প্রতিনিধি ২৬ জুলাই ২০২৬ , ১১:২২:৪৫ প্রিন্ট সংস্করণ
গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে (ডিআর কঙ্গো) চলমান ইবোলা প্রাদুর্ভাব দ্রুত ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। দেশটির সর্বশেষ সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রাণঘাতী এই ভাইরাসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১ হাজার ৩৫৪ জনে পৌঁছেছে। মাত্র পাঁচ দিনের ব্যবধানে মৃত্যুর সংখ্যা ৪০ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছ। বিষয়টি বিশেষজ্ঞদের গভীর উদ্বেগে ফেলেছে।
শনিবার প্রকাশিত সরকারি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, নিশ্চিত আক্রান্তের মোট সংখ্যা (মৃতসহ) বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৭৫ জনে। এক সপ্তাহ আগের তুলনায় এটি প্রায় ২৭ শতাংশ বেশি। কাতারভিত্তিক বার্তাসংস্থা আল-জাজিরার প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানা যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আক্রান্ত ও মৃত্যুর এই অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতি ডিআর কঙ্গোর বর্তমান প্রাদুর্ভাবকে ইতিহাসের সবচেয়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া ইবোলা মহামারিতে পরিণত করেছে। চলতি বছর ছড়িয়ে পড়া বুন্ডিবুগিও ধরনের ইবোলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ইবোলার এই প্রজাতিটি মানুষের মধ্যে সংক্রমণ ঘটানো চারটি পরিচিত ইবোলা ধরনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বিরল। এ ধরনের ভাইরাসের বিরুদ্ধে এখনো কোনো অনুমোদিত টিকা বা কার্যকর চিকিৎসা নেই।
আফ্রিকান ইউনিয়নের জনস্বাস্থ্য সংস্থা আফ্রিকা সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের (আফ্রিকা সিডিসি) প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ আবদুলসালামি নাসিদি আল জাজিরাকে বলেন, কার্যকর টিকার অভাবে ভাইরাসটি দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ছে।
তিনি বলেন, সংঘাতপূর্ণ এলাকায় এই প্রাদুর্ভাব ঘটায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। নিরাপত্তাহীনতার কারণে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় জনস্বাস্থ্য সম্পদেরও ঘাটতি রয়েছে।
এদিকে বিজ্ঞানীরা দ্রুত টিকা উদ্ভাবনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন গ্রুপ জানিয়েছে, পরীক্ষামূলকভাবে তৈরি বুন্ডিবুগিও ইবোলা টিকার প্রথম ডোজ শুক্রবার এক স্বেচ্ছাসেবকের শরীরে প্রয়োগ করা হয়েছে।
গবেষণার প্রধান তদন্তকারী ক্যাটরিনা পোলক বলেন, ‘এটি আমাদের গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক এবং বুন্ডিবুগিও ইবোলার বিরুদ্ধে টিকা তৈরির আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টার নতুন ধাপ।’
আফ্রিকা সিডিসির মহাপরিচালক জ্যাঁ কাসেয়া গত সপ্তাহে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে সতর্ক করে লিখেছেন, ‘এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে। আজ যদি আমরা এটি থামাতে না পারি, তাহলে এটি বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ ইবোলা প্রাদুর্ভাবে পরিণত হতে পারে।’
আল জাজিরার গোমা প্রতিনিধি আলাঁ উয়াইকানি জানিয়েছেন, সরকারের প্রতিক্রিয়ায় সমন্বয় ও দ্রুততার অভাব রয়েছে। ফলে চিকিৎসাকর্মীরা সীমিত সম্পদ নিয়ে অত্যন্ত প্রতিকূল পরিবেশে কাজ করছেন।
