আন্তর্জাতিক

বাংলাদেশে ৬ লাখ চাকরি হারানোর শঙ্কা : বিশ্বব্যাংক

  প্রতিনিধি ২৯ আগস্ট ২০২৬ , ২:৪২:৫৫ প্রিন্ট সংস্করণ

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রভাব ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি দেশে গ্যাসের সংকট দেখা দেওয়ায় ব্যাহত হচ্ছে শিল্পকারখানার উৎপাদন। একই সঙ্গে কমে যাচ্ছে সার উৎপাদনও। এর ফলে পরিবহন ও পণ্য উৎপাদনের খরচ বাড়ছে, যার প্রভাব পড়ছে বাজারদর, কৃষি, মানুষের আয় এবং কর্মসংস্থানে। সংকট যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে বাংলাদেশে প্রায় ৬ লাখ মানুষ চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারেন বলে সতর্ক করেছে বিশ্বব্যাংক। পাশাপাশি ২০২৬ সালে দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠে আসার সম্ভাবনা ছিল এমন মানুষের সংখ্যাও যুদ্ধের প্রভাবে উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে। বিশ্বব্যাংকের জুনের মাঝামাঝি সময়ের এক মূল্যায়নে এসব আশঙ্কার কথা তুলে ধরা হয়েছে। সরকারের বাজেট সহায়তার জন্য প্রস্তাবিত একটি প্রকল্পের অংশ হিসেবে ওই মূল্যায়ন করা হয়।

মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকট এমন সময়ে বাংলাদেশের ওপর প্রভাব ফেলছে, যখন দেশের অর্থনীতি আগে থেকেই নানা চাপের মধ্যে রয়েছে। মূল্যস্ফীতি দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। পাশাপাশি ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং সরকারের সীমিত আর্থিক সক্ষমতার কারণে নতুন কর্মসংস্থানও প্রত্যাশা অনুযায়ী বাড়ছে না।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, শুধু ২০২৫ সালেই বাংলাদেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা আনুমানিক ১৪ লাখ বেড়েছে। সংস্থাটির হিসাব বলছে, যুদ্ধ না হলে ২০২৬ সালে প্রায় ১৭ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ পেতেন। কিন্তু সংঘাতের প্রভাবে সেই সংখ্যা কমে প্রায় ৫ লাখে নেমে আসতে পারে। অর্থাৎ যুদ্ধের কারণে প্রায় ১২ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা হারাতে পারেন। এ বছর দেশে দারিদ্র্য বৃদ্ধির পেছনে মূল্যবৃদ্ধির অবদান প্রায় ১০ শতাংশ হতে পারে বলেও মনে করছে বিশ্বব্যাংক।

জ্বালানির বাড়তি ব্যয় শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ওপরও চাপ তৈরি করবে। বিশ্বব্যাংকের আশঙ্কা, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির পুরো প্রভাব ভোক্তাদের ওপর পড়লে মূল্যস্ফীতি আরও শূন্য দশমিক ৫ শতাংশের বেশি বাড়তে পারে। জ্বালানির দাম বাড়লে শুধু পরিবহন ব্যয় নয়, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পকারখানার পরিচালন খরচও বাড়বে। আর উৎপাদন ব্যয় বাড়ার প্রভাব পড়বে খাদ্যসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে। তবে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সম্প্রতি জানিয়েছেন, জুলাইয়ে দেশের মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের নিচে নেমেছে। তার মতে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ না হলে মূল্যস্ফীতি আরও কমতে পারত।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায়। দেশের প্রাথমিক জ্বালানির অর্ধেকের বেশি গ্যাসনির্ভর। অথচ ২০১৬ সালের সর্বোচ্চ উৎপাদনের তুলনায় বর্তমানে দেশে গ্যাস উৎপাদন প্রায় ১৫ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ যে অপরিশোধিত তেল আমদানি করে, তার প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির প্রায় ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে। যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় পেট্রোবাংলার ছয়টি এলএনজি সরবরাহ চুক্তির মধ্যে পাঁচটিকে ‘ফোর্স মেজর’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম বেড়ে প্রতি এমএমবিটিইউ ২৪ থেকে ২৮ ডলারে উঠেছে, যা আগের দামের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। সংকটের মধ্যেই সেপ্টেম্বরের সরবরাহ নিশ্চিত করতে দুটি এলএনজি কার্গো কিনতে বাংলাদেশকে প্রতি ইউনিটে ২৪ ডলারের বেশি ব্যয় করতে হয়েছে।

