আন্তর্জাতিক

নেপালে ফের ভয়াবহ বন্যা ডেকে আনতে পারে যে হ্রদ

  প্রতিনিধি ২৯ আগস্ট ২০২৬ , ৯:৫৫:০৪ প্রিন্ট সংস্করণ

হিমবাহ ধসে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যার দুই দিন পর নেপাল ও তিব্বতের পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। নতুন করে সৃষ্টি হওয়া একটি নদীর তীর ভেঙে যাওয়ায় আবারও বড় ধরনের বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বুধবার হিমবাহ ধসে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে নেপাল ও চীনের তিব্বত অঞ্চলে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এখন পর্যন্ত ৫৮৪ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। পাশাপাশি নেপাল ও চীনের তিব্বত অঞ্চলে ২,৪০০-এর বেশি মানুষ এখনও নিখোঁজ রয়েছেন।

বন্যার পানির সঙ্গে বয়ে আসা বিপুল পরিমাণ পাথর, বরফ, কাদা ও ধ্বংসাবশেষ নেপাল-চীন সীমান্তে নদীর প্রবাহ আটকে দেয়। এর ফলে সেখানে একটি প্রাকৃতিক বাঁধ ও নতুন হ্রদ তৈরি হয়েছে। হ্রদটির পানির স্তর ক্রমাগত বাড়তে থাকায় নতুন করে বন্যার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

কীভাবে তৈরি হলো নতুন হ্রদ?

বুধবারের হিমবাহ ধসের ফলে শুধু বন্যাই নয়, একাধিক ভূমিধসও হয়। পাথর, বরফ, কাদা ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ নদীর প্রবাহপথে গিয়ে জমা হয়ে নদীর পানি চলাচলের পথ আটকে দেয়। নেপালের কাঠমান্ডুভিত্তিক ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক পাওয়ান ভট্টরাই বলেন, নতুন হ্রদটি সম্ভবত বরফ-পাথরের ধসের কারণে সৃষ্ট একটি বেরিয়ার লেক।

Interactive_Nepal_Glacial_lake_Aug28_2026-1787915311

তার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বরফ ও পাথরের বিশাল ধসের ফলে বিপুল পরিমাণ পাথর, বরফ ও ধ্বংসাবশেষ নদীর উপত্যকায় জমা হয়। এতে পানি নিষ্কাশনের পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় অথবা ব্যাপকভাবে সংকুচিত হয়। এরপর ওই প্রাকৃতিক বাধার পেছনে পানি জমতে জমতে হ্রদ তৈরি হয়। স্যাটেলাইটের ছবি এবং চীনা কিছু গণমাধ্যমের প্রতিবেদনেও এই হ্রদ তৈরির বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে।

নেপালি গবেষক ও হিমবাহজনিত বন্যা বিশেষজ্ঞ নিতেশ খাডকা জানান, স্যাটেলাইটের ছবি ও ড্রোনের ভিডিওতে দুটি নতুন হ্রদ দেখা গেছে। একটি তৈরি হয়েছে ওপরের দিকে, আর অন্যটি লেহেন্দে নদীতে।

চীনের অংশে তৈরি ওপরের হ্রদটি হিমবাহ গলে আসা পানি জমে তৈরি হয়েছে। আর লেহেন্দে নদীর হ্রদটি ভূমিধস ও কাদামাটির স্রোতে নদীর প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে তৈরি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া এবং পুরোপুরি প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। তবে হ্রদটি বিপজ্জনক হয়ে উঠলে নিরাপদ ও নিয়ন্ত্রিতভাবে পানি বের করে দেওয়ার চেষ্টা করা যেতে পারে। কিন্তু দুর্গম ও জটিল ভূপ্রকৃতির কারণে সেটিও বাস্তবায়ন করা কঠিন।

কেন হ্রদটি এত বড় ঝুঁকি?

