রাজনীতি

ঠাকুরগাঁও-১ আসনে মির্জা পরিবারের উত্তরাধিকার নিয়ে নতুন হিসাব

  ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি ২৩ আগস্ট ২০২৬ , ৫:২৯:৪২ প্রিন্ট সংস্করণ

একটি আসন, একটি পরিবার এবং রাজনৈতিক উত্তরাধিকার—এই তিন বিষয়কে ঘিরেই এখন সরগরম ঠাকুরগাঁও-১ আসনের রাজনীতি। রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের শপথের পর তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এ আসনটি শূন্য হয়েছে। উপনির্বাচনের তফসিল এখনো ঘোষণা হয়নি। তবে এরই মধ্যে বিএনপির স্থানীয় রাজনীতিতে শুরু হয়েছে সম্ভাব্য প্রার্থী নিয়ে নানা হিসাব-নিকাশ।

সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন মির্জা ফখরুলের ছোট ভাই, ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক পৌর মেয়র মির্জা ফয়সাল আমিন এবং তাঁর বড় মেয়ে শামারুহ মির্জা। একজন দীর্ঘদিনের মাঠের রাজনীতির পরীক্ষিত মুখ, অন্যজন নতুন প্রজন্মের শিক্ষিত ও পেশাজীবী প্রতিনিধি। ফলে মির্জা পরিবারের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার শেষ পর্যন্ত কার হাতে যাচ্ছে—ভাই, নাকি মেয়ে—এ প্রশ্নই এখন স্থানীয় বিএনপিতে সবচেয়ে বেশি আলোচিত।

তবে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে আলোচনা থাকলেও এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। দলীয় সূত্র ও স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উপনির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রার্থী বাছাইয়ের প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। এরপর দলীয় চেয়ারম্যান তারেক রহমান চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন। একই সঙ্গে মির্জা ফখরুলের মতামতও প্রার্থী নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয় নেতাদের অনেকে।

মির্জা পরিবারের দীর্ঘ রাজনৈতিক উত্তরাধিকার

ঠাকুরগাঁও-১ আসনটি দীর্ঘদিন ধরেই মির্জা পরিবারের রাজনৈতিক প্রভাববলয়ের অন্যতম কেন্দ্র। সদর, ভুল্লি ও রুহিয়া নিয়ে গঠিত এ আসনে মির্জা ফখরুলের বাবা প্রয়াত মির্জা রুহুল আমিনও সংসদ সদস্য ছিলেন। আইনজীবী মির্জা রুহুল আমিন পাকিস্তান প্রাদেশিক আইনসভার দুইবার সদস্য ছিলেন।

বাবার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ধারণ করেই জাতীয় রাজনীতিতে উত্থান ঘটে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের। ১৯৯০ সালে বিএনপিতে যোগ দেওয়ার পর ১৯৯২ সালে তিনি ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি হন। পরে দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব ও ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করে ২০১৬ সালে বিএনপির মহাসচিব হন তিনি।

সর্বশেষ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে নির্বাচিত হয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও পালন করেন তিনি। পরে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে বঙ্গভবনের দায়িত্ব গ্রহণ করায় সাংবিধানিক নিয়মে তাঁর সংসদীয় আসনটি শূন্য হয়েছে।

আলোচনায় ফয়সাল আমিন

সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় থাকা মির্জা ফয়সাল আমিন বর্তমানে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি। এর আগে তিনি ঠাকুরগাঁও পৌরসভার মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। জেলা ও সদর উপজেলা বিএনপির বিভিন্ন সাংগঠনিক দায়িত্বেও দীর্ঘদিন ছিলেন তিনি।

স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের একটি অংশের মতে, তৃণমূলের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সরাসরি যোগাযোগই ফয়সাল আমিনের বড় শক্তি। আন্দোলন-সংগ্রাম থেকে শুরু করে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকায় দলের একটি অংশ তাঁকে ‘পরীক্ষিত’ প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করছে।