জ্বালানির দাম ও আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সরকারের ওপরও বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জ্বালানি খাতে সরকারের ভর্তুকি জিডিপির ২ দশমিক ৮ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। সব মিলিয়ে ভর্তুকির পরিমাণ ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন থেকে বেড়ে ৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এর ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা অন্যান্য খাতে সরকারি ব্যয় কমানোর চাপ তৈরি হতে পারে।

জ্বালানি সংকটের প্রভাব থেকে বাদ যাচ্ছে না কৃষি খাতও। দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির সঙ্গে যুক্ত। ফলে সার উৎপাদন বা আমদানিতে বড় ধরনের সমস্যা হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে ছোট কৃষকদের। বাংলাদেশে প্রতি হেক্টর জমিতে গড়ে প্রায় ৩৯১ দশমিক ৯ কেজি সার ব্যবহার হয়, যা বৈশ্বিক গড়ের দ্বিগুণেরও বেশি। দেশে ইউরিয়া সার উৎপাদনের জন্য প্রয়োজন হয় গ্যাস। গ্যাস সংকটের কারণে ইতোমধ্যে ছয়টি ইউরিয়া কারখানার মধ্যে পাঁচটির উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছে। এর পাশাপাশি ইউরিয়ার দামও প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে। সংকট দীর্ঘায়িত হলে সারের দাম দ্বিগুণ হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে বিশ্বব্যাংক।

জ্বালানি ও সরবরাহ ব্যবস্থার সংকটের প্রভাব পড়ছে স্বাস্থ্য খাতেও। বাংলাদেশে প্রায় ১৯ হাজার সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র রয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে প্রায় ৬ হাজার ২০০ বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক। বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোকে জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হয়। এতে বাড়ছে পরিচালন ব্যয়। দেশের প্রায় ২৫০টি ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বিদেশ থেকে কাঁচামাল আমদানি করে। হাসপাতালগুলোর প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ৯০ শতাংশের বেশি আবার আমদানিনির্ভর। ফলে আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় ব্যাঘাত এবং জাহাজভাড়া বৃদ্ধির কারণে স্বাস্থ্য খাতেও ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব ইতোমধ্যে দেশের শ্রমবাজারেও দেখা যাচ্ছে বলে মনে করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশিষ্ট ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান। তার মতে, শিল্পকারখানায় নতুন গ্যাস সংযোগ দেওয়া হচ্ছে না। কোথাও উৎপাদন সময় কমিয়ে আনা হয়েছে, আবার জ্বালানি সংকটের কারণে কিছু কারখানা বন্ধও হয়ে গেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে শ্রমিকদের কর্মসংস্থানে।

তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে কিছু কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং শ্রমিকদের চাকরি হারানোর ঘটনা পরিস্থিতির গুরুত্ব তুলে ধরছে। বিশ্বব্যাংকের ৬ লাখ মানুষের চাকরি হারানোর আশঙ্কাও সেই ঝুঁকিকে আরও স্পষ্ট করছে।

সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বাংলাদেশের জন্য শুধু জ্বালানি সংকট তৈরি করছে না। এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে মূল্যস্ফীতি, কৃষি, শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য ও স্বাস্থ্যসেবায়। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়তে পারে এবং সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন দেশের নিম্নআয়ের মানুষ।

 

আরও খবর

Sponsered content