সারাদেশ

খোলা ছাদে সকালে খুন হন গণপতি-স্ত্রী-মেয়ে

  প্রতিনিধি ২৭ আগস্ট ২০২৬ , ২:৫১:২২ প্রিন্ট সংস্করণ

শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের ৪ সদস্য হত্যাকাণ্ড নিয়ে পুলিশের তদন্ত ঘিরে নানা প্রশ্নের মধ্যে ফের নতুন তথ্য দিয়েছে পুলিশ।

আদালতে আসামিদের জবানবন্দির বরাতে পুলিশ বলছে, ঘটনার দিন (শুক্রবার) সকালে গণপতি চক্রবর্তী তার বাড়ির ছাদে হাঁটতে গেলে সেখানে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধকে ইয়াবা সেবন করতে দেখে ফেলেন এবং ধমক দেন। এরপর ছাদেই তাকে হত্যা করা হয়। শব্দ পেয়ে স্ত্রী ও মেয়ে ছাদে এলে তাদের দুইজনকে একসাথে হত্যা করা হয়। পরে স্ত্রী-মেয়ের মরদেহ টেনেহিঁচড়ে ছাদের সিঁড়ির কাছে নেওয়া হয়।

আজ বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার দিকে এক ব্রিফিংয়ে আদালতের বরাতে এসব কথা জানান রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ।

তিনি বলেন, আসামিদের জবানবন্দিতে হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে পুলিশের আগের বক্তব্যের সঙ্গে নতুন কিছু তথ্য যুক্ত হয়েছে।

পুলিশ কমিশনার জানান, গণপতি চক্রবর্তীর বাসার ছাদে যাওয়ার কারণ ছিল সেখানে ইয়াবা সেবনের সুবিধা। তারা স্যারের বাসার ছাদে গিয়েছিলো। এর কারণ হলো, দেবুদের বাসার ছাদ ফাঁকা, সেখানে বাতাস আছে। ইয়াবা সেবন করতে যে ধোঁয়া তৈরি হয়, সেটা বাতাসে না থাকলে তাদের জন্য সুবিধা হয়। আর গণপতি স্যারের বাসার ছাদে ওয়াল রয়েছে, যে ওয়ালের ফাঁকে বাইরে থেকে দেখা যায় না।

কমিশনার বলেন, বাসার ছাদে এরা পানির ট্যাংকির আড়ালে বসে ইয়াবা সেবন করছিলো। তারা খেয়াল করেনি, ভোরের আলো ফুটেছে।

তিনি বলেন, ‘সেই রাতে তারা দুজনে আটটা ইয়াবা সেবন করে। এটা সিদ্ধার্থের জবানবন্দি। জীবনে কখনো তারা এত বেশি ইয়াবা সেবন করে নাই। সর্বোচ্চ দুইটা ইয়াবা একসাথে সেবন করেছিলো।

মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ বলেন, সকালে গণপতি স্যার ছাদে হাঁটতে এসে তাদের দেখে ফেলেন। দেখে ফেলে ধমক দেন এবং জোরে জোরে বলেন, ‘তোরা এত সকালে এখানে কী করিস?’ তখন তাদের মাথা কাজ করছিলো না। আত্মসম্মানের ভয়ে মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস গলায় গামছা পেঁচিয়ে টান মেরে গণপতিকে মেরে ফেলে।

মেয়ে ও স্ত্রীকে হত্যার বর্ণনায় পুলিশ কমিশনার বলেন, স্যারের মরদেহ টান দিয়ে ঢেকে পালিয়ে যাওয়ার সময় সম্ভবত স্যারের স্ত্রী এবং মেয়ে শব্দ শুনে ছাদে চলে আসে। তাদের দেখে চিৎকার করতে থাকলে মুগ্ধর হাতে স্যারের গামছা ছিলো, সেই গামছা দিয়ে স্যারের স্ত্রীর গলা চেপে ধরে আর সিদ্ধার্থ দাস স্যারের মেয়ের গলা চেপে ধরে। এক হাতে গলা চেপে ধরে, আরেক হাতে মুখ চেপে ধরে। মুগ্ধ স্যারের স্ত্রীকে মারার পর সেই গামছা দিয়ে আবার দুজনে একসঙ্গে মেয়ের গলায় পেঁচায়। তাতে মেয়ে না মরলে পাশে কবুতরের খাবার রাখার বাক্স থেকে রশি নিয়ে এসে মেয়েটার গলায় পেঁচিয়ে দুই দিক থেকে টান দেয়।

এরপর আসামিরা গণপতির ঘরে ঢুকলে তার ছেলে প্রিয়ম ঘুম থেকে উঠে সিদ্ধার্থকে দেখতে পায় বলে জানান পুলিশ কমিশনার।

