প্রচ্ছদ

ইউনূস-সরকারকে সময় দেওয়ার যে কৌশল নিতে পারে আওয়ামী লীগ

  প্রতিনিধি ১১ এপ্রিল ২০২৫ , ১০:২৪:২১ প্রিন্ট সংস্করণ

দৈনিক কালবেলা পত্রিকা গতকাল বৃহস্পতিবার (১০ এপ্রিল ২০২৫) ‘প্রস্তুতি নিচ্ছেন আ.লীগের নেতাকর্মীরা, তথ্য গোয়েন্দা সংস্থার’ শিরোনামের একটা সংবাদ প্রকাশ করেছে। চট্টগ্রাম ব্যুরোর এই সংবাদে বলা হয়, ‘গোয়েন্দা পুলিশের একটি গোপন রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে ঢাকায় শেখ হাসিনাকে ফেরানোর দাবিতে শক্তি প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে দলীয় নেতাকর্মীদের সমবেত হতে বলা হয়েছে। এই তথ্য ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে চট্টগ্রামের সব থানাকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।’

গোয়েন্দা পুলিশের সূত্রে প্রতিবেদনে যা বলা হয়েছে সে রকমের কোন ইঙ্গিত রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে এখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না। তবে গোয়েন্দা প্রতিবেদন তো প্রশাসনের সতর্কতামূলক বার্তাই হয়ে থাকে। হয়ত এখানে পুলিশের সংশ্লিষ্ট দপ্তর তেমন কিছু দেখছে, নয়ত অন্য কোন উদ্দেশ্যে এই সংবাদ প্রচার হচ্ছে। সংবাদটি অন্য আরও কয়েকটি গণমাধ্যমেও এসেছে দেখলাম।

অন্য কী উদ্দেশ্য?

আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে প্রশাসনের হার্ডলাইন; যার ক্ষেত্র তৈরির প্রচেষ্টা। এসব ক্ষেত্রে আগেভাগে কোনো কিছুর ইঙ্গিত দিয়ে হয়ত কঠোর কোন অভিযানে নামতে যাচ্ছে পুলিশ।

৫ই আগস্টের ক্ষমতাচ্যুতির পর এমনিতেই আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা দিশেহারা। তার ওপর সরকার দলটির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে তার আগের অবস্থান ধরে রেখেছে। এখন হয়ত আগের মতো মব সৃষ্টি করে তেমনভাবে পিটিয়ে মেরে ফেলা হচ্ছে না, ঘোষণা দিয়ে আগের মতো ভাঙচুর-লুটপাট চালানো হচ্ছে না, তবে মব সৃষ্টি করে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড ঠিকই পরিচালিত হচ্ছে। সিরাজগঞ্জ-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য প্রখ্যাত শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. আবদুল আজিজের ওপর সেদিনের হামলা, জামিন পেলেও এরপর তাকে ফের পুলিশের কাছে সোপর্দ করার ঘটনাও ঘটেছে। তার ওপর এক শ্রেণির রাজনীতিক আওয়ামী লীগের নেতারা কেন জামিন পাচ্ছেন, সেটা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন।

মব সৃষ্টি করে একজন সাবেক সংসদ সদস্য ও চিকিৎসককে আইনবিযুক্ত ভাবে মারধরের সেদিনের সেই খবরের অঙ্গে আবার আছে ৮৪ জন আইনজীবীকে নিম্ন আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানোর ঘটনা। এর বাইরে সারাদেশে এমন অসংখ্য ঘটনা ঘটছে প্রতিদিন, যার বেশিরভাগই সংবাদমাধ্যমে আসছে না, আবার আসলেও সেভাবে আলোচিত হচ্ছে না।

আওয়ামী লীগের প্রতি সরকারের এই আচরণের সঙ্গে আছে কিংস পার্টি এনসিপি-সহ আরও কিছু দলের নেতাদের দ্বারা আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার অহর্নিশি দাবি। এই দাবির চূড়ান্ত ফলাফল কী হবে, সেটা এই মুহূর্তে বলা না গেলেও, এটা নির্দ্বিধায় বলা যায়, আওয়ামী লীগ সহজে স্পেস পাচ্ছে না।

