সারাদেশ

বাগেরহাট বাস টার্মিনালে বাড়তি চাপ, সড়কে দাঁড় করিয়ে চলছে যাত্রী ওঠানামা

  প্রিন্স মন্ডল অলিফ, বাগেরহাট জেলা প্রতিনিধি: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ , ৬:৪১:৫২ প্রিন্ট সংস্করণ

পদ্মা সেতু চালুর পর ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ সহজ হওয়ায় বাগেরহাটে আন্তঃজেলা ও দূরপাল্লার বাস চলাচল বেড়েছে। সেই সঙ্গে বেড়েছে যাত্রীদের যাতায়াতও। তবে বাড়তি যাত্রী ও যানবাহনের চাপ সামাল দেওয়ার মতো সক্ষমতা তৈরি হয়নি জেলার কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে।

ফলে প্রতিদিনই টার্মিনালের ভেতরে-বাইরে তৈরি হচ্ছে নানা সংকট। পার্কিংয়ের জায়গা সংকুচিত হওয়ায় কয়েকটি দূরপাল্লার বাসকে প্রধান সড়কের পাশে দাঁড় করিয়ে যাত্রী ওঠানামা করতে হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন যানজট তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি। টার্মিনালের ভেতরের বিভিন্ন স্থানে খানাখন্দ ও বৃষ্টির পানি জমে থাকায় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে যাত্রীদের।

সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন আনুমানিক ১৫ থেকে ২০ হাজার যাত্রী এই টার্মিনাল ব্যবহার করেন। আটটি রুটে চলাচল করে তিন শতাধিক বাস ও মিনিবাস। বিপুলসংখ্যক যাত্রী ও যানবাহনের বিপরীতে টার্মিনালের আয়তন ও অবকাঠামো এখনো দুই দশক আগের কাঠামোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

টার্মিনাল ঘুরে দেখা গেছে, অভ্যন্তরীণ সড়কের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। বৃষ্টির পর এসব গর্তে পানি জমে কাদার সৃষ্টি হচ্ছে। অনেক জায়গায় যাত্রীদের হাঁটার পথ ও বাস চলাচলের পথও স্বাভাবিক নেই। ফলে শিশু, বয়স্ক ও নারী যাত্রীদের চলাচলে বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

জায়গার সংকটের কারণে কয়েকটি দূরপাল্লার পরিবহনের বাস টার্মিনালের বাইরে প্রধান সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে যাত্রী তুলছে। কিছু পরিবহনের কাউন্টারও রয়েছে টার্মিনালের বাইরে। এতে বাসের জন্য অপেক্ষারত যাত্রীদের ব্যস্ত সড়কের কাছাকাছি অবস্থান করতে হচ্ছে।

চট্টগ্রাম থেকে আসা যাত্রী রায়হান শেখ বলেন, ‘টার্মিনালের বাইরে সড়কে দাঁড়িয়ে বাসে ওঠানামা করতে হয়। বড় গাড়ি পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় নিরাপত্তা নিয়ে ভয় লাগে। বাসগুলো যদি টার্মিনালের ভেতরেই রাখা যেত, তাহলে যাত্রীদের ঝুঁকি অনেকটাই কমত।’

শাওন নামে এক যাত্রী বলেন, ‘বৃষ্টির সময় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। টার্মিনালের কোথাও পানি, আবার কোথাও কাদা জমে থাকে। শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে চলাচল করা কঠিন হয়ে পড়ে।’

ঢাকা থেকে আসা শাফিন আহমেদ বলেন, ‘পদ্মা সেতু চালুর পর এই অঞ্চলে বাস চলাচল অনেক বেড়েছে। কিন্তু টার্মিনালের সুযোগ-সুবিধা সেই অনুপাতে বাড়েনি। সড়কে বাস দাঁড় করিয়ে যাত্রী ওঠানোয় যানজটের পাশাপাশি দুর্ঘটনার ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে।’

