সাঈদ ইবনে হানিফ: ২৭ জুলাই ২০২৬ , ১১:৪৩:৩১ প্রিন্ট সংস্করণ
যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার ঐতিহ্যবাহী জহুরপুর গ্রামের কৃতী সন্তান শামস-উল-হুদা কেবল একজন ক্রীড়া সংগঠকই ছিলেন না; তিনি ছিলেন শিক্ষা বিস্তার, সমাজসেবা ও মানবকল্যাণে নিবেদিত এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। ক্রীড়া, শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নে তাঁর অসামান্য অবদান আজও যশোরবাসীর কাছে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয়।
১৯১৮ সালে যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার জহুরপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন শামস-উল-হুদা। তাঁর পিতা শেখ আবুল বারী যশোর সিভিল কোর্টে কর্মরত ছিলেন এবং মাতা মোছাম্মৎ আশরাফুন নেছা ছিলেন গৃহিণী। দুই ভাই ও পাঁচ বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়।
প্রাথমিক শিক্ষা শেষে তিনি যশোরের সম্মিলনী ইনস্টিটিউশন, যশোর জেলা স্কুল ও কালিগঞ্জ হাটপুল স্কুলে অধ্যয়ন করেন। পরে যশোর সরকারি এম.এম. কলেজ থেকে আইএ ও বিএ ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্রজীবন থেকেই খেলাধুলার প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল। বিশেষ করে ফুটবলে গোলরক্ষক হিসেবে তিনি সুনাম অর্জন করেন। সম্মিলনী ইনস্টিটিউশন, চিত্তরঞ্জন ক্লাব, টাউন ক্লাব, ইয়ং মুসলিম ক্লাব ও যতীন্দ্র মোহন ক্লাবের হয়ে যশোর লিগে খেলেছেন। আন্তঃস্কুল প্রতিযোগিতায় অল বেঙ্গল দলের সদস্য হিসেবেও শিরোপা জয়ের গৌরব অর্জন করেন। পরে দক্ষ রেফারি হিসেবেও পরিচিতি লাভ করেন।
কর্মজীবনে তিনি খুলনা মুসলিম ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির বিভাগীয় ব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি ব্যবসা পরিচালনার পাশাপাশি দীর্ঘদিন যশোর পৌরসভার ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। রাজনৈতিকভাবে পাকিস্তান মুসলিম লীগের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও জনসেবাকেই তিনি সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছেন।
মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের নানাভাবে সহায়তা করেন এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
যশোরের ক্রীড়া উন্নয়নে তাঁর অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁর উদ্যোগে ১৯৫০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় যশোর জেলা ক্রীড়া সংস্থা। প্রতিষ্ঠার পর থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত টানা ৩৬ বছর তিনি সংস্থাটির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৫৯ সালে যশোর স্টেডিয়াম নির্মাণের সময় ক্রীড়া সংস্থার আর্থিক সংকট দেখা দিলে তিনি নিজের পৈতৃক বাড়ি থেকে ইট এনে ভিত্তিপ্রস্তর নির্মাণে সহযোগিতা করেন। পরে নিজ অর্থায়নে স্টেডিয়ামের চারপাশে টিনের বেড়া এবং পরবর্তীতে সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করেন। ক্রীড়ার প্রতি তাঁর এই আত্মনিবেদন আজও অনুকরণীয়।
তিনি বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে), বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি), টেবিল টেনিস ও অ্যাথলেটিকস ফেডারেশনের সদস্য এবং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান স্পোর্টস ফেডারেশনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে ১৯৭৬ সালে যশোর জেলা দল জাতীয় ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কৃতিত্ব অর্জন করে।
শিক্ষা বিস্তারেও তাঁর অবদান ছিল অনস্বীকার্য। তিনি এন.এম. খান প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। এছাড়া মাহমুদুর রহমান উচ্চ বিদ্যালয়, উপশহর কলেজ, যশোর রেলওয়ে মহিলা কলেজ, নব কিশলয় কিন্ডারগার্টেন, মোমিন গার্লস স্কুল ও যশোর আলিয়া মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। পাশাপাশি যশোর ইনস্টিটিউট, শিল্পকলা একাডেমি, রেডক্রস, বিএভিএস (BAVS) এবং পরিবার পরিকল্পনা সমিতিসহ বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেন।
ক্রীড়া ও সমাজসেবায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৭৭-৭৮ সালে বাংলাদেশ ক্রীড়া লেখক সমিতি তাঁকে শ্রেষ্ঠ জাতীয় ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে সম্মাননা প্রদান করে। ১৯৮৭ সালে তিনি মরণোত্তর জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কারে ভূষিত হন। ১৯৮৮ সালে যশোরবাসীর দাবির মুখে যশোর স্টেডিয়ামের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘যশোর শামস-উল-হুদা স্টেডিয়াম’। এছাড়া ২০১১ সালে হামিদপুরে প্রতিষ্ঠিত শামস-উল-হুদা ফুটবল একাডেমি তাঁর আদর্শকে ধারণ করে নতুন প্রজন্মের ফুটবলার তৈরিতে কাজ করে যাচ্ছে।
১৯৮৭ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি ৭০ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তবে তাঁর কর্ম, সততা, আত্মত্যাগ এবং জনকল্যাণে নিবেদিত জীবন আজও যশোরের ক্রীড়া, শিক্ষা ও সমাজসেবার ইতিহাসে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে আছে।
বাঘারপাড়ার জহুরপুর গ্রামের এই কৃতী সন্তান প্রমাণ করে গেছেন, একজন মানুষের নিষ্ঠা, সততা ও জনকল্যাণে আত্মনিয়োগ একটি জনপদের উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অনুপ্রেরণার ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।





















