মেহেরপুর প্রতিনিধি ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ , ১১:০০:২৩ প্রিন্ট সংস্করণ
মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার গাড়াডোব গ্রামে মরহুম কিয়ামদ্দিন আলীর ২৩তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত দুইদিনব্যাপী ওয়াজ মাহফিলকে কেন্দ্র করে এলাকায় তীব্র আলোচনা ও বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। মাহফিলের আয়োজক ও সভাপতির নাম হিসেবে মুহাম্মদ আনোয়ার হোসেনের উল্লেখ থাকলেও তিনি অনুষ্ঠানে অনুপস্থিত ছিলেন।
স্থানীয়দের একাংশের দাবি, আনোয়ার হোসেন মেহেরপুর জেলায় অনলাইন জুয়া সংশ্লিষ্ট একজন পরিচিত ব্যক্তি হিসেবে আলোচিত। তার বিরুদ্ধে অনলাইন জুয়া পরিচালনা ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। ফলে ওয়াজ মাহফিলের বিপুল ব্যয়ের অর্থের উৎস নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে গত কয়েক বছরে একাধিক অভিযোগ ও মামলা হয়েছে এবং বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমেও তার নাম উঠে এসেছে। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, তিনি বর্তমানে বিদেশে অবস্থান করছেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে। অথচ সাম্প্রতিক সময়ে তাকে এলাকায় ‘দানবীর’ হিসেবে উপস্থাপন করে বড় পরিসরে ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হচ্ছে, যা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় এলাকাবাসীর একাংশ বলেন, কয়েক বছর আগেও আনোয়ার হোসেন আর্থিকভাবে তেমন স্বচ্ছল ছিলেন না। অথচ এখন বাবার মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে লক্ষাধিক টাকা ব্যয়ে জাঁকজমকপূর্ণ ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। গাড়াডোব মাধ্যমিক ও প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে বড় প্যান্ডেল, সুসজ্জিত মঞ্চ, তোরণ, আলোকসজ্জা ও ব্যানার-ফেস্টুনে এলাকা সাজানো হয়েছে। দেশবরেণ্য ইসলামী বক্তা ও সংগীত শিল্পীদের আগমনের ঘোষণাও মাইকিংয়ের মাধ্যমে প্রচার করা হচ্ছে।
কয়েকজন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “যে অর্থের সঙ্গে অনলাইন জুয়া, তরুণদের সর্বনাশ ও পারিবারিক ধ্বংসের অভিযোগ জড়িত, সেই অর্থে ধর্মীয় আয়োজন কতটা গ্রহণযোগ্য—তা নিয়ে আমাদের মনে সন্দেহ রয়েছে।” অনেকেই এটিকে অবৈধ অর্থ সাদা করার অপচেষ্টা বলেও মনে করছেন।
জানা গেছে, অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে সিআইডি মেহেরপুর জেলায় যে তদন্ত শুরু করেছে, সেই তালিকায় আনোয়ার হোসেনের নামও রয়েছে বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।
এদিকে, নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে এ ধরনের আয়োজন কীভাবে হচ্ছে, তা নিয়েও প্রশাসনের ভূমিকা প্রশ্নের মুখে পড়েছে। অনলাইন জুয়া সংশ্লিষ্ট অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তির নাম ব্যবহার করে প্রকাশ্যে ধর্মীয় মাহফিল আয়োজন বিষয়টি খতিয়ে দেখা জরুরি বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
এ বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) মেহেরপুর জেলা কমিটির সভাপতি সৈয়দ জাকির হোসেন বলেন, “অনলাইন জুয়ার ফাঁদে পড়ে তরুণরা সর্বস্বান্ত হচ্ছে, যা সমাজের জন্য অত্যন্ত ভয়াবহ। আমরা দীর্ঘদিন ধরে এর বিরুদ্ধে কাজ করছি। অনলাইন জুয়ার অর্থে ধর্মীয় আয়োজন হলে তা বন্ধে রাষ্ট্র ও প্রশাসনকে কঠোর হতে হবে। অনেক সময় ধর্মীয় আবেগকে ব্যবহার করে সমাজে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করা হয়, যা কাম্য নয়।”
গাংনী উপজেলা নির্বাহী অফিসার আনোয়ার হোসেন বলেন, “মাহফিল আয়োজনের জন্য জেলা প্রশাসনের অনুমতি প্রয়োজন। এ বিষয়ে আমার কাছে এখনো কোনো তথ্য নেই।”
মেহেরপুর জেলা প্রশাসক ড. সৈয়দ এনামুল কবির বলেন, “মাহফিল আয়োজনের আবেদন পাওয়া গেছে। পুলিশ সুপারের কাছে প্রতিবেদন চাওয়া হয়েছিল, তিনি ইতিবাচক মত দিয়েছেন। অনুমতি এখনো প্রক্রিয়াধীন। তবে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
ধর্মীয় নেতাদের প্রতিক্রিয়ায় গাংনী উপজেলা ওলামা পরিষদের সভাপতি মাওলানা রুহুল আমিন বলেন, “ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে দিবস পালন বৈধ নয়। অবৈধ আয়ের অর্থ দিয়ে কোনো ধর্মীয় কার্যক্রম ইসলামসম্মত হতে পারে না। জেনে-বুঝে অনলাইন জুয়ার অর্থে আয়োজিত মাহফিলে অংশগ্রহণ করাও গ্রহণযোগ্য নয়।”
এ বিষয়ে আনোয়ার হোসেনের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তার কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালেও গাড়াডোব গ্রামে একদিনব্যাপী একই ধরনের ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন করেছিলেন আনোয়ার হোসেন।




















