সারাদেশ

মোহনগঞ্জে হারিয়ে গেছে দেওরাজান নদ, বালুচরে পরিণত হাওরের একসময়ের প্রাণধারা

  নেত্রকোনা প্রতিনিধি | সোহেল খান দূর্জয় ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ , ৮:০০:০১ প্রিন্ট সংস্করণ

নেত্রকোনা জেলার মোহনগঞ্জ উপজেলার ডিঙাপোতা হাওরের বুক চিরে একসময় নীরবে বয়ে চলত দেওরাজান নদ। আজ সেখানে আর ঢেউ নেই, নেই পানির কলকল ধ্বনি। সরেজমিনে দেখা যায়, মোহনগঞ্জ উপজেলার তেঁতুলিয়া বাজারের পূর্ব পাশে নদটির স্থানে এখন বিস্তীর্ণ বালুচর। সময়ের ব্যবধানে নদটি যেন নিজের নামই হারিয়েছে—স্থানীয়দের কাছে এটি এখন পরিচিত ‘দেওরাজান বালুচর’ নামে।

স্থানীয়রা জানান, নদের বুকে এখন গরু চরানো হয়, চলাচল করে নানা যানবাহন। বয়স্কদের ভাষ্য, এই বালুর নিচেই চাপা পড়ে আছে একটি নদ ও হাওরজীবনের ইতিহাস। তেঁতুলিয়া ইউনিয়নের দত্তখিলা নদ থেকে জলটুনাই পর্যন্ত প্রায় ৪–৫ কিলোমিটার দীর্ঘ দেওরাজান নদ একসময় ছিল গভীর ও প্রাণবন্ত। ২৫–৩০ বছর আগেও নদের গভীরতা ছিল ১৫–২০ ফুট। বর্ষায় পানিতে ভরে থাকত নদ, শুষ্ক মৌসুমেও ছিল স্বাভাবিক প্রবাহ।

দেওরাজান নদের পানিতেই ডিঙাপোতা হাওরের কয়েক হাজার একর বোরো জমিতে সেচ দেওয়া হতো। জেলেরা জাল ফেলতেন, গবাদিপশু নামানো হতো গোসলের জন্য, নৌকায় পরিবহন করা হতো কৃষিপণ্য। কিন্তু সময়মতো খনন না হওয়ায় ধীরে ধীরে পলি জমে নদটি ভরাট হয়ে যায়। এখন নদ যেখানে ছিল, সেখানে শুধু বালু আর বালু।

নদ হারিয়ে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে হাওরের কৃষিতে। নদে পানি না থাকায় কৃষকেরা বাধ্য হয়ে অগভীর সেচপাম্পের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানি তুলছেন। এতে উৎপাদন খরচ বাড়ার পাশাপাশি দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে পানির স্তর। তেঁতুলিয়া গ্রামের প্রবীণ কৃষক আলী হোসেন বলেন, “এই নদ ছাড়া হাওর কল্পনাই করা যেত না। চোখের সামনে নদটা মরে গেল, আমরা কিছুই করতে পারলাম না।” একই গ্রামের আরেক প্রবীণ তোতা মিয়া বলেন, “খননের অভাবে ধীরে ধীরে পলি জমে নদটি ভরাট হয়ে গেছে। তরুণ প্রজন্ম নদটির নামই ভুলে যাচ্ছে।”

হাওরের পরিবেশ ও প্রতিবেশবিষয়ক বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিক-এর আঞ্চলিক সমন্বয়ক ওহিদুর রহমান বলেন, দেওরাজান শুধু একটি জলধারা ছিল না; এটি ছিল একটি জীবন্ত বাস্তুতন্ত্র। নদটি খনন করে পূর্বের নাব্যতা ফিরিয়ে আনলে হাওরের জীববৈচিত্র্য রক্ষা পাবে, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমবে এবং কৃষকেরাও উপকৃত হবেন।

এ বিষয়ে মোহনগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আমেনা খাতুন বলেন, “পানি উন্নয়ন বোর্ড-এর কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হবে। ভূমি কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করে নদটির সীমানা নির্ধারণ ও খননের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শাখাওয়াত হোসেন বলেন, “উপসহকারী প্রকৌশলীদের মাধ্যমে নদের অবস্থান যাচাই করে খননের বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”

আরও খবর

Sponsered content