প্রতিনিধি ২৭ আগস্ট ২০২৬ , ১২:২৬:০৩ প্রিন্ট সংস্করণ
মানচিত্রে আঁকা সীমারেখা, সড়কে বসানো ব্যারিকেড কিংবা কাঁটাতার ও লোহার ফটক দিয়ে মানুষের তৈরি সীমানা নির্ধারণ করা যায়। কিন্তু প্রকৃতিকে কোনো সীমারেখায় আটকে রাখা যায় না। তারই প্রমাণ মিলেছে নেপালের ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায়।
হিমবাহ ধসে সৃষ্ট এই বন্যার প্রভাবে এবার ভারতের উত্তরপ্রদেশ ও বিহারেও বন্যার সতর্কতা জারি করা হয়েছে। ভারতীয় বার্তাসংস্থা এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।
এর মূল কারণ গণ্ডক নদী। নেপালে এই নদী ‘নারায়ণী’ নামে পরিচিত। তিব্বত-নেপাল সীমান্তের কাছ থেকে উৎপত্তি হয়ে নেপালের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার পর ভারতের ভূখণ্ডে প্রবেশ করলে এর নাম হয় গণ্ডক। অর্থাৎ নাম আলাদা হলেও নদীটি একই, আর তার পানির প্রবাহ কোনো আন্তর্জাতিক সীমান্ত মানে না।
নারায়ণী নদীর উৎপত্তি তিব্বত-নেপাল সীমান্তের কাছে। নেপালের মুস্তাং অঞ্চল দিয়ে প্রবাহিত হয়ে নদীটি ভারত-নেপাল সীমান্তের ত্রিবেণী ধাম অতিক্রম করে বিহারের বাল্মীকিনগরে প্রবেশ করেছে।
লিভিং ওয়াটার্স মিউজিয়ামের এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বাল্মীকিনগর থেকে গণ্ডক নদী উত্তরপ্রদেশ ও বিহারের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে হাজীপুর ও সোনপুরের কাছে গঙ্গায় গিয়ে মিশেছে।
নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ (এনডিআরআরএমএ) জানিয়েছে, একটি হিমবাহ হ্রদের পানি হঠাৎ বেরিয়ে যাওয়ার পর তুষারধসের সৃষ্টি হয় এবং এর ফলেই ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা দেখা দেয়।
নেপালের রাসুয়া জেলায় ভোতে কোশি নদী দিয়ে বিপুল পরিমাণ পানি নেমে এসে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। পানির প্রবল স্রোতে বহু গ্রাম ও অবকাঠামো ভেসে যায়। তিব্বতে উৎপত্তি হওয়া ভোতে কোশি নদী ত্রিশূলী নদী ব্যবস্থার একটি প্রধান উজানের উপনদী। পরে এই নদী নারায়ণী বা গণ্ডক অববাহিকায় গিয়ে মিশেছে।
ফলে নেপালের নারায়ণী নদীতে পানির উচ্চতা বাড়লে তার প্রভাব ভাটিতে ভারতের গণ্ডক নদীতেও পড়তে পারে। এতে পূর্ব উত্তরপ্রদেশ ও উত্তর বিহারে বন্যার ঝুঁকি বেড়েছে। নেপাল থেকে উত্তরপ্রদেশে প্রবেশ করা ঘাঘরা বা কর্ণালি, শারদা বা কালি এবং রাপ্তি নদীও একইভাবে সীমান্ত পেরিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় বন্যার ঝুঁকিতে ভূমিকা রাখে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিহারের পশ্চিম চম্পারণ, পূর্ব চম্পারণ, গোপালগঞ্জ, সারান, মুজাফফরপুর ও বৈশালীসহ কয়েকটি জেলায় বিশেষ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। সীতামঢ়ী ও শেওহরসহ আরও কিছু ঝুঁকিপূর্ণ জেলাকেও নজরদারির আওতায় রাখা হয়েছে।
বিহারের নেপাল সীমান্তবর্তী পশ্চিম চম্পারণ জেলার বাল্মীকিনগরে অবস্থিত গণ্ডক ব্যারাজের সব ৩৬টি গেট বুধবার খুলে দেওয়া হয়েছে। পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ ও পরিস্থিতি সামাল দিতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
বিহারের উপমুখ্যমন্ত্রী ও পানি সম্পদ দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী বিজয় কুমার চৌধুরী জানান, পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাৎক্ষণিক সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ব্যারাজে একজন সুপারিনটেনডিং ইঞ্জিনিয়ারের নেতৃত্বে একটি কারিগরি দল মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি গণ্ডক অববাহিকার সব জেলাকে সতর্ক করা হয়েছে।
বুধবার দুপুরের দিকে বাল্মীকিনগরের গণ্ডক ব্যারাজ থেকে প্রায় ৮৬ হাজার কিউসেক পানি ছেড়ে দেওয়া হয়। ব্যারাজের গেট খুলে দেওয়ার ফলে নদীর পানি দ্রুত প্রবাহিত হতে পারে এবং ব্যারাজের ওপর চাপ কমানো সম্ভব হয়।
অন্যদিকে উত্তরপ্রদেশেও সতর্কতা জারি করা হয়েছে। নেপালের সঙ্গে সীমান্তবর্তী মহারাজগঞ্জ এবং এর পাশের জেলা কুশীনগরকে বিশেষ নজরদারিতে রাখা হয়েছে।
উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ জানিয়েছেন, গণ্ডক ও নারায়ণী নদীর পানি বাড়ায় এবং এর প্রভাবে মহারাজগঞ্জ ও কুশীনগরে বন্যার আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় স্থানীয় প্রশাসনকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে ও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কুশীনগরের মার্চাহওয়া, শিবপুরসহ কয়েকটি গ্রাম থেকে বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে জেলা প্রশাসন। নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়ার জন্য স্থানীয় বাসিন্দাদের মাইকিং করে সতর্ক করা হচ্ছে।





















