হুমায়ুন কবির, ঠাকুরগাঁও সংবাদদাতা: ২৯ মে ২০২৬ , ১১:৫১:৪৫ প্রিন্ট সংস্করণ
পবিত্র ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর দেশের চামড়া শিল্পে যে অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়, চলতি বছর তার উল্টো চিত্র দেখা গেছে ঠাকুরগাঁওয়ে। সরকারের পক্ষ থেকে কোরবানির পশুর চামড়ার দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়া হলেও বাস্তব বাজারে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি। জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও হাট-বাজারে অস্বাভাবিক কম দামে চামড়া বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন সাধারণ মানুষ ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা।
কোথাও কোথাও গরুর চামড়া বিক্রি হয়েছে মাত্র ৪০০ থেকে ৬০০ টাকায়। অন্যদিকে ছাগলের চামড়া ১০ থেকে ২০ টাকাতেও কিনতে আগ্রহ দেখাননি অনেক ক্রেতা।
বৃহস্পতিবার (২৮ মে) বিকেল থেকে শুক্রবার (২৯ মে) সকাল পর্যন্ত ঠাকুরগাঁও সদর, রাণীশংকৈল, বালিয়াডাঙ্গী, হরিপুর ও পীরগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন চামড়া ক্রয়-বিক্রয় কেন্দ্র ঘুরে এমন হতাশাজনক চিত্র দেখা গেছে। বাজারজুড়ে বিরাজ করছে চরম অস্থিরতা, হতাশা ও অনিশ্চয়তা।
বিক্রেতাদের অভিযোগ, সরকার দাম নির্ধারণ করলেও মাঠপর্যায়ে তার কার্যকর বাস্তবায়ন নেই। ফলে সিন্ডিকেটনির্ভর বাজারে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী চামড়া কিনে নিচ্ছেন নামমাত্র মূল্যে।
সরকার চলতি বছর ঢাকার বাইরে প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম ৫৭ থেকে ৬২ টাকা এবং খাসির চামড়ার দাম ২৫ থেকে ৩০ টাকা নির্ধারণ করেছে। অথচ বাস্তবে সেই মূল্যের ধারেকাছেও পৌঁছাচ্ছে না বাজার। অনেক ক্ষেত্রে বড় আকারের গরুর চামড়াও বিক্রি হয়েছে মাত্র ৫০০ থেকে ৭০০ টাকায়।
সদর উপজেলার বাসিন্দা আমিনুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এক লাখ টাকা দিয়ে গরু কিনলাম, অথচ সেই গরুর চামড়া বিক্রি করতে হলো মাত্র সাড়ে পাঁচশ টাকা। চামড়ার কোনো দাম নেই, আবার কেনার লোকও নেই।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক বিক্রেতা বলেন, “সিন্ডিকেটের কারণেই আমরা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছি না। চামড়ায় সামান্য দাগ থাকলেও ক্রেতারা নিতে চায় না। অথচ এই চামড়া দিয়েই পরে হাজার হাজার টাকার জুতা-বেল্ট তৈরি হয়। লাভটা যায় বড় ব্যবসায়ীদের পকেটে, আর ক্ষতির বোঝা বইতে হয় সাধারণ মানুষকে।”
স্থানীয় বাসিন্দা সাদেক হোসেন বলেন, কোরবানির পশুর চামড়া মূলত এতিম-মিসকিনদের হক হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় অনেকেই হতাশ হয়ে পড়ছেন। কেউ কেউ চামড়া সংরক্ষণ করতে না পেরে ফেলে দিতেও বাধ্য হচ্ছেন।
তিনি বলেন, “সরকার শুধু দাম ঘোষণা করলেই হবে না, মাঠপর্যায়ে তার বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।”
জেলার মৌসুমি ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, পর্যাপ্ত লবণ ও সংরক্ষণ সুবিধার অভাবে তারা বাধ্য হয়ে কম দামে চামড়া বিক্রি করছেন। এছাড়া গত বছরের লোকসানের অভিজ্ঞতাও তাদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করেছে। অনেক ব্যবসায়ী চামড়া কিনে সংরক্ষণ করতে না পেরে ক্ষতির মুখে পড়েছিলেন। ফলে এবার ঝুঁকি নিতে চাইছেন না অনেকে।
স্থানীয় চামড়া ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম বলেন, “বড় ট্যানারি মালিক কিংবা ঢাকার আড়তদাররা সরাসরি বাজারে না আসায় স্থানীয় পর্যায়ে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। সংরক্ষণ সংকট ও পরিবহন ব্যয়ও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
বিশ্লেষকদের মতে, দেশের চামড়া শিল্প একসময় তৈরি পোশাক খাতের পর দ্বিতীয় বৃহৎ রপ্তানিমুখী খাত হিসেবে বিবেচিত হলেও অব্যবস্থাপনা, সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ, আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাব এবং কার্যকর বাজার তদারকির সংকটে সেই সম্ভাবনা হুমকির মুখে পড়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু দাম নির্ধারণ করলেই হবে না; সরাসরি ট্যানারির মাধ্যমে চামড়া সংগ্রহ, উপজেলা পর্যায়ে সংরক্ষণাগার নির্মাণ, সরকারি তদারকি জোরদার এবং অসাধু সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায় দেশের সম্ভাবনাময় চামড়া শিল্প আরও গভীর সংকটে পড়বে এবং ক্ষতিগ্রস্ত হবেন প্রান্তিক বিক্রেতা ও এতিম-মিসকিনদের অধিকারভোগীরা।




