হঠাৎ তৈরি হওয়া হ্রদগুলোকে ধারণ করার মতো স্থিতিশীল ভূপ্রকৃতি অনেক সময় আশপাশে থাকে না। বিশেষ করে যদি হ্রদটি আলগাভাবে জমে থাকা পাথর ও কাদার তৈরি প্রাকৃতিক বাঁধের পেছনে আটকে থাকে, তাহলে পানির চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই বাঁধ ক্ষয় হতে পারে। একপর্যায়ে বাঁধ হঠাৎ ভেঙে গেলে বিপুল পরিমাণ পানি দ্রুত নিচের দিকে নেমে গিয়ে ভয়াবহ বন্যা সৃষ্টি করতে পারে।

অধ্যাপক ভট্টরাই বলেন, সবচেয়ে বড় বিপদ শুধু হ্রদটি নয়; বরং হঠাৎ প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনা। খাড়া উপত্যকায় অল্প সময়ের জন্যও বাঁধ ভেঙে গেলে দ্রুতগতির কাদা ও ধ্বংসাবশেষ বহনকারী বন্যা সৃষ্টি হতে পারে। নিচের দিকে বসবাসকারী মানুষদের সতর্ক করার জন্য তখন খুব কম সময় পাওয়া যাবে।

চীনের পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হ্রদটিতে বর্তমানে প্রায় ১৫ থেকে ২০ লাখ ঘনমিটার পানি রয়েছে। আগামী তিন দিনে আরও প্রায় ৩০ লাখ ঘনমিটার পানি হ্রদটিতে প্রবেশ করতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে। এই পরিমাণ পানি প্রায় ১,২০০টি অলিম্পিক আকারের সুইমিং পুলের পানির সমান।

নিতেশ খাডকা বলেন, হ্রদের বাঁধ হঠাৎ ভেঙে গেলে আবারও বন্যা হতে পারে। সেই বন্যার পানির সঙ্গে পলি, কাদা ও পাথর ভেসে আসবে। এতে বন্যার ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা আরও বেড়ে যাবে এবং নিখোঁজদের খোঁজ ও উদ্ধার অভিযান আরও কঠিন হয়ে পড়বে।এ ছাড়া নিচের দিকে থাকা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেল ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে কর্মরত শ্রমিক ও প্রকৌশলীরাও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। হঠাৎ বন্যার স্রোত নেমে এলে এসব টানেল ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে পানি ও ধ্বংসাবশেষ ঢুকে মানুষকে আটকে ফেলতে বা আহত করতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাকৃতিক এই প্রক্রিয়াকে পুরোপুরি থামানো সম্ভব না হলেও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, হ্রদের পানির স্তর নিরাপদভাবে কমিয়ে আনা, আগাম সতর্কতা এবং সময়মতো মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

More than 380 dead and Brits missing after Nepal flash floods — as it  happened

উদ্ধার অভিযান কী অবস্থায়?

বন্যা ও ভূমিধসের কারণে উদ্ধার অভিযান ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত নেপালের রাসুয়া জেলায় শুক্রবার বেরিয়ার লেকের বাঁধ ভেঙে পানি বেরিয়ে আসার পর উদ্ধার অভিযান সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। তবে অল্প সময়ের মধ্যেই আবার অভিযান শুরু করা হয়। চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, উপচে পড়া হ্রদ থেকে সৃষ্ট ঝুঁকি বর্তমানে ‘নিয়ন্ত্রণযোগ্য’। এদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, বন্যায় ছয়টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং আটজন স্বাস্থ্যকর্মী নিখোঁজ রয়েছেন। নেপাল জানিয়েছে, এই মুহূর্তে তাদের বিদেশি সহায়তার প্রয়োজন নেই।

নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লোক বাহাদুর ছেত্রী বলেন, বিভিন্ন দেশ সহায়তার প্রস্তাব দিচ্ছে, যা স্বাভাবিক। তবে নেপালের নিজস্ব নিরাপত্তা সংস্থাগুলো অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করছে এবং আপাতত বিদেশি সহায়তার প্রয়োজন নেই।

People walk on a suspension bridge to cross the flooded Trishuli River in Bhaise, Nuwakot, Nepal, on July 08, 2025.

এর আগে কি এমন ঘটনা ঘটেছে?

