খেলাধুলা

মহারণের আগে ভারত না ইংল্যান্ড-কার পাল্লা ভারী?

  প্রতিনিধি ৫ মার্চ ২০২৬ , ১:৪৮:০৯ প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্বের ক্ষুদ্র সংস্করণের ক্রিকেটে বড় এক সেমিফাইনাল সামনে। সাম্প্রতিক দুই আসর—২০২২ ও ২০২৪ সালের অভিজ্ঞতা বলছে, এই লড়াই শুধু ফাইনালে ওঠার পথই নয়, অনেক সময় চ্যাম্পিয়ন নির্ধারণেরও পূর্বাভাস হয়ে ওঠে। তাই প্রশ্ন উঠছে—এই মুহূর্তে কোন দলের অবস্থান ভালো? শিরোপাধারী ভারত, নাকি টানা পঞ্চমবারের মতো শেষ চারে ওঠা ইংল্যান্ড?

নিজেদের মাটিতে খেলছে ভারত। টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই তারা ছিল শিরোপার অন্যতম প্রধান দাবিদার। এখন মাত্র দুটি জয়ের দূরত্বে দাঁড়িয়ে তারা ইতিহাস গড়ার সুযোগ পাচ্ছে—এই প্রতিযোগিতায় প্রথম দল হিসেবে তিনবার শিরোপা জয়ের স্বপ্ন দেখছে ভারত।

অন্যদিকে ইংল্যান্ডের পথচলা ছিল বেশ কাঁটাযুক্ত। গ্রুপপর্বেই নেপাল ও ইতালির বিপক্ষে বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখে পড়েছিল তারা। তবুও শেষ পর্যন্ত ঘুরে দাঁড়িয়ে আবারও সেমিফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে দলটি, যা টানা পঞ্চমবারের মতো শেষ চারে ওঠার কৃতিত্ব।

নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে শুক্রবারের কঠিন জয়ের পর ইংল্যান্ডের অলরাউন্ডার উইল জ্যাকস বলেছেন, একটি আদর্শ ম্যাচে হয়তো তাকে ব্যাটিং বা বোলিং—কোনোটিই করতে হতো না। কিন্তু বাস্তবে তিনি সাত ম্যাচে চারবার ম্যাচসেরা হয়েছেন, যা একটি যৌথ রেকর্ড।

তবে জ্যাকসের মতে, ‘নিখুঁত ম্যাচ’ নিয়ে ভাবার সময় এখন নয়। এই টুর্নামেন্টে এখনো নিজেদের সেরা খেলাটা দেখাতে পারেনি কোনো দলই। ভারত তো এক সময় বেশ চাপে পড়ে গিয়েছিল—আহমেদাবাদে দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে বড় হারের পর সুপার এইট পর্বে প্রায় পুরোটা সময়ই পিছিয়ে ছিল তারা। শেষ পর্যন্ত কলকাতায় ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়েই সেমিফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করে।

তবে ক্ষুদ্র সংস্করণের ক্রিকেটের স্বভাবই এমন। অনেক সময় কঠিন পরিস্থিতিই দলকে শক্তিশালী করে তোলে। সেই চ্যালেঞ্জের মধ্যেই ভারত ও ইংল্যান্ড—দুই দলই নতুন নতুন নায়ক খুঁজে পেয়েছে।

সম্প্রতি ভারতের হয়ে বড় অবদান রেখেছেন সঞ্জু স্যামসন। রিঙ্কু সিং পারিবারিক কারণে দল ছাড়ায় সুযোগ পান তিনি। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ইডেন গার্ডেনে মাত্র ৫০ বলে অপরাজিত ৯৭ রান করেন স্যামসন—যা এ বছরের আগের সাত ইনিংস মিলিয়ে তার মোট রানের চেয়েও বেশি।

ইংল্যান্ডের দলে একইভাবে নতুন অবদান এসেছে। এক বছর আগে স্যাম কারান দল থেকে প্রায় ছিটকে গিয়েছিলেন, যদিও ২০২২ সালে শিরোপা জয়ের সময় তিনি ছিলেন সেরা খেলোয়াড়। এখন আবার দলে ফিরে অলরাউন্ডারের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন এবং চাপের মুহূর্তে শেষ দিকে বোলিংয়ের ভরসা হয়ে উঠেছেন।

এদিকে তিন নম্বরে হ্যারি ব্রুককে তুলে আনা হয়েছে। এর পেছনে অন্যতম কারণ ছিল ওপেনিং জুটির ব্যর্থতা। জস বাটলার ও ফিল সল্ট এই প্রতিযোগিতায় এখন পর্যন্ত সাত ইনিংসে ওপেনিং জুটিতে মাত্র ৮৪ রান করেছেন, যার কোনো ইনিংস চার ওভারের বেশি টেকেনি। বিশেষ করে বাটলারের ব্যাটিং নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে।

এই দুর্বলতাকে কাজে লাগাতে পারে ভারত। তাদের শক্তিশালী ও বৈচিত্র্যময় বোলিং আক্রমণ ইংল্যান্ডকে কঠিন পরীক্ষায় ফেলতে পারে।

ভারতের বোলিং আক্রমণের নেতৃত্বে আছেন জসপ্রীত বুমরাহ। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে তিনি এক ওভারে দুই গুরুত্বপূর্ণ উইকেট নিয়ে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন।

