সারাদেশ

মান্দায় গোডাউন ভেঙে লুটপাটের অভিযোগ, জমি দখল নিয়ে দুই পক্ষের বিরোধ

  নওগাঁ প্রতিনিধি ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ , ৬:২৫:৩৪ প্রিন্ট সংস্করণ

নওগাঁর মান্দায় দলিলের হাতনকশায় (দখল পজিশন) চৌহদ্দি ওভাররাইটিং করে জমি দখলের চেষ্টা, ভেকু দিয়ে টিনশেড গোডাউন ভাঙচুর, মালামাল লুটপাট ও ইট মাটিচাপা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় স্থানীয় এক ভাঙাড়ি ব্যবসায়ী বিজিবি সদস্য ও তাঁর ভাইসহ অজ্ঞাতনামা ২০ থেকে ৩০ জনের বিরুদ্ধে মান্দা থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন।

ভুক্তভোগী চকউমেদ গ্রামের মফিজ উদ্দীনের ছেলে মো. আমিনুল হক অভিযোগে স্থানীয় বিজিবি সদস্য আব্দুল মান্নান ও তাঁর ভাই সাবেক ইউপি সদস্য মোকলেছার রহমানের নাম উল্লেখ করেছেন।

অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, দেলুয়াবাড়ী মৌজার ৩১৩ নম্বর খতিয়ানের হিস্যা অনুযায়ী ১ একর ৩৪ শতক জমির মূল মালিক ছিলেন রসিক প্রামাণিক ওরফে ইসমাইল। ওই খতিয়ানের ৭৫৯ নম্বর দাগের ৫৩ শতক ধানী জমির মালিকানাও তাঁর ছিল। ১৯৭৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর ১৫৩১৬ নম্বর দলিলের মাধ্যমে তিনি ওই জমি তাঁর বড় ছেলে রইচ উদ্দিন প্রামাণিকের কাছে হস্তান্তর করেন।

পরে রইচ উদ্দিন প্রামাণিক ২০০৮ সালের ১২ মে ৩৮৮১ নম্বর দলিলের মাধ্যমে তাঁর ছোট ভাই লেলিন উদ্দিন প্রামাণিককে এবং ৩৮৮২ নম্বর দলিলের মাধ্যমে বোন রমিছা বিবিকে জমি হস্তান্তর করেন। ২০১৭ সালে বিজিবি সদস্য আব্দুল মান্নান ৪৪৪৬ নম্বর দলিলে সাড়ে ১১ শতক জমি কেনেন।

এরপর ২০২১ সালের ১৯ জুলাই ৫০৪১ নম্বর দলিলের মাধ্যমে লেলিন উদ্দিন প্রামাণিকের কাছ থেকে ৭৫৯ নম্বর দাগের দক্ষিণাংশে পৌনে ১৩ শতক জমি কেনেন আমিনুল হক। তাঁর প্রস্তাবিত খতিয়ান নম্বর ১৪১৮। জমিটি নিচু ও গর্ত থাকায় মাটি ভরাট করে সেখানে টিনশেড গোডাউন নির্মাণ করেন তিনি। পরে ওই গোডাউনে ভাঙাড়ির ব্যবসা পরিচালনা করে আসছিলেন।

আমিনুল হকের অভিযোগ, বিজিবি সদস্য আব্দুল মান্নান ও তাঁর ভাই মোকলেছার রহমান প্রতিপক্ষের সঙ্গে যোগসাজশ করে দলিলের হাতনকশার চৌহদ্দিতে ওভাররাইটিং করে জালিয়াতির মাধ্যমে তাঁর জমি দখলের চেষ্টা শুরু করেন। এরই ধারাবাহিকতায় গত ১৯ আগস্ট সকালে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে একদল লোক তাঁর জমিতে হামলা চালায়।

অভিযোগে বলা হয়, হামলাকারীরা ভেকু দিয়ে আমিনুল হকের টিনশেড গোডাউনটি ভেঙে ফেলে। এ সময় তিনি জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করলে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়। তবে পুলিশ পৌঁছানোর আগেই গোডাউনে থাকা বিপুল পরিমাণ ভাঙাড়ি মালামাল ও মূল্যবান সামগ্রী লুট করে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। গচ্ছিত ইটও মাটিচাপা দেওয়া হয় বলে তাঁর দাবি।

ঘটনার দিন রাতে মান্দা থানা চত্বরে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতিতে উভয় পক্ষকে নিয়ে সমঝোতা বৈঠক হয়। সেখানে বিবাদীরা আইন নিজের হাতে তুলে নেবেন না বলে লিখিত মুচলেকা দেন। তবে বৈঠক শেষে পুনরায় জমিতে ইট পুঁতে স্থাপনা নির্মাণের মাধ্যমে দখলের চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ করেছেন আমিনুল।

পরবর্তীতে প্রশাসনের উপস্থিতিতে প্রসাদপুর সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের বালাম বই যাচাই করা হয়। আমিনুলের দাবি, সেখানে বিবাদীদের দলিলের সঙ্গে মূল বালাম বইয়ের অসামঞ্জস্য পাওয়া যায় এবং মূল দলিলে ওভাররাইটিং ও তথ্য জালিয়াতির বিষয়টি ধরা পড়ে। তবে বালাম বইয়ের সঙ্গে জাবেদা নকলের মিল রয়েছে বলে জানান তিনি।

থানায় অভিযোগের পর উভয় পক্ষকে নিয়ে কয়েক দফা সালিশ বৈঠকের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা সফল হয়নি। একাধিকবার বৈঠকের তারিখ নির্ধারণ করা হলেও প্রতিপক্ষের লোকজন উপস্থিত না হওয়ায় বৈঠক ভেস্তে যায় বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী। এতে ন্যায়বিচার পাওয়া নিয়ে সংশয়ে রয়েছেন তিনি।

ভুক্তভোগী আমিনুল হক বলেন, ‘আমি নিঃস্ব হয়ে গেছি। জমি নামজারি ও খাজনা দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করার পরও প্রভাবশালী বিজিবি সদস্য আব্দুল মান্নান ও তাঁর ভাই মোকলেছার রহমান জালিয়াতি করে আমার ১২ লাখ টাকার বেশি ক্ষতি করেছেন। জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়ার পরও তাঁরা অধরা। আমি প্রশাসন ও রাজনৈতিক শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে ক্ষয়ক্ষতির বিচার ও ক্ষতিপূরণ দাবি করছি।’

তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্তরা। তাঁদের দাবি, দলিল ওভাররাইটিংয়ের অভিযোগ সঠিক নয়। ২০১৭ সালে আব্দুল মান্নান ৪৪৪৬ নম্বর দলিলে সাড়ে ১১ শতক জমি কেনেন। ওই জমিতে আমিনুল হক জবরদখল করে টিনশেড ঘর নির্মাণ করেছিলেন। একাধিকবার সরিয়ে নিতে বলার পরও না সরানোয় সেটি ভেঙে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি তাঁদের।

অভিযুক্তদের আরও দাবি, আমিনুল হক পরবর্তী কবলাদার হওয়ায় কাগজপত্র যাচাই করলে তাঁর সেখানে মাত্র এক শতক জমি পাওয়ার কথা। এ ছাড়া মান্দা থানার ওসির বিরুদ্ধে প্রভাবিত হয়ে বিচারকের ভূমিকা পালন ও মামলার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন তাঁরা।

মান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খোরশেদ আলম বলেন, ‘ভুক্তভোগীর লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের তদন্ত প্রতিবেদন ও বালাম বইয়ের অসামঞ্জস্যের বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। তদন্ত শেষে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

আরও খবর

Sponsered content