তার ওপর গোয়েন্দা সংস্থার সূত্র ধরে দৈনিক কালবেলা পত্রিকার প্রতিবেদন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের জন্যে ভীতির কারণ হতে পারে। ঘটতে পারে আরেক দফা গণগ্রেপ্তার ঘটনা।

আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার যে অডিয়ো কলগুলো সামাজিক মাধ্যমে ভেসে আসছে, তাতে তাঁকে বারবার বলতে শোনা যাচ্ছে, তিনি শিগগিরই দেশে ফিরতে যাচ্ছেন। তাঁর এই কথাগুলো আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের জন্যে অনুপ্রেরণার উপকরণ হচ্ছে। এতে মানসিকভাবে দলের ভেঙে পড়া দলের নেতাকর্মীরা উদ্বুদ্ধ হচ্ছে, আশার প্রহর গুনছে। তবে কবে নাগাদ তিনি ফিরছেন, এটা নিয়ে কোন পরিস্কার ধারণা পাওয়া যাচ্ছে না।

মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষ থেকে ভারতের কাছে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ চাওয়া হয়েছে। ভারত ইতিবাচক সাড়া দেয়নি। দেওয়ার কথাও না ভারতের। তবে শেখ হাসিনা আমৃত্যু ভারতে যে থাকবেন, এটাও বিশ্বাসের কারণ নাই। শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ এক্ষেত্রে না হলেও দেশে যে তাঁর প্রত্যাবর্তন হবে এটা ধারণা করাই যায়।

এটা কি সহসা হচ্ছে? আমার ধারণা— না! এক্ষেত্রে যে গোয়েন্দা প্রতিবেদনের সূত্র ধরে দৈনিক কালবেলার প্রতিবেদন, এটা কী? এখানে বিষয়টা যতটা না বাস্তবতাকে তুলে ধরে, তারচেয়ে হার্ডলাইনের একটা প্লট তৈরির চেষ্টা বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা অবস্থানে রয়েছে। সরকার দলটির প্রতি কঠোর। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ধারণা নির্বাচিত সরকার আসলে পরিস্থিতি বদলে যাবে। তাদের ধারণায় যুক্তি থাকতে পারে, কিন্তু গত আট মাসের পরিস্থিতি বলছে কী? গত আট মাসে সরকার-প্রশাসন ও বৈষম্যবিরোধীদের মব থেকে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী যত বেশি নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তারচেয়ে কি কম হয়েছেন বিএনপি ও জামায়াতের দ্বারা? হিসাব মেলাতে পারেন এক্ষেত্রে তারা।

নির্বাচন দেশে যেদিনই হবে সে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশগ্রহণ করলেও জিততে পারবে না। সারাদেশে যতই তাদের কোটি কোটি দলীয় ভোটার থাকুক না কেন, সামনের নির্বাচনে তাদের জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা আমি অন্তত দেখি না। আর আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণার কোন সরকারি ফরমান এলে, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা পরেও দেশে নির্বাচন আয়োজন কঠিন বলে মনে হয়। এক্ষেত্রে আরেক ওয়ান-ইলেভেন ঘটলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। যদিও আগামী নির্বাচনের আগে দেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফেরার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রসঙ্গ যখন তুললাম তখন বলে রাখি আপিল বিভাগে এই সরকার ব্যবস্থা নিয়ে রিভিউ আবেদন শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। আগামী ৮ মে এর ধার্য দিন। ধারণা করছি এটা টেনে বেশ লম্বা হতে যাচ্ছে!