তাদের যুক্তি, উপনির্বাচনের মতো স্বল্প সময়ের নির্বাচনী লড়াইয়ে এমন একজন প্রার্থী প্রয়োজন, যিনি দ্রুত দলীয় নেতাকর্মীদের সংগঠিত করতে পারবেন, সাংগঠনিক কাঠামো সক্রিয় করতে পারবেন এবং স্থানীয় পর্যায়ে দলের ঐক্য ধরে রাখতে পারবেন। এ বিবেচনায় ফয়সাল আমিনকে এগিয়ে রাখছেন তাঁর সমর্থকেরা।

তবে সাংগঠনিক অভিজ্ঞতার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে তাঁর গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টিও মনোনয়ন দৌড়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা।

নতুন প্রজন্মের মুখ শামারুহ মির্জা

অন্যদিকে সরাসরি দলীয় রাজনীতির মাঠে দীর্ঘদিন সক্রিয় না থাকলেও মির্জা ফখরুলের বড় মেয়ে শামারুহ মির্জার নামও জোরালোভাবে আলোচনায় এসেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা ও শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা রয়েছে শামারুহ মির্জার। বর্তমানে তিনি অস্ট্রেলিয়ায় পোস্টডক্টরাল গবেষক হিসেবে কাজ করছেন। দীর্ঘ সময় সরাসরি দলীয় রাজনীতিতে সক্রিয় না থাকলেও সামাজিক ও মানবিক কর্মকাণ্ডে তাঁর সম্পৃক্ততা স্থানীয় পর্যায়ে আলোচিত হয়েছে।

স্থানীয়দের অনেকে বলছেন, করোনাকালে এবং ঠাকুরগাঁওয়ের অসচ্ছল মানুষের চিকিৎসা ও মানবিক সহায়তায় তাঁর ভূমিকা তাঁকে সাধারণ মানুষের কাছে পরিচিত করেছে। নারী ক্ষমতায়ন ও সামাজিক সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ডেও তাঁর অংশগ্রহণ রয়েছে বলে স্থানীয়ভাবে আলোচনা রয়েছে।

সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও বাবা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের পক্ষে এলাকায় সক্রিয়ভাবে প্রচার-প্রচারণায় অংশ নেন শামারুহ। ফলে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ আগের তুলনায় আরও দৃশ্যমান হয়েছে।

শামারুহকে প্রার্থী করার পক্ষে থাকা বিএনপির একটি অংশ মনে করছে, তাঁকে সামনে আনা হলে মির্জা পরিবারের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নতুন প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়ার পাশাপাশি তুলনামূলক নতুন নেতৃত্বও প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব হবে। তাঁর শিক্ষাগত ও পেশাগত পরিচয় জাতীয় রাজনীতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিসরেও ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরিতে সহায়ক হতে পারে বলে মনে করছেন তাঁর সমর্থকেরা।

সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় ঠাকুরগাঁও

সব মিলিয়ে ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচন ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন একটাই—মির্জা পরিবারের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার কি মাঠের অভিজ্ঞ নেতা মির্জা ফয়সাল আমিনের হাতে থাকবে, নাকি নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধি শামারুহ মির্জাকে সামনে আনবে বিএনপি?

তফসিল ঘোষণার আগে এ প্রশ্নের নিশ্চিত উত্তর পাওয়া কঠিন। তবে দুই সম্ভাব্য মুখকে ঘিরে স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে যে আলোচনা শুরু হয়েছে, তাতে স্পষ্ট—উপনির্বাচনের আনুষ্ঠানিক লড়াই শুরুর আগেই ঠাকুরগাঁও-১ আসনে মনোনয়ন-রাজনীতির উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে।

শেষ পর্যন্ত দলীয় চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সিদ্ধান্তেই নির্ধারিত হবে মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক ঘাঁটির নতুন কাণ্ডারি কে হচ্ছেন। সেই সিদ্ধান্ত শুধু উপনির্বাচনের প্রার্থী নির্ধারণ করবে না; ঠাকুরগাঁওয়ে মির্জা পরিবারের দীর্ঘ রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের পরবর্তী অধ্যায়ের দিকও অনেকটাই নির্ধারণ করে দিতে পারে।

আরও খবর

Sponsered content