যশোর থেকে আসা নাফিজা বলেন, ‘টার্মিনালে যাত্রীদের বসে অপেক্ষা করার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। বৃষ্টির সময় কাদা-পানি মাড়িয়ে বাসে উঠতে হয়। শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে এ অবস্থায় চলাচল করা খুবই কষ্টকর।’

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০০৪ সালে বাগেরহাট পৌরসভা এলাকার মহাসড়কের পাশে দুই একর জমির ওপর বাস টার্মিনালটি নির্মাণ করা হয়। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগের উদ্যোগে নির্মিত স্থাপনাটি এরই মধ্যে দুই দশকের বেশি পুরোনো হয়েছে।

নির্মাণের সময়কার যাত্রী ও যানবাহনের তুলনায় বর্তমানে ব্যবহারকারীর সংখ্যা অনেক বেড়েছে। প্রতিদিন তিন শতাধিক বাস ও মিনিবাস চলাচল করায় টার্মিনালের ভেতরে জায়গা সংকট প্রকট হয়েছে। একই সঙ্গে পানি নিষ্কাশন, পার্কিং ও যাত্রীসেবার ক্ষেত্রেও রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা।

বাগেরহাট জেলা বাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘টার্মিনালের অবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই খারাপ। বড় গর্তের কারণে বাস চলাচলে সমস্যা হচ্ছে। গর্তে পড়ে গাড়ির পাতি ভেঙে যাওয়াসহ বিভিন্ন যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিচ্ছে। এতে পরিবহন মালিকদের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে।’

তিনি বলেন, সমস্যাগুলো নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার অবহিত করা হয়েছে। পরিবহন মালিকরা নিয়মিত টার্মিনালের কর দিলেও প্রয়োজনীয় সংস্কার না হওয়ায় তারা হতাশ। দ্রুত টার্মিনাল সংস্কার ও সম্প্রসারণের দাবি জানান তিনি।

বাগেরহাট পৌরসভার প্রশাসক ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিন জানান, বর্তমান বাসস্ট্যান্ডটি পুরোনো হওয়ায় এটিকে আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর জন্য জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। জমি অধিগ্রহণ শেষ হলে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন বাসস্ট্যান্ড গড়ে তোলা হবে।

বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি বলেন, অতিরিক্ত বৃষ্টিতে বাসস্ট্যান্ডের বিভিন্ন স্থানে খানাখন্দ তৈরি হয়েছে। ইতোমধ্যে সেখানে ইট-বালু দেওয়া হয়েছে। এরপরও কোথাও সমস্যা থাকলে তা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যাত্রীদের নিরাপদ চলাচলের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। বাসস্ট্যান্ডের লাইটের সমস্যাও দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

পৌরসভার সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী জানান, বাস টার্মিনাল সম্প্রসারণের জন্য আরও প্রায় তিন একর জমি অধিগ্রহণের কাজ চলছে। এটি সম্পন্ন হলে টার্মিনালের আয়তন বাড়ানোর পাশাপাশি যাত্রীদের সুযোগ-সুবিধাও বাড়ানো হবে।

তবে স্থানীয় যাত্রীদের প্রশ্ন, ভবিষ্যতে বড় ও আধুনিক টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা থাকলেও বর্তমান সংকটের সমাধান হবে কীভাবে। তাদের মতে, জমি অধিগ্রহণ ও নতুন অবকাঠামো তৈরির প্রক্রিয়া শেষ হতে সময় লাগবে। এর মধ্যে টার্মিনালের গর্ত সংস্কার, পানি নিষ্কাশন, আলোকসজ্জা এবং বাস পার্কিংয়ের ব্যবস্থা উন্নত করা প্রয়োজন।

তা না হলে যাত্রী ও বাসের সংখ্যা আরও বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বর্তমান সংকটও আরও তীব্র হতে পারে। একই সঙ্গে ব্যস্ত সড়কে বাস দাঁড় করিয়ে যাত্রী ওঠানামা করায় দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আরও খবর

Sponsered content