প্রতিনিধি ২৭ আগস্ট ২০২৬ , ২:১৯:৫৯ প্রিন্ট সংস্করণ
হলিউডের পর্দা ও মঞ্চের এক বর্ণময় অধ্যায়ের অবসান হলো। প্রয়াত হয়েছেন ব্রিটিশ অভিনেতা, গায়ক ও ভয়েস পারফর্মার টিম কারি। ‘দ্য রকি হরর পিকচার শো’-এর ড. ফ্র্যাঙ্ক-এন-ফার্টার এবং ‘ইট’-এর ভয়ংকর পেনিওয়াইজ চরিত্রে অভিনয় করে বিশ্বজুড়ে খ্যাতি পাওয়া এই শিল্পী ২৫ আগস্ট ২০২৬, ৮০ বছর বয়সে লস অ্যাঞ্জেলেসের তুলুকা লেকে নিজ বাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার মৃত্যুর কারণ প্রকাশ করা হয়নি।
টিম কারির অভিনয়জীবন বিস্তৃত ছিল প্রায় পাঁচ দশকজুড়ে। মঞ্চ, সিনেমা, টেলিভিশন, ভয়েস অ্যাক্টিং- প্রায় প্রতিটি মাধ্যমেই নিজের আলাদা ছাপ রেখে গেছেন তিনি। শারীরিক অসুস্থতার মধ্যেও জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত সৃজনশীল কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এই অভিনেতা। ২০১২ সালে গুরুতর স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার পর তার চলাফেরায় স্থায়ী সমস্যা তৈরি হয় এবং তিনি হুইলচেয়ারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। তবু অভিনয়ের জগৎ থেকে পুরোপুরি সরে যাননি।
১৯৬৮ সালে লন্ডনের মঞ্চে ‘হেয়ার’ মিউজিক্যালের মাধ্যমে পেশাদার অভিনয়জীবন শুরু করেন কারি। কয়েক বছর পর রিচার্ড ও’ব্রায়েনের ‘দ্য রকি হরর শো’-তে ড. ফ্র্যাঙ্ক-এন-ফার্টার চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান তিনি। ১৯৭৩ সালে লন্ডনের মঞ্চে চরিত্রটি প্রথম দর্শকদের সামনে আসে।
দুই বছর পর নাটকটির চলচ্চিত্র সংস্করণ ‘দ্য রকি হরর পিকচার শো’ মুক্তি পেলে ফ্র্যাঙ্ক-এন-ফার্টার চরিত্রে কারির অভিনয় তাঁকে আন্তর্জাতিক পরিচিতি এনে দেয়। শুরুতে ছবিটি প্রত্যাশিত সাফল্য না পেলেও পরে এটি কাল্ট ক্লাসিকে পরিণত হয় এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম দর্শকের কাছে বিশেষ জনপ্রিয়তা ধরে রাখে।
টিম কারির ক্যারিয়ারে এমন বহু চরিত্র রয়েছে, যেগুলো তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। স্টিফেন কিংয়ের ‘ইট’-এর ১৯৯০ সালের টেলিভিশন সংস্করণে পেনিওয়াইজ দ্য ক্লাউনের ভূমিকায় তার অভিনয় ছিল তেমনই একটি। ভয়ংকর সেই চরিত্রে তার উপস্থিতি এখনও হররপ্রেমীদের কাছে স্মরণীয়। এ ছাড়া ‘ক্লু’, ‘অ্যানি’, ‘লেজেন্ড’, ‘হোম অ্যালোন ২’ এবং ‘মাপেট ট্রেজার আইল্যান্ড’-এর মতো সিনেমাতেও গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে দেখা গেছে তাকে। কখনও খলনায়ক, কখনও রহস্যময় চরিত্র, আবার কখনও হাস্যরসাত্মক ভূমিকায় প্রতিটি চরিত্রেই নিজের স্বতন্ত্র অভিনয়শৈলী ফুটিয়ে তুলেছিলেন তিনি।
শুধু সিনেমা নয়, থিয়েটারেও টিম কারির সাফল্য ছিল উল্লেখযোগ্য। ব্রডওয়ের একাধিক প্রযোজনায় অভিনয় করে তিনি তিনবার টনি অ্যাওয়ার্ডের মনোনয়ন পান। ‘অ্যামাডিয়াস’, ‘মাই ফেভারিট ইয়ার’ ও ‘স্প্যামালট’-এর মতো মঞ্চনাটকে তার অভিনয় সমালোচকদের প্রশংসা কুড়িয়েছিল। ভয়েস অভিনয়েও তার দক্ষতার পরিচয় মিলেছে। অ্যানিমেশন, টেলিভিশন এবং ভিডিও গেম বিভিন্ন মাধ্যমে নিজের কণ্ঠ ব্যবহার করে অসংখ্য চরিত্রকে জীবন্ত করে তুলেছিলেন তিনি। ‘দ্য ওয়াইল্ড থর্নবেরিস’সহ বেশ কিছু জনপ্রিয় অ্যানিমেটেড প্রজেক্টেও তার কণ্ঠ শোনা গেছে।
২০১২ সালের গুরুতর স্ট্রোক তার শারীরিক সক্ষমতায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছিল। হাঁটার ক্ষমতা হারিয়ে হুইলচেয়ারে বসেই পরবর্তী জীবন কাটাতে হয় তাকে। তবে এই শারীরিক সীমাবদ্ধতা তার সৃজনশীলতাকে থামাতে পারেনি। পরবর্তী সময়ে তিনি মূলত ভয়েস অভিনয় ও অন্যান্য সৃজনশীল কাজে যুক্ত ছিলেন। ২০২৫ সালে প্রকাশিত হয় তার আত্মজীবনী ‘ভ্যাগাবন্ড’, যেখানে নিজের দীর্ঘ অভিনয়জীবনের নানা অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন তিনি।
টিম কারির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সহশিল্পী ও ভক্তদের মধ্যে শোকের আবহ তৈরি হয়েছে। তার অভিনয়ের বিশেষত্ব ছিল একটি চরিত্রকে শুধু পর্দায় তুলে ধরা নয়, সেটিকে নিজের উপস্থিতি ও কণ্ঠের মাধ্যমে সম্পূর্ণ আলাদা পরিচয় দেওয়া। ফ্র্যাঙ্ক-এন-ফার্টারের নাটকীয় উপস্থিতি থেকে পেনিওয়াইজের ভয়ংকর রূপ বহু ভিন্নধর্মী চরিত্রে অভিনয় করেও তিনি দর্শকের মনে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছেন। পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ের সেই বর্ণিল ক্যারিয়ার শেষ হলেও তার অভিনীত চরিত্রগুলো তাকে দীর্ঘদিন দর্শকের স্মৃতিতে বাঁচিয়ে রাখবে।









