নোমান মিয়া , চুনারুঘাট (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধি : ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫ , ৭:৫০:০৪ প্রিন্ট সংস্করণ
হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার তিনটি ইউনিয়ন—সাটিয়াজুরী, রানীগাঁও ও মিরাশী—দীর্ঘদিন ধরে কার্যত প্রশাসনিক অচলাবস্থার মধ্যে রয়েছে। এসব ইউনিয়নের নৌকা প্রতীকে নির্বাচিত চেয়ারম্যানদের দীর্ঘ অনুপস্থিতিতে ইউনিয়ন পরিষদের স্বাভাবিক কার্যক্রম ভেঙে পড়েছে। ফলে জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন, নাগরিক সনদসহ মৌলিক রাষ্ট্রীয় সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন লাখো সাধারণ মানুষ।
অনুপস্থিত চেয়ারম্যানরা হলেন—মিরাশী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও চুনারুঘাট উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মানিক সরকার, সাটিয়াজুরী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ইউপি চেয়ারম্যান আবদালুর রহমান আবদাল এবং চুনারুঘাট উপজেলা যুবলীগ নেতা ও রানীগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান রিপন।
স্থানীয় ও প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের ঘোষিত ‘ডেভিল হান্ট’ অভিযান শুরুর পর থেকেই এই তিন চেয়ারম্যান আত্মগোপনে রয়েছেন। চেয়ারম্যানদের অনুপস্থিতির কারণে ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে নিয়মিত অফিস কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। কোথাও নির্দিষ্ট অফিস সময়সূচি নেই, কোথাও চেয়ারম্যানের কক্ষে ঝুলছে তালা। জনগণের সঙ্গে নেই কার্যকর কোনো যোগাযোগ ব্যবস্থাও।
চেয়ারম্যানদের দীর্ঘ অনুপস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়েছে নাগরিক সেবায়। জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন, ওয়ারিশ সনদ, নাগরিক সনদ, প্রত্যয়নপত্র, ভিজিডি-ভিজিএফ কার্ড বিতরণ, বিধবা ও বয়স্ক ভাতাসহ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। জরুরি প্রয়োজনে ইউনিয়ন পরিষদে এসে দিনের পর দিন ঘুরেও সেবা না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরছেন সাধারণ মানুষ।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, চেয়ারম্যানদের অনুপস্থিতির সুযোগে ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছে একটি দালালচক্র ও প্রভাবশালী মহল। সেবা পেতে সাধারণ মানুষকে দিতে হচ্ছে অতিরিক্ত অর্থ। একাধিক ভুক্তভোগী জানান, “চেয়ারম্যান পাওয়া যায় না। কোনো কাজ করতে হলে দালালের কাছে যেতে হয়। টাকা না দিলে কাজ হয় না।”
ইউপি সদস্য ও সচিবদের একটি অংশ নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, চেয়ারম্যান না থাকায় উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়নে চরম জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। সরকারি বরাদ্দ থাকলেও বহু উন্নয়ন প্রকল্প ঝুলে রয়েছে। এতে করে তিন ইউনিয়নেই উন্নয়ন কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—চেয়ারম্যানদের দীর্ঘ অনুপস্থিতির বিষয়টি প্রশাসনের নজরে থাকলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। এতে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—দায়িত্বে থেকেও জনপ্রতিনিধিদের এমন অবহেলা কেন মেনে নেওয়া হচ্ছে?
সচেতন মহলের অভিযোগ, এই তিন চেয়ারম্যান গোপনে সরকারবিরোধী বিভিন্ন তৎপরতার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন। এতে আইনশৃঙ্ঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটার পাশাপাশি আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নাশকতার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
সচেতন মহলের মতে, ইউনিয়ন পরিষদ হলো তৃণমূল প্রশাসনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। সেখানে দীর্ঘদিন চেয়ারম্যান অনুপস্থিত থাকা মানেই রাষ্ট্রীয় সেবা ব্যবস্থার বড় ধরনের ব্যর্থতা। তারা দ্রুত তদন্ত করে অনুপস্থিত চেয়ারম্যানদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং প্রয়োজনে বহিষ্কার করে বিকল্প দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে চুনারুঘাট উপজেলার নবাগত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিয়াউর রহমান বলেন,
“বিষয়টি আমি অবগত হয়েছি। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে জনভোগান্তি যেন না হয়, সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”




