ইংল্যান্ডের পক্ষে জোফরা আর্চার সাধারণত ম্যাচের শুরুতেই তিন ওভার করে ফেলেন। এরপর মাঝের ওভারে স্পিন আক্রমণের ওপর নির্ভর করে দলটি।

সাম্প্রতিক দুই সেমিফাইনালও ছিল নাটকীয়। ২০২২ সালে অ্যাডিলেডে ইংল্যান্ড ভারতের বিপক্ষে ১০ উইকেটের বিশাল জয় পেয়েছিল। সেই ম্যাচে জস বাটলার ও অ্যালেক্স হেলস ১৬৯ রানের লক্ষ্য মাত্র চার ওভার বাকি থাকতেই পেরিয়ে যান।

দুই বছর পর পরিস্থিতি বদলে যায়। গায়ানায় ভারতের বড় জয়ে ইংল্যান্ডের কোচ ম্যাথিউ মোটের বিদায়ের পথ তৈরি হয়।

এবারের সেমিফাইনালও তাই দুই দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। হারলে আবারও বড় পরিবর্তনের আলোচনা শুরু হতে পারে।

নজরে দুই তারকা

এই ম্যাচে বিশেষ নজর থাকবে ভারতের অভিষেক শর্মা ও ইংল্যান্ডের জস বাটলারের দিকে।

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে অভিষেক শর্মা ঝড়ো ব্যাটিং করেছিলেন। ৫৪ বলে ১৩৫ রান করে তিনি সাতটি চার ও ১৩টি ছক্কা মেরেছিলেন।

তবে এই টুর্নামেন্টে তার শুরুটা ছিল ভয়াবহ—যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান ও নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে টানা তিন ম্যাচে শূন্য রান করেন। পরে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ২৬ বলে অর্ধশতক করে কিছুটা ছন্দে ফেরেন।

অন্যদিকে জস বাটলারের অবস্থা আরও কঠিন। টানা পাঁচ ইনিংসে তিনি একটি চারও মারতে পারেননি। মোট ২৭ বলে করেছেন মাত্র ১৫ রান।

তবুও ইংল্যান্ড তাকে দলে রাখার পক্ষেই আছে। কারণ সাদা বলের ক্রিকেটে তার গুরুত্ব অপরিসীম।

সম্ভাব্য দল

ভারত: অভিষেক শর্মা, সঞ্জু স্যামসন (উইকেটরক্ষক), ঈশান কিশান, তিলক ভার্মা, সূর্যকুমার যাদব (অধিনায়ক), হার্দিক পান্ডিয়া, শিবম দুবে, অক্ষর প্যাটেল, আর্শদীপ সিং, জসপ্রীত বুমরাহ, বরুণ চক্রবর্তী।

ইংল্যান্ড: ফিল সল্ট, জস বাটলার (উইকেটরক্ষক), হ্যারি ব্রুক (অধিনায়ক), জ্যাকব বেথেল, টম ব্যান্টন, স্যাম কারান, উইল জ্যাকস, জেমি ওভারটন, লিয়াম ডসন, জোফরা আর্চার, আদিল রশিদ।

উইকেট ও পরিস্থিতি

মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামের মাঝামাঝি উইকেটে ম্যাচটি হবে। দুই পাশের বাউন্ডারি প্রায় সমান দূরত্বে। উইকেটে ঘাস থাকার কারণে বাউন্স ভালো থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। দুই দলের শক্তিশালী ব্যাটিং বিবেচনায় ২০০ বা তার বেশি রানের ম্যাচ হতে পারে।

পরিসংখ্যান

বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত পাঁচবার মুখোমুখি হয়েছে ভারত ও ইংল্যান্ড। সেখানে ৩-২ ব্যবধানে এগিয়ে ভারত। তবে এই প্রতিযোগিতায় এখনো কোনো দল টানা দুই ম্যাচ জিততে পারেনি।

সর্বমোট আন্তর্জাতিক ক্ষুদ্র সংস্করণের ক্রিকেটেও ভারতের দাপট বেশি—১৭টি জয় ভারতের, ইংল্যান্ডের ১২টি।

এদিকে আদিল রশিদের সামনে একটি মাইলফলক রয়েছে। আর চারটি উইকেট পেলেই তিনি ইংল্যান্ডের হয়ে সব ধরনের ক্রিকেট মিলিয়ে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারিদের তালিকায় চতুর্থ স্থানে উঠে আসবেন।

প্রতিক্রিয়া

ইংল্যান্ড অধিনায়ক হ্যারি ব্রুক বলেন, ‘কঠিন ম্যাচ জিতে এখানে আসায় আমাদের আত্মবিশ্বাস অনেক বেড়েছে। বিশ্বকাপের মতো টুর্নামেন্টে এমন ম্যাচ জয় খুব গুরুত্বপূর্ণ।’

ভারতের বোলিং কোচ মর্নে মরকেল বলেন,‘ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে বাউন্স একটু বেশি থাকে। ব্যাটাররা সেই বাউন্সে ভর করে শট খেলতে পারে। আবার বোলারদের জন্যও সুযোগ তৈরি হয়। এখানে প্রতিটি বলেই লড়াই করতে হবে।’

আরও খবর

Sponsered content