প্রতিনিধি ৭ জুলাই ২০২৬ , ১২:৪৭:৫১ প্রিন্ট সংস্করণ
বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় যুক্তরাষ্ট্রের ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগানের লাল কার্ডের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারকে ঘিরে নতুন বিতর্কে পড়েছে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা। সংস্থাটির সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর নিরপেক্ষতা ও নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন ফুটবল সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্যের পর বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে।
বিশ্বকাপের নিয়ম অনুযায়ী, সরাসরি লাল কার্ড দেখলে পরবর্তী ম্যাচে নিষিদ্ধ থাকতে হয় এবং এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগও থাকে না। তবে বেলজিয়ামের বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচের আগে বালোগানের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে ফিফা। যুক্তরাষ্ট্রের এই স্ট্রাইকার এবারের বিশ্বকাপে তিনটি গোল করে দলের অন্যতম সেরা পারফর্মার।
ফিফা এ বিষয়ে ৮৭১ শব্দের একটি বিবৃতি প্রকাশ করলেও কেন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হলো, তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেয়নি।
বিতর্ক আরও বাড়িয়ে দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বালোগানের নিষেধাজ্ঞা পুনর্বিবেচনার ক্ষেত্রে তিনিই ভূমিকা রেখেছেন।
তবে ট্রাম্পের দাবি, তিনি শুধু বিষয়টি পুনর্বিবেচনার অনুরোধ করেছিলেন, ইনফান্তিনোকে কোনো নির্দেশ দেননি।
তার এই মন্তব্যের পর ফুটবল অঙ্গনে প্রশ্ন উঠেছে, ফিফার মতো একটি স্বাধীন ক্রীড়া সংস্থার সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক প্রভাব পড়েছে কি না।
অন্যদিকে ইনফান্তিনো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, সিদ্ধান্তটি সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে ফিফার ডিসিপ্লিনারি কমিটি নিয়েছে।
সাবেক লিভারপুল কোচ ইয়ুর্গেন ক্লপ এ ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, ‘এটি আমাদের খেলা, তাদের নয়। যদি ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জিয়ান্নি ইনফান্তিনো নিজেদের মধ্যে কথা বলে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন, তাহলে সেটি পাগলামি। এতে পুরো ব্যবস্থার নিরপেক্ষতাই প্রশ্নের মুখে পড়ে।’
সমালোচকদের মতে, বালোগানের ক্ষেত্রে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, তা অন্য কোনো দল বা খেলোয়াড়ের ক্ষেত্রে দেখা যায়নি। আর সুবিধাভোগী দলটি বিশ্বকাপের সহ-আয়োজক যুক্তরাষ্ট্র, যার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ইনফান্তিনো একাধিকবার নিজের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তবে ইনফান্তিনোকে ঘিরে বিতর্ক নতুন নয়। বিশ্বকাপের ড্র অনুষ্ঠানে প্রথমবারের মতো চালু হওয়া ‘ফিফা পিস প্রাইজ’ ট্রাম্পকে প্রদান করাও ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়।
পুরস্কার তুলে দেওয়ার সময় ইনফান্তিনো বলেন, ‘মিস্টার প্রেসিডেন্ট, শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং বিশ্বকে আরও সমৃদ্ধ করে তুলতে আপনি সবসময় আমার সমর্থন এবং পুরো ফুটবল সম্প্রদায়ের সমর্থন পাবেন।’
এরপর মানবাধিকার সংগঠন ফেয়ারস্কয়ার ফিফার নৈতিকতা কমিটির কাছে অভিযোগ করে, এই পুরস্কার চালুর মাধ্যমে সংস্থাটি রাজনৈতিক নিরপেক্ষতার নীতি লঙ্ঘন করেছে। পরে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের ৫০ জন সদস্যও এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানালেও ফিফার পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি।
সাম্প্রতিক সময়ে ফিফার একের পর এক সিদ্ধান্ত প্রশ্নের মুখে পড়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ২০৩০ ও ২০৩৪ সালের বিশ্বকাপ আয়োজক নির্বাচন, ক্লাব বিশ্বকাপ সম্প্রসারণ এবং বিশ্বকাপের টিকিটের মূল্য বৃদ্ধি।
২০৩৪ সালের বিশ্বকাপ আয়োজনের ক্ষেত্রে সৌদি আরব কার্যত প্রতিদ্বন্দ্বীহীন অবস্থায় রয়েছে। এই প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে ফিফার স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে নরওয়ের ফুটবল ফেডারেশন।
অন্যদিকে ফুটবলারদের বৈশ্বিক সংগঠন ফিফপ্রো অভিযোগ করেছে, খেলোয়াড়দের সঙ্গে পর্যাপ্ত আলোচনা ছাড়াই সম্প্রসারিত ক্লাব বিশ্বকাপ চালু করেছে ফিফা।
বালোগানের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ঘটনায় ইউরোপীয় ফুটবল সংস্থা উয়েফাও কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। সংস্থাটির ভাষ্য, ফিফা একটি “লাল রেখা” অতিক্রম করেছে এবং এই সিদ্ধান্ত নজিরবিহীন।
যদিও ফিফা ও উয়েফার মধ্যে টানাপোড়েন নতুন নয়। গত বছর ফিফা কংগ্রেসে দেরিতে উপস্থিত হওয়াকে কেন্দ্র করে উয়েফা সভাপতি আলেকসান্দার চেফেরিনের নেতৃত্বে ইউরোপীয় প্রতিনিধিরা সভা বর্জন করেছিলেন।
বিতর্ক সত্ত্বেও জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর অবস্থান এখনো শক্তিশালী বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। ফিফা ফরওয়ার্ড কর্মসূচির মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে ফুটবল উন্নয়নে অর্থায়ন এবং বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা ৩২ থেকে ৪৮-এ উন্নীত করায় এশিয়া, আফ্রিকা ও অন্যান্য অঞ্চলের বহু দেশের সমর্থন পেয়েছেন তিনি।
ফিফার ২১১ সদস্য দেশের মধ্যে সভাপতি নির্বাচনে জয় পেতে প্রয়োজন ১০৬ ভোট। ইতোমধ্যে দক্ষিণ আমেরিকার ১০টি, আফ্রিকার ৫৪টি এবং এশিয়ার ৪৭টি সদস্য দেশের সমর্থন ইনফান্তিনোর পক্ষে রয়েছে। অর্থাৎ, তার পক্ষে ১১১ ভোট প্রায় নিশ্চিত।
ফলে সাম্প্রতিক বিতর্ক ফিফার ভাবমূর্তিকে প্রশ্নের মুখে ফেললেও ২০২৭ সালের সভাপতি নির্বাচনে ইনফান্তিনোর অবস্থানকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে এমন সম্ভাবনা আপাতত কম বলেই মনে করা হচ্ছে।





