শনিবারও এক চিকিৎসক ও এক স্বাস্থ্যকর্মীর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। মে মাসে প্রাদুর্ভাব ঘোষণার পর থেকে ১০০ জনের বেশি স্বাস্থ্যকর্মী ইবোলায় আক্রান্ত হয়েছেন এবং অন্তত ৩৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।
স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য পর্যাপ্ত সুরক্ষা সামগ্রীর সংকটের পাশাপাশি কিছু এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দাদের বিরূপ মনোভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। অনেকেই এখনো রোগটির অস্তিত্ব নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছেন।
প্রাদুর্ভাবের কেন্দ্রস্থল উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ইতুরি প্রদেশের কয়েকটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বেতন-ভাতা বকেয়া ও অনিরাপদ কর্মপরিবেশের প্রতিবাদে স্বাস্থ্যকর্মীরা ধর্মঘট শুরু করেছেন।
গত সপ্তাহে বুনিয়ার কাছে রওয়ামপারা জেনারেল হাসপাতালের কর্মীরা ধর্মঘটে যান। হাসপাতালটিতে একটি বড় ইবোলা চিকিৎসা কেন্দ্র রয়েছে। গত মে মাসে ক্ষুব্ধ স্থানীয় বাসিন্দারা কেন্দ্রটির কিছু অংশে আগুন ধরিয়ে দেন এবং পালিয়ে যাওয়া স্বাস্থ্যকর্মীদের ধাওয়া করেন।
শনিবার ইতুরি প্রদেশের রাজধানী বুনিয়ার এলিকিয়া ইবোলা চিকিৎসা কেন্দ্রেও নতুন করে ধর্মঘট শুরু হয়েছে। চিকিৎসক, নার্স ও নিরাপত্তাকর্মীরা কাজ বন্ধ করে দেওয়ায় কেন্দ্রটির কার্যক্রম প্রায় অচল হয়ে পড়ে।
প্রায় ১০০ জন স্বাস্থ্যকর্মী চিকিৎসা কেন্দ্রের সামনে বিক্ষোভ করে অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে প্রণোদনা ভাতা না পাওয়ায় তাদের মনোবল ভেঙে পড়েছে এবং রোগীদের চিকিৎসাও ব্যাহত হচ্ছে।
ধর্মঘটকারী স্বাস্থ্যকর্মী মার্টিন বোলোম্বি বলেন, ‘আমাদের প্রাপ্য অর্থ দিতে হবে। এদিকে চিকিৎসাকেন্দ্রেই রোগ ছড়িয়ে পড়ছে। ভেতরে থাকা পাঁচজন রোগীকে ইতোমধ্যে হারিয়েছি। দ্রুত একটি সমাধান প্রয়োজন।’
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মহাপরিচালক টেড্রোস আধানম গেব্রেয়েসুস সতর্ক করেছেন, প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা সরকারি হিসাবের দ্বিগুণেরও বেশি হতে পারে। কারণ, নিরাপত্তাহীনতার কারণে অনেক দুর্গম এলাকায় স্বাস্থ্যকর্মীরা পৌঁছাতে পারছেন না।
তিনি জানান, বর্তমানে শনাক্ত হওয়া সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের প্রায় ৮০ শতাংশকে নজরদারির আওতায় আনা সম্ভব হলেও এখনো অনেক গ্রামে পৌঁছানো যাচ্ছে না।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা সম্প্রতি ডিআর কঙ্গো সফর করে আসা ব্যক্তিদের প্রবেশে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। যদিও গত মে মাসে বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ঘোষণার সময় ডব্লিউএইচও এমন ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার সুপারিশ করেনি।
টেড্রোস পূর্ব ডিআর কঙ্গোয় চলমান সংঘাত বন্ধে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, শুধু চিকিৎসাসামগ্রী দিয়ে এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। আক্রান্ত নয় এমন নতুন নতুন প্রদেশে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার আগেই জরুরি ভিত্তিতে মানবিক সহায়তা ও চিকিৎসা কার্যক্রম চালানোর জন্য নিরাপদ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক উদ্যোগ প্রয়োজন।















