর পর থেকে প্রবৃদ্ধির গতি কমেছে। দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ সীমিত এবং জ্বালানি পুরোটাই আমদানি করতে হয়। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক থেকে সরে এসে চীন, পাকিস্তান ও তুরস্কের দিকে ঝোঁকাও ঝুঁকিপূর্ণ এক কৌশলগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
নাওমি হোসেন আরও বলেন, ‘বিএনপি জিতুক বা না জিতুক, তারা আওয়ামী লীগের স্বজনপ্রীতিপূর্ণ পুঁজিবাদের মডেল অনুসরণ করবে কি না- তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে তাদের সংযত হওয়ার একমাত্র বড় অনুঘটক হতে পারে আরেকটি গণ-অভ্যুত্থানের আশঙ্কা, এর বাইরে আসলে তেমন কিছু নেই।’