ঠিক একই ধরনের বেরিয়ার লেক আগে তৈরি না হলেও হিমবাহ ধস এবং হিমবাহ-সৃষ্ট হ্রদের আকস্মিক বন্যা হিমালয় অঞ্চলে আগেও ঘটেছে। অধ্যাপক ভট্টরাই বলেন, এর আগেও এ ধরনের ধারাবাহিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটেছে। এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হলো ২০১২ সালের নেপালের সেটি বন্যা। ওই ঘটনায় পাথরধস, সাময়িকভাবে নদীর প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং বরফ-পাথরের ধস একসঙ্গে মিলে ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি করেছিল। রাসুয়ায় ঠিক কীভাবে বর্তমান ঘটনা ঘটেছে, তা এখনও তদন্ত করা হচ্ছে। তবে এ ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ একেবারে নজিরবিহীন নয়।

হিমবাহ ধস আসলে কী?

সহজভাবে বললে, হিমাবহ ধস হলো এমন একটি ঘটনা, যখন হিমবাহের বিশাল অংশ তার নিচের ভূমি বা ভিত্তি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এতে কখনও কখনও কয়েক মিলিয়ন ঘনমিটার বরফ, পাথর ও পানি একসঙ্গে নিচের দিকে নেমে আসে। এগুলো পরে অত্যন্ত দ্রুতগতির বরফসমৃদ্ধ ধস বা ধ্বংসাবশেষের স্রোতে পরিণত হতে পারে। অন্যদিকে হিমবাহ-সৃষ্ট হ্রদের আকস্মিক বন্যা হলো হিমবাহ থেকে গলে আসা পানি দিয়ে তৈরি কোনো হ্রদের বাঁধ হঠাৎ ভেঙে গিয়ে বিপুল পরিমাণ পানি বেরিয়ে ভয়াবহ বন্যা সৃষ্টি করা।

অতীতের ভয়াবহ হিমবাহ ধস

২০১৬ সালের জুলাইয়ে, তিব্বতের আরু রেন্জের একটি উপত্যকা হিমবাহের নিচের অংশ তার ভিত্তি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এর ফলে প্রায় ৬ কোটি ৮০ লাখ ঘনমিটার বরফ পাহাড় বেয়ে নিচে নেমে আসে। এতে ৯ জন পশুপালক ও শত শত প্রাণী মারা যায়। ঘটনাস্থলটি তিব্বতের পশ্চিমাঞ্চলে, ভারত-চীন সীমান্তেরপ্যাংগং সো অঞ্চলের কাছে অবস্থিত ছিল। এর মাত্র দুই মাস পর কাছাকাছি আরেকটি হিমবাহ ধসে পড়ে। এতে প্রায় ৮ কোটি ৩০ লাখ ঘনমিটার বরফ নিচে নেমে আসে। এরপর ২০২২ সালের নভেম্বর মাসে, চীনের ছিংহাই প্রদেশে তিব্বত মালভূমির উত্তর প্রান্তের কুনলুন পর্বতমালায় অবস্থিত বুকাদাবান ফেং হিমবাহ থেকে প্রায় ৪ কোটি ঘনমিটার বরফ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বরফের বিশাল ধস নিচের একটি হ্রদে গিয়ে আঘাত করে। এতে হ্রদে প্রায় ১৩ মিটার বা ৪২ ফুট উঁচু ঢেউ সৃষ্টি হয়।

Houses submerged in water arriving on August 24, 2025 at Blatten, Switzerland. On May 28, millions of cubic meters of rock tumbled down from Kleiner Nesthorn mountain onto the Birch Glacier, sending rock, ice and mud crashing into the valley.

পাকিস্তানেও ঘটেছে হিমবাহ-সৃষ্ট আকস্মিক বন্যা 

হিমবাহ-সৃষ্ট আকস্মিক বন্যার ঘটনা উত্তর পাকিস্তানেও ঘটেছে। ২০২২ সালের মে মাসে, হুনজা উপত্যকার হাসানাবাদ এলাকায় একটি ভয়াবহ বন্যা আঘাত হানে। দ্রুত এগিয়ে আসা শিশপার হিমবাহর কারণে তৈরি হওয়া বরফের বাঁধে আটকে থাকা একটি হ্রদের বাঁধ হঠাৎ ভেঙে যাওয়ায় এই বন্যা সৃষ্টি হয়।

কীভাবে ক্ষয়ক্ষতি কমানো যেত?

বিশেষজ্ঞদের মতে, হিমবাহের ধস বা প্রাকৃতিক বাঁধ তৈরি হওয়া হয়তো পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব ছিল না। তবে আগাম প্রস্তুতি থাকলে ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কমানো যেত।

আরও খবর

Sponsered content