তিনি বলেন, বাচ্চাটা সিদ্ধার্থকে দেখে বলে, সিদ্ধার্থ দাদা, তুমি এখানে কেন? দেবুদের বাসার কেউ শব্দ শুনে টের পেয়ে যায় কি না এই ভয়ে বাচ্চাটাকে তারা কাপড় দিয়ে গলা পেঁচিয়ে মেরে ফেলে।

পুলিশ কমিশনার জানান, এর আগে পুলিশ যে তথ্য দিয়েছিল, সেখানে বলা হয়েছিলো ঘুমন্ত অবস্থায় শিশুটির ওপর হামলা করা হয়। তবে আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে সিদ্ধার্থের বক্তব্যে শিশুটি ঘুম থেকে উঠে তাকে দেখে ফেলার বিষয়টি উঠে এসেছে।

হত্যাকাণ্ডের পেছনে আরও দুটি বিষয় পুলিশ খতিয়ে দেখছে বলেও জানান মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ।

তার ভাষ্য, ‘সিদ্ধার্থ দাসের বক্তব্যে একটি কথা উঠে এসেছে যে, তার পূর্বপুরুষের জমি তারা কিনেছিলেন।

তিনি আরও বলেন, ‘পূর্বপুরুষের জমি প্রসঙ্গে একটা কথা শোনা গেছে, একটু বেশি মূল্যে কেনা হয়েছিলো। ওই জমি কেনাটা হয়তো তাদের বংশের শরিকরা ভালোভাবে নেয় নাই। শরিকরা যারা আছে, তারা সবাই টাকা যেটা পাওয়ার কথা, তাদের অংশীদারেরা ওই টাকাটা পায় নাই। তা নিয়ে একটা মনের মধ্যে একটা ক্ষোভ থাকতে পারে, সে দিকটাও আমরা দেখছি।’

সামাজিক ব্যবধানের বিষয়টিও তদন্তে দেখা হচ্ছে জানিয়ে আবদুল মাবুদ বলেন, আরেকটা হলো, এখানে গণপতি স্যারদের ফ্যামিলির সঙ্গে ওইটা মাছুয়াপাড়ার বেশির ভাগ লোক হলো দাস বংশের। আর স্যাররা হলেন ব্রাহ্মণের জাত। সেখানে একটু ব্যবধান ছিল। অর্থাৎ রাস্তাঘাটে দেখা হতো কিন্তু বাসায় আসা-যাওয়া ছিলো না। এটা নিয়েও তাদের মনের মধ্যে কোনো ক্ষোভ থাকতে পারে।

সংবাদ সম্মেলন শেষে সাংবাদিকেরা প্রশ্ন করতে থাকলেও কোনো উত্তর না দিয়ে সেখান থেকে চলে যান পুলিশ কমিশনার।

এর আগে পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ বলেছিলেন, গত বৃহস্পতিবার শেষ রাতে শব্দ পেয়ে ছাদে উঠে ইয়াবা সেবন দেখে ফেলায় খুন হন গণপতি। মা ও মেয়েকে একে একে সিঁড়িতে খুন করা হয়েছিল। এরপর মামলার এজাহার, আলামত ও বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হওয়াসহ ঘটনাটি ঘিরে নানা আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়।

রংপুর মহানগর নাগরিক কমিটির সদস্য সচিব এ্যাডভোকেট পলাশ কান্তি নাগ বলেন, আসামিরা ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়ে এখন কারাগারে রয়েছেন। আসামিদের জবানবন্দির পরে পুলিশ বক্তব্য দিয়েছিলো হত্যাকান্ড নিয়ে। কিন্তু পুলিশের আজকের বক্তব্যের সঙ্গে পূর্বের বক্তব্যের বিস্তর অমিল রয়েছে। এই সময়ের মধ্যে আসামিদের রিমান্ডে নেওয়া হয়নি, এমনকি নতুন করে জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়নি। তাহলে পুলিশ নতুন তথ্য কোথায় পেলো? এই হত্যাকান্ডের ঘটনায় শুরু থেকেই পুলিশের বক্তব্য নিয়ে নানা ধরনের বিতর্ক, সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছিলো। এখন সেটি আরেও বেশি দৃঢ় হচ্ছে।

উল্লেখ্য, গত শনিবার গভীর রাতে রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে পার্থী চক্রবর্তী আগামী (২৫) ও ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তী আয়ুশের (১২) মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে এ ঘটনায় মামলা হয় এবং থানা থেকে তদন্তভার মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে হস্তান্তর করা হয়। দুই আসামি আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।

এছাড়া আদালতে ১৬৪ ধারায় সাক্ষ্য দিয়েছেন মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ দাসের বন্ধু সীমান্ত দাস। একইসঙ্গে দখিগনজ মহাশ্মশানের পাহারাদার বিদ্যুৎ আদালতে স্বীকারোক্তিমুলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

আরও খবর

Sponsered content