আগামীতে যদি বিএনপির সরকার গঠন করে, তবে মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের আমলের চাইতে আরও বেশি নির্যাতনের শিকার হতে পারে আওয়ামী লীগ। এই আশঙ্কার কারণ মূলত নিপীড়নের মাত্রার শুরু হয় মূলত রেখে যাওয়া অবস্থান থেকে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে যা হচ্ছে তারচেয়েও কঠোর ও নগ্ন হতে পারে সে রূপ।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অনির্বাচিত বলে স্বাভাবিকভাবে এটা দুর্বল সরকার। কিন্তু নির্বাচিত সরকারের পক্ষে সারাদেশে বিপুল সংখ্যক ভোটার ও সমর্থকের সমর্থন থাকার কারণে তারা শক্তিশালী অবস্থান ধরে রাখতে সমর্থ হয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যেখানে সামান্য কিছু সময়ের জন্যে ক্ষমতাসীন, সেখানে নির্বাচিত সরকারের হাতে সময় থাকে কমপক্ষে পাঁচ বছর। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার যে পথ রচনা করেছে অন্তর্বর্তী সরকার, নির্বাচিত সরকার মূলত সেখান থেকেই শুরু করবে। কিংস পার্টি হিসেবে ন্যাশনাল সিটিজেন পার্ট-এনসিপি যতই থাকুক না কেন, এদের প্রভাব সারাদেশে নেই। ফলে প্রান্তিক পর্যায়ে যে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী নির্যাতিত হচ্ছেন, সেখানে সরকারের সরাসরি হাত নেই। ওই নির্যাতন করছেন বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীরা। সরকারের ভূমিকা এখানে কেবল আইন প্রয়োগে অনীহা এবং বিশৃঙ্খলাকারীদের প্রশ্রয় দেওয়া।

বিএনপি নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠনের পর দলটির নেতাকর্মীরা আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে ওঠতে পারে। ফলে যে রাজনৈতিক নিপীড়ন চলছে এখন দেশব্যাপী, এটা আরও বিস্তৃত হতে পারে। আগে আওয়ামী লীগ সারাদেশে বিএনপি-জামায়াতকে মাঠের রাজনীতি করতে দেয়নি, তবে এর প্রতিশোধ হিসেবে দলগুলো আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বেঁচে থাকাটাই কঠিন করে তুলতে পারে। আট মাসের দেশ পরিস্থিতি সে ইঙ্গিত দিচ্ছে। যে নিপীড়ন চলমান, সেটার স্থায়িত্ব বাড়বে বৈ কমার লক্ষণ দেখি না।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর যতই হম্বিতম্বি আর উপস্থিতি দেখাক না কেন জামায়াতে ইসলামী ও ধর্মভিত্তিক দলগুলো, তাদের জনসমর্থন উল্লেখের মতো নয়। আওয়ামী লীগ মাঠের রাজনীতিতে ফিরতে না পারার কারণে দেশে গণসম্পৃক্ত দল হিসেবে টিকে আছে কেবলই বিএনপি। যে কিংস পার্টি বা এনসিপিকে নিয়ে গণমাধ্যমের বাড়াবাড়ি ও কাড়াকাড়ি চলছে, তারা মূলত ফেসবুক ও গণমাধ্যমকেন্দ্রিক দল। এদের একজন নেতাও সারাদেশে মিলবে কিনা সন্দেহ যারা জামানত ধরে রাখার যোগ্যতা রাখেন। তাদের কাউকে এককভাবে নির্বাচন করে সংসদ পর্যন্ত পৌঁছার সক্ষমতা আমি দেখি না। এমপি হতে তাদের বিএনপির পুরো দলীয় সমর্থন লাগবেই লাগবে। অন্যথায় সম্ভব নয়। অর্থাৎ এনসিপির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ বিএনপির ওপর নির্ভরশীল।

