প্রচ্ছদ

ঋণ: একটি ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি – দায়িত্ব, সতর্কতা ও মানবিকতা

  প্রতিনিধি ৩ আগস্ট ২০২৫ , ৪:১৩:৪৯ প্রিন্ট সংস্করণ

মানুষের জীবনের অন্যতম বাস্তবতা হলো ঋণ। প্রয়োজনের সময়ে মানুষ যেমন ঋণ গ্রহণ করে, তেমনি অন্যের কষ্ট লাঘবে ঋণ প্রদান করেও মানবিকতার পরিচয় দেয়। তবে এই উপকারের সম্পর্কটি যেন ন্যায্যতায় ও দায়িত্ববোধে পরিচালিত হয়—তা নিশ্চিত করতেই ইসলামে রয়েছে ঋণ আদান-প্রদানের সুস্পষ্ট নির্দেশনা।

কোরআন ও হাদিসে ঋণ প্রসঙ্গ

পবিত্র কোরআন ও হাদিসে একদিকে ঋণ প্রদানকে উৎসাহিত করা হয়েছে, অপরদিকে ঋণগ্রহীতাকে সময়মতো পরিশোধের ব্যাপারে কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়েছে। ঋণ গ্রহণ কোনো পাপ নয়, তবে ঋণ শোধে গাফিলতা কিংবা টালবাহানা করা চরম অন্যায়—এমনকি জুলুম হিসেবেও অভিহিত করা হয়েছে।

সহিহ বোখারি শরিফে এসেছে,

“যে ব্যক্তি পরিশোধের নিয়তে ঋণ গ্রহণ করে, আল্লাহ তার পক্ষ থেকে ঋণ শোধ করে দেন।” (হাদিস: ২৩৮৭)

এতে বোঝা যায়, ঋণগ্রহীতার নিয়ত যদি বিশুদ্ধ থাকে, তবে আল্লাহতায়ালা তাঁর সাহায্যে থাকেন।

মৃত্যুর পরও ঋণ পরিশোধ জরুরি

ইসলাম মতে, কেউ মারা গেলে তার ঋণপরিশোধ করা এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, তা কাফন-দাফনের পর প্রথমেই সম্পন্ন করতে হবে। বাকি সম্পদ তখনই উত্তরাধিকারীদের মাঝে বণ্টনযোগ্য হয়।

সময়মতো পরিশোধ ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা

ঋণ পরিশোধ শুধু আর্থিক দায়িত্ব নয়; এটি ওয়াদা রক্ষা ও একজন মুসলমানের চরিত্রের প্রতিচ্ছবি। এক হাদিসে নবী করিম (সা.) বলেন:

“আমি চাই না উহুদ পাহাড় স্বর্ণে পরিণত হলেও তিন দিনের বেশি সময় আমার কাছে থাকুক, যদি না তা ঋণ পরিশোধের জন্যে রাখি।” (সহিহ বোখারি: ২৩৮৮)

এখান থেকে বোঝা যায়, ঋণ পরিশোধে নবীজির প্রজ্ঞা ও আগ্রহ কতটা গভীর ছিল।

দোয়া ও আধ্যাত্মিক প্রস্তুতি

ঋণমুক্ত থাকতে নবী করিম (সা.) একটি দোয়া শিখিয়েছেন, যা মুসলমানদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতার পাশাপাশি হালাল পথে আত্মনির্ভরশীল হতে উদ্বুদ্ধ করে:

اللَّهُمَّ اكْفِنِي بِحَلاَلِكَ عَنْ حَرَامِكَ، وَأَغْنِنِي بِفَضْلِكَ عَمَّنْ سِوَاكَ
অর্থ: হে আল্লাহ! হালাল মাধ্যমে আমাকে যথেষ্ট করুন, হারাম থেকে রক্ষা করুন এবং আপনার অনুগ্রহেই আমাকে অন্যদের থেকে অমুখাপেক্ষী করে দিন। (তিরমিজি: ৩৫৬৩)

টালবাহানা মানেই জুলুম

যাদের আর্থিক সামর্থ্য আছে, অথচ তারা ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণ পরিশোধে বিলম্ব করে, তাদের ব্যাপারে নবী করিম (সা.) কঠিন ভাষায় বলেছেন:

“সচ্ছল ব্যক্তির টালবাহানা জুলুম।” (সহিহ বোখারি: ২৪০০)

পাওনা চাইতে গেলে সহনশীলতা

পাওনা চাইতে গিয়ে ঋণদাতাকে যেন কোমল আচরণ করতে বলা হয়েছে। তবে ঋণগ্রহীতা যদি রুক্ষ ভাষা ব্যবহার করে, তাহলেও ধৈর্য ধরা উত্তম।

একবার এক ব্যক্তি নবীজির কাছে পাওনা চাইতে রূঢ় ভাষা ব্যবহার করলে সাহাবিরা ক্ষুব্ধ হন। তখন নবীজি বলেন:

“পাওনাদারের একটু কঠিন কথা বলার অধিকার রয়েছে।” (সহিহ বোখারি: ২৪০১)

ঋণ ফেরতের সময় বাড়িয়ে দেওয়া বা মানসম্পন্ন কিছু দেওয়া

ইচ্ছা করলে ঋণগ্রহীতা ঋণ পরিশোধের সময় ঋণদাতার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বাড়তি কিছু দিতে পারেন—যদি তা শর্তসাপেক্ষ না হয়। এটিকে সুদের অন্তর্ভুক্ত ধরা হবে না।

একটি অনন্য দৃষ্টান্ত

হজরত জাবের (রা.) বলেন,

“নবীজি আমার কাছ থেকে ঋণ নিয়েছিলেন। পরে পরিশোধের সময় আমি যা দিয়েছিলাম, তার চেয়ে বেশি দিয়ে দেন।” (আবু দাউদ: ৩৩৪৯)

কৃতজ্ঞতার দোয়া

পাওনা পরিশোধের সময় কৃতজ্ঞতা জানানো ইসলামের সৌন্দর্য।
নবী করিম (সা.) একবার এক সাহাবির ঋণ পরিশোধ করে বলেছিলেন:

“আল্লাহ তোমার পরিবার-পরিজন ও সম্পদে বরকত দিন।” (নাসায়ি: ৪৬৮৩)


ইসলামে ঋণ গ্রহণ করা বৈধ হলেও তা পরিশোধে গাফিলতা চরম গুনাহের কাজ। সময়মতো ঋণ শোধ করা একজন মুসলমানের ঈমান, সততা ও দায়িত্ববোধের পরিচায়ক। সমাজে অর্থনৈতিক ভারসাম্য, বিশ্বস্ততা ও সহমর্মিতা বজায় রাখতে হলে সকলকে এই বিষয়গুলো যথাযথভাবে মেনে চলা উচিত।

আরও খবর

Sponsered content