হৃদয় রায়হান, কুষ্টিয়া জেলা প্রতিনিধি: ১৬ জানুয়ারি ২০২৬ , ৮:২২:৫৬ প্রিন্ট সংস্করণ
কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) একটি পুকুর দখলকে কেন্দ্র করে দুই গ্রামবাসীর মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এ সময় একপক্ষের একটি মোটরসাইকেল ভাঙচুর করা হয়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) দুপুর ১২টার দিকে উপজেলার চাপড়া ইউনিয়নের ভাড়রা বাজার সংলগ্ন এলাকায় ভাড়রা গ্রাম ও যদুবয়রা ইউনিয়নের উত্তর চাঁদপুর গ্রামের একাংশের মধ্যে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সান্দিয়ারা–লাহিনীপাড়া সড়কের ভাড়রা বাজারের পাশে পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রায় ১২ বিঘা জমির একটি পুকুর রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী নামমাত্র খাজনার বিনিময়ে ‘সুফলভোগী’ সংগঠনের মাধ্যমে স্থানীয়দের এ পুকুর ভোগ করার কথা। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে স্থানীয় এমপির ডিও লেটারের মাধ্যমে চাপড়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম রাশেদ টোটো তার অনুসারীদের দিয়ে পুকুরটি ভোগ করতেন। তিনি প্রতিবছর সরকারকে প্রায় ৪০ হাজার টাকা খাজনা প্রদান করতেন এবং ২০২৭ সাল পর্যন্ত সরকারের সঙ্গে তার চুক্তি রয়েছে বলে জানা গেছে।
সরকার পরিবর্তনের পর স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা পুকুরটি দখলের চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে গত বছর আওয়ামী লীগ নেতা টোটো ৭ লাখ টাকার বিনিময়ে যদুবয়রা ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সদস্য ও বিএনপি নেত্রী সাজেদা খাতুনের কাছে পুকুরটি হস্তান্তরের কথা জানান।
এ নিয়ে ভাড়রা ও উত্তর চাঁদপুর গ্রামের লোকজন এবং বিএনপির বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে উত্তেজনা বিরাজ করছিল। শুক্রবার দুপুরে যদুবয়রা ইউনিয়ন বিএনপির সার্চ কমিটির সাবেক সদস্য ফারুক হোসেন, বিএনপির কর্মী আসাদ ও মতিয়ারসহ কয়েকজন মোটরসাইকেলে করে পুকুর এলাকায় গেলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
এ সময় ভাড়রা গ্রামের লোকজন মসজিদের মাইকে ‘সন্ত্রাসীরা পুকুরে মাছ মারছে, সবাই আসুন’—এমন ঘোষণা দিলে কয়েকশ মানুষ দেশীয় অস্ত্র (লাঠিসোঁটা, দা, বটি ও হাঁসুয়া) নিয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে আসে। ধাওয়া দিলে প্রতিপক্ষরা একটি মোটরসাইকেল ফেলে পালিয়ে যায়। পরে উভয়পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে।
দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পাকা সড়ক ঘেঁষে পুকুরের পাড়ে একটি ভাঙচুর করা মোটরসাইকেল পড়ে আছে। চারপাশে দেশীয় অস্ত্র হাতে কয়েকশ মানুষ ছোটাছুটি করছিল। এ সময় ভাড়রা গ্রামের লোকজন গণমাধ্যমকর্মীদের ভিডিও ধারণে বাধা দেন এবং ঘটনাস্থল ত্যাগে বাধ্য করেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি জানান, সরকারি পুকুরটি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। উত্তর চাঁদপুর গ্রামের লোকজন মাছ ধরতে এলে ভাড়রাবাসী মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে হামলা চালায়। এতে একটি মোটরসাইকেল ভাঙচুর করা হয়।
পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে। ভাড়রা ও চাঁদপুর বাজার এলাকায় দুই গ্রামের লোকজন জড়ো হয়ে উত্তেজনা ছড়ালেও বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।
চাপড়া ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সাইদুল ইসলাম দাবি করেন, নিয়ম অনুযায়ী পুকুরটি ভাড়রাবাসীর ভোগ করার কথা। তিনি বলেন, “৩৩ জনের একটি কমিটি করে প্রায় দেড় বছর আগে ১৫ লাখ টাকার মাছ ছাড়া হয়েছে। কিন্তু উত্তর চাঁদপুর গ্রামের ফারুক, আসাদ ও মতিয়ার জোর করে মাছ ধরতে নেমেছিল। আমরা মাইকে ঘোষণা দিলে গ্রামবাসী চলে আসে এবং তারা পালিয়ে যায়।” তবে মোটরসাইকেল ভাঙচুরের বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
এ বিষয়ে যদুবয়রা ইউনিয়নের উত্তর চাঁদপুর গ্রামবাসী ও অভিযুক্ত বিএনপি নেতারা মন্তব্য করতে রাজি হননি।
ফোনে আওয়ামী লীগ নেতা এস এম রাশেদ টোটো বলেন, “২০২৭ সাল পর্যন্ত সরকারের সঙ্গে আমার চুক্তি রয়েছে। প্রতিবছর খাজনা দিয়েছি এবং পুকুরে প্রায় ১৫ লাখ টাকার মাছ ছিল। সরকার পতনের পর নানা ঝামেলার কারণে ইউপি সদস্য সাজেদার কাছে ৭ লাখ টাকায় হস্তান্তর করেছিলাম। কিন্তু তিনি এখনও কোনো টাকা দেননি।”
কুমারখালী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. আমিরুল ইসলাম বলেন, “পুকুর দখলকে কেন্দ্র করে দুইপক্ষের বিরোধে একটি মোটরসাইকেল ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। মোটরসাইকেলটি জব্দ করা হয়েছে, তবে মালিক এখনও শনাক্ত হয়নি। লিখিত অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”




