এনসিপি বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্রমে অপ্রাসঙ্গিক হতে চলেছে। বিশেষ করে সেনাবাহিনী নিয়ে এনসিপি নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহর ফেসবুক স্ট্যাটাসের পর তারা যেভাবে সেনাবাহিনীর ধমক খেয়েছে, সেটা মোকাবেলা করা কঠিন তাদের জন্যে। খেয়াল করলে দেখবেন, এরপর থেকে তাদের রাজনীতি অনেকটাই স্থবির। কিছু মিডিয়া তাদের কিছু কর্মসূচির কভারেজ দিচ্ছে ও মন্তব্য নিচ্ছে; এর বেশি কিছু নয়। অথচ এই দল গঠনের দেড় মাসও হয়নি। আত্মপ্রকাশের মাত্র দেড় মাসে একটা দল এভাবে হারাতে বসবে, এমনটা কেউ আগে ভাবেনি।

মনে হচ্ছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন নামের প্ল্যাটফরম থাকাকালেই তারা অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক ও শক্তিশালী ছিল। রাজনীতির ময়দানে টিকে থাকতে হলে যে ধীশক্তি, প্রজ্ঞা, সততা ও দূরদর্শিতার দরকার এনসিপির কম বয়েসি নেতাদের কারো মধ্যে তার কিছু আছে বলে ইঙ্গিত মেলেনি। ফলে তাদের ভবিষ্যৎ যে অনিশ্চয়তা এটা এখনই বলে দেওয়া সম্ভব।

এই যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি, এমতাবস্থায় আগামী ডিসেম্বরে, বা পরের বছরের মার্চে বা আর জুনে যখনই হোক, নির্বাচনে জিততে পারে বিএনপিই। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিলেও ভোটের প্রচারণা ভালোভাবে করতে পারবে না, করতে পারলেও ভোট নিজেদের পক্ষে নিতে পারবে না, দলীয় নিজস্ব ভোটারদের ভোট নিজদের পক্ষে নিলেও সেটা ফলাফলে প্রকাশ্য করতে পারবে না বলে মনে হচ্ছে। প্রশাসনের যে লোকগুলো গত দেড় দশক আওয়ামী লীগের প্রতি আনুগত্য দেখিয়েছে, নির্বাচনের সময়ে তারা আরও বেশি আওয়ামী লীগের প্রতি বিরূপ আচরণ করবে বলে ধারণা। কারণ তারা তাদের আগের ট্যাগ সরাতে মরিয়া হয়ে ওঠতে পারে। এটা আদর্শিক বিষয় নয়, নিজেদের ক্যারিয়ারকে টিকিয়ে রাখতে আওয়ামী লীগবিরোধী প্রমাণের চেষ্টা থেকেই হতে পারে।

যে আওয়ামী লীগ বর্তমানে বিএনপির সুরে নির্বাচন-নির্বাচন করছে, তাদের ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নির্ধারণ করতে হবে এখনই। তাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা কি বিএনপিকে ক্ষমতায় বসাতে চাইছে? মুহাম্মদ ইউনূসের বদলে যে কেউই ক্ষমতায় আসুক তাদেরকে স্বাগত জানানোর যে অবস্থানে এখন আওয়ামী লীগ, সেই অবস্থান ধরে রাখা কি এখন যৌক্তিক হবে তাদের? কারণ বিএনপি ক্ষমতায় এলে তারা যে চলমান নিপীড়ন থেকে আওয়ামী লীগকে মুক্তি দেবে, সে নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারবে না। বরং এরচেয়ে বেশি নিপীড়নের শিকার হতে পারে দলটি।

আওয়ামী লীগকে ভুলে গেলে চলবে না গত দেড় দশক তারা বিএনপির প্রতি কেমন মনোভাব ও কেমন আচরণ করত; তাদের ভুলে গেলে চলবে না একুশে আগস্টের ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার কথা। এক্ষেত্রে তারা কি মুহাম্মদ ইউনূস সরকারকে মেনে নেবে? ভবিষ্যতের কথা ভেবে এই কৌশলের আশ্রয় নেওয়া ছাড়া উপায় কী!

