প্রতিনিধি ২৭ জুন ২০২৫ , ৪:৩৯:৩৮ প্রিন্ট সংস্করণ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: সম্প্রতি ১২ দিনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার যুদ্ধবিরতির আবহেও মিলছে নতুন চমকে দেওয়া তথ্য। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ বৃহস্পতিবার চ্যানেল ১৩-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বিস্ফোরকভাবে স্বীকার করেছেন যে, সংঘর্ষ চলাকালীন সময় ইসরায়েল ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যা করার পরিকল্পনা করেছিল।
“আমরা খামেনিকে হত্যা করতে চেয়েছিলাম” — কাটজ : সাক্ষাৎকারে ইসরায়েল কাটজ বলেন, “আমরা খামেনিকে হত্যা করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সেই সময় একটি উপযুক্ত সামরিক সুযোগ তৈরি হয়নি।” তিনি আরও জানান, এই পরিকল্পনার খবর আগেই আঁচ করতে পেরে খামেনি আত্মগোপনে চলে যান এবং বিপ্লবী গার্ডের নিহত কমান্ডারদের স্থলাভিষিক্ত নতুন নেতৃত্বের সঙ্গেও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
তবে এই দাবির সঙ্গে বাস্তবতা কিছুটা বিরোধপূর্ণ। যুদ্ধ চলাকালীন সময় আয়াতুল্লাহ খামেনি একাধিক ভিডিও বার্তায় উপস্থিত ছিলেন এবং সেনাবাহিনীর উচ্চ পর্যায়ের কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও তাঁর সম্পৃক্ততার প্রমাণ রয়েছে। ফলে কাটজের কিছু বক্তব্যের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অনুমতির প্রয়োজন হয়নি? :
কাটজ জোর দিয়ে বলেন, এই হত্যাচেষ্টার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কোনো অনুমতি লাগতো না। এ বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি পূর্বের সেইসব প্রতিবেদনকে নাকচ করে দেন, যেখানে বলা হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র খামেনিকে হত্যা করার পরিকল্পনায় ‘না’ বলে দেয়।
কেন এই স্বীকারোক্তি গুরুত্বপূর্ণ? :
খামেনি শুধু ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নন, তিনি বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি শিয়া মুসলমানের কাছে ধর্মীয় নেতৃবর্গের মধ্যে অন্যতম। তাঁর বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টা সংঘটিত হলে তা হতো এক বিস্ফোরক আন্তর্জাতিক সংকট—মধ্যপ্রাচ্যসহ গোটা মুসলিম বিশ্বে যার প্রভাব পড়ত।
ট্রাম্পের সমর্থন, নেতানিয়াহুর আত্মতৃপ্তি :
ইসরায়েলের এই হামলার পরিকল্পনার পেছনে ছিল যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক সহায়তা। কাটজ জানান, ইরান যদি আবার পারমাণবিক কর্মসূচি জোরদার করার চেষ্টা করে, তাহলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরায়েলকে পুনরায় হামলার অনুমতি দিয়েছেন।
অন্যদিকে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এক ভিডিও বার্তায় বলেন, “আমরা সাহসিকতার সঙ্গে লড়াই করেছি এবং একটি বড় বিজয় অর্জন করেছি। এই বিজয় আমাদের আরব দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে সহায়ক হবে।”
তিনি এ সময় ২০২০ সালের ‘আব্রাহাম চুক্তি’-এর প্রসঙ্গও টেনে আনেন।
ইরানের জবাব: আমাদের কর্মসূচি অক্ষত:
যুদ্ধ শেষ হলেও দুই পক্ষই নিজেদের বিজয়ী হিসেবে ঘোষণা করেছে।
ইরানের দাবি: তারা ইসরায়েলের মূল লক্ষ্য—তেহরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে ধ্বংস করা—ব্যর্থ করে দিয়েছে।
ইসরায়েলি হামলার জবাবে তেহরানও পাল্টা হামলা চালিয়ে ইসরায়েলের অভ্যন্তরে বিপুল ক্ষয়ক্ষতি ঘটিয়েছে, যার পরিণতিতে নেতানিয়াহুকে যুদ্ধ থামাতে বাধ্য হতে হয়েছে।
বিশ্লেষণ: মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের দিকেও নজর:
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রীর এই স্বীকারোক্তিকে অনেকেই দেখছেন মনস্তাত্ত্বিক কৌশল হিসেবে, যেখানে যুদ্ধশেষে নিজের অবস্থান দৃঢ় করার জন্য শক্তি প্রদর্শনের ভাষায় কথা বলছে তেল আবিব। তবে এটি একদিকে যেমন ইসরায়েলের সাহসিকতার প্রকাশ, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টিতে একটি বিপজ্জনক নজিরও হতে পারে।
এই স্বীকারোক্তি প্রমাণ করে যে, ইরান-ইসরায়েল সংঘর্ষ শুধু মাঠের লড়াই নয়, এটি একটি গভীর রাজনৈতিক, আদর্শিক এবং মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। যেখানে শুধু ক্ষেপণাস্ত্র নয়, প্রতিটি পদক্ষেপ কূটনৈতিক ও সামরিক হিসাব-নিকাশে ঠাসা। খামেনিকে হত্যার পরিকল্পনা প্রকাশে আসার পর এই অঞ্চলের উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত হলেও নতুন করে অস্থিরতার আশঙ্কা আবারও উঁকি দিচ্ছে।
সূত্র: আলজাজিরা, চ্যানেল ১৩ (ইসরায়েল)




