বিএনপির ক্ষমতায় যাওয়ার পথ কঠিন করে দিতে আওয়ামী লীগকে এখন থেকে মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের বিষয়ে অনেকটা কৌশলী আপসের রাজনীতি শুরু করতে হবে। দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে নির্বাচনের দরকার নাই—ঠিক এই কথাটা বলতে পারলেই আপসের পথ পরিস্কার। মুখোমুখি হয়ে পড়তে শুরু করবে বিএনপি ও সরকার। সরকার ও বিএনপি মুখোমুখি হলে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে যাবে এমন না, তবে দলটি রাজনৈতিক মাঠে স্পেস পেতে শুরু করবে।

মামলা-বিচার নিয়ে আওয়ামী লীগের উদ্বেগের কিছু নাই। এটা ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক মামলা ও রাজনৈতিক বিচার বলে দেশে-বিদেশে পরিচিতি লাভ করেছে। এছাড়া বিচারিক প্রক্রিয়া দীর্ঘ। নিম্ন আদালতের রায় থেকে চূড়ান্ত রায়; অনেক দীর্ঘ পথ। এছাড়া রাজনীতি করতে হলে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের জেলে যাওয়ার মানসিক প্রস্তুতিও নিয়ে রাখতে হবে। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর ২১ বছর ক্ষমতার বাইরে থেকেছিল আওয়ামী লীগ। এবার শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর মাত্র ৮ মাস পার হলো। এই অল্প সময়ে ধৈর্য হারালে চলবে কেমনে তাদের? বঙ্গবন্ধু তার ৫৫ বছরের জীবনে ১৩ বছরের বেশি সময় জেলে কাটিয়েছেন, শেখ হাসিনা একাধিকবার জেলে গেছেন। আওয়ামী লীগের আগের নেতারাও একইভাবে জেল-জুলুম-হুলিয়া মোকাবেলা করে রাজনীতি করে গেছেন। এই সময়ের আওয়ামী লীগের বেশিরভাগই ক্ষমতায় থাকতে-থাকতে আওয়ামী লীগ হয়েছে বলেই কিনা মাত্র ৮ মাসে এত উতলা হয়ে গেছে!

আওয়ামী লীগের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপি। মুহাম্মদ ইউনূসের সরকারকে প্রতিপক্ষ এই মুহূর্তে ভাবা মানে বিএনপির ক্ষমতায় যাওয়ার পথ রচনা করা। সরকার থেকে শুরু করে দেশে এই মুহূর্তে ক্রিয়াশীল সকল রাজনৈতিক দলই আওয়ামী-জুজুতে ভুগছে। এই জুজু সরকার ও আওয়ামী লীগের আপসের পথ রচনায় সহায়ক হতে পারে।

মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অনির্বাচিত, অবৈধ, অগণতান্ত্রিক ও দখলদার সরকার; ঠিক এই যুক্তিতে আওয়ামী লীগের যারা এই সরকারকে সময় দিতে রাজি না, তারা এতদিন কী এমন নিয়মতান্ত্রিক কাজ করেছেন? ২০০৮ সালের পর দেশে কি কোন গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হয়েছে? ২০১৪ সালের নির্বাচনে অর্ধেকের বেশি সংসদ সদস্য বিনা ভোটে নির্বাচিত হয়ে গেলন, ২০১৮ সালের নির্বাচনের ফলাফল তো আরও বেশি বিতর্কিত, এবছরের শুরুতে যে নির্বাচন হয়েছে সেটা কেমন, তা সবাই জানে। এক্ষেত্রে হঠাৎ করে গণতন্ত্রের প্রতি মায়াকান্না করে লাভ আছে? এই মুহূর্তের পরিস্থিতির চাইতে আওয়ামী লীগের আমলে দেশপরিস্থিতি উন্নত ছিল ঠিক আছে, কিন্তু হারানো আসন ফিরে পাওয়ার পথ রচনা করেতে এক্ষেত্রে কৌশলের আশ্রয় নেওয়া ছাড়া উপায় কী!

ক্ষমতার স্বাদ আস্বাদে ঘটি চোরেরাও করতে বসে পুকুর চুরি; জাতীয় পার্টি-বিএনপি-আওয়ামী লীগ-ফখরুদ্দিন মইনুদ্দিনের তত্ত্বাবধায়ক সরকার থেকে শুরু করে মুহাম্মদ ইউনূসের এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, কেউ বাদ নেই! আর যারা ক্ষমতায় যেতে পারেনি কখনো, তারাও আছে একই ধান্দায়।

আমি ঠিক নিশ্চিত না, আওয়ামী লীগ ও দলটির নেতাকর্মীরা আপসের পথে যাওয়াকে যৌক্তিক ভাবছেন কিনা! তবে আপনারা যখন মাঠে নামতেই পারছেন না, দলের উল্লেখের মতো কোন নেতা যখন জনসম্মুখে আসার সাহস করছেন না, তখন এছাড়া আর উপায় কী! সিরাজগঞ্জ-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ডা. আবদুল আজিজ সেদিন জামিন পেয়ে কারামুক্ত হন। এরপর মব সৃষ্টি করে তার ওপর হামলা চালানো হয়। প্রশাসন যথারীতি নির্বিকার। কই আওয়ামী লীগের মোটে দশজন লোক দাঁড়াতে পেরেছেন কি নিজেদের দলীয় নেতার পক্ষে? পারেননি। তাহলে কীভাবে সাহস করেন আন্দোলনের এই মুহূর্তে? যে ৮৪ আওয়ামীপন্থী আইনজীবীকে নজিরবিহীনভাবে সেদিন কারাগারে পাঠানো হলো, তার বিরুদ্ধে কি কোন দৃশ্যমান প্রতিবাদ করতে পেরেছেন? পারেননি। তাহলে কীভাবে চিন্তা করেন যে, এই মুহূর্তে আপনাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সহায়ক পরিবেশ রয়েছে বাংলাদেশে?

হ্যাঁ, এইধরনের কর্মকাণ্ডসহ আরও অনেক কিছুর কারণে সরকার বিতর্কিত হয়েছে। কিন্তু সরকার বিতর্কিত হয়ে যাওয়া মানে আপনাদের জনসমর্থন বেড়ে যাওয়া নয়। তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নিই আপনাদের জনসমর্থন বেড়েছে, তবে এটাকে নিজেদের পক্ষে নেওয়ার সক্ষমতা কি রয়েছে আপনাদের? নাই; একদম নাই। সক্ষমতা বাড়াতে এক্ষেত্রে প্রথম কাজ হচ্ছে সরকার ও বিএনপির মধ্যে দূরত্ব তৈরি করা। এই দূরত্ব তৈরি করার একটাই পথ রয়েছে, এবং সেটা নির্বাচন প্রলম্বিত করা। বিএনপি আশায় আছে ডিসেম্বরে নির্বাচন হবে। ডিসেম্বরে নির্বাচন না হলে হয়ত তারা আগামী মার্চ পর্যন্ত সময় দিতে পারে সরকারকে। মার্চে নির্বাচন না হলে এরপর আর সরকারকে তারা সময় দিতে রাজি হবে কিনা সন্দেহ। তখন তারা সরকারের বিরুদ্ধে মাঠের কোন কর্মসূচি দলে সরকার নিজেদের প্রয়োজনে আওয়ামী লীগের দিকে চেয়ে থাকবে। আওয়ামী লীগের তখন সহজ হবে মাঠের দখল নেওয়ার।

সরকারের নানা সংস্কারে একবাক্যে সমর্থন না দেওয়া; সংবিধান নিয়ে ভিন্নমত; জুলাই প্রক্লেমেশন নিয়ে আপত্তি, মহামান্য রাষ্ট্রপতিকে সরিয়ে দেওয়া নিয়ে আপত্তিসহ আরও অনেক কিছুতে কৌশলগত কারণে বিএনপি সরকারকে সমর্থন দেয়নি। দলটি সরকারের নানা কর্মসূচির না থাকলেও সরাসরি সরকারের বিপক্ষে যাচ্ছে না। তাদের এই অবস্থান কৌশলগত। তারা জানে সরকারের সঙ্গে দূরত্ব সৃষ্টি মানে আওয়ামী লীগের ফিরে আসার পথ রচনা। তারা তাড়াহুড়ো করছে না। বিএনপিকে দিয়ে চাপে আছে সরকার, সঙ্গে আছে তাদের আওয়ামী লীগের ফিরে আসার জুজু। এখানে যদি আবার আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকেও নির্বাচনের চাপ থাকে সরকারের ওপর, তবে সরকারকে বিএনপির দিকে হেলে থাকা ছাড়া উপায় কী!

আওয়ামী লীগের অতি-আবেগী একটা অংশ প্রায় প্রতিসন্ধ্যায় বিশ্বাস করে এই রাত বুঝি শেষ রাত হতে যাচ্ছে মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের। প্রধান উপদেষ্টার প্রত্যেক বিদেশ সফরের আগে ভাবে এই সফর বুঝি শেষ সফর তার। এমন অনেক গুজবের রাত আমরা পার করে এসেছি। এমন প্রচার চালায় যারা, তাদের প্রত্যেকেই যেন একেকজন ‘ধর্মের ষাঁড়’। নিজেদের কাজ বাদ দিয়ে তাদের এই গয়ংগচ্ছে রাজনীতির মাঠে হয় স্বখাত সলিল।

ঢাল নাই তলোয়ার নাই নিধিরাম সর্দার হয়ে ভোটের মাঠে গিয়ে লাভ কী আওয়ামী লীগের? তারচেয়ে বরং দুই থেকে তিন বছর বিএনপিকে ক্ষমতার বাইরে রাখতে পারলে অনেক কিছু বদলে যাবে। বিএনপির যে অংশ মুহাম্মদ ইউনূসের সরকারকে নিজেদের সরকার ভাবছে, তারাও ভুল বুঝতে পারবে। তারা নিজেদের প্রতারিত ভাবতে শুরু করবে। এটা অবিশ্বাস করার উপায় নাই যে, উপদেষ্টা পরিষদ থেকে শুরু করে সরকারের বিভিন্ন জায়গায় আওয়ামী লীগের লোকজনের অভাব নাই। পরিস্থিতি বিবেচনায় তারা চুপ। যুদ্ধজয়ের কৌশল হিসেবে আপসহীনতার চাইতে আপস এবং পিছু হটার অভিনয় আওয়ামী লীগের জন্যে এক্ষেত্রে বেশি কার্যকর হতে পারে।

এনসিপি-বিএনপি-জামায়াতসহ অনেক দলের নেতারা এরইমধ্যে বলতে শুরু করেছে, সরকারের কোন কোন জায়গা থেকে আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনের চেষ্টা চলছে। তাদের সেই অভিযোগ অথবা আশঙ্কাকে জিইয়ে রাখতে কৌশলের বিকল্প নাই। এতে তাদের মধ্যে সন্দেহ বাড়তে থাকবে। সরকার ও দেশে ক্রিয়াশীল দলগুলোর মধ্যে এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে দৃঢ় ঐক্য রয়েছে। তারা একে অন্যদের বিরুদ্ধে বলছে ঠিক, কিন্তু আওয়ামী লীগ প্রশ্নে এখনো তারা ঐক্যবদ্ধ। এই ঐক্য থাকা পর্যন্ত রাজনীতির মাঠে আওয়ামী লীগের ফিরে আসা কঠিন। ফিরে আসতে তাই ঐক্যের বিরুদ্ধে কৌশলের বিকল্প নাই। আপস নামের কৌশল এক্ষেত্রে হতে পারে ব্রহ্মাস্ত্র। আওয়ামী লীগের কৌশলী আপস হতে পারে প্রতিপক্ষের জন্যে ঘুণপোকা বিশেষ।

ঘুণপোকা; এই ঘুণপোকার চরিত্র তো কারো অবিদিত নয়!

কবির য়াহমদ: সাংবাদিক, কলাম লেখক।
ইমেইল: kabiraahmed007@gmail.com
১১ এপ্রিল ২০২৫

আরও খবর

Sponsered content