প্রতিনিধি ১০ মার্চ ২০২৬ , ১২:০০:১০ প্রিন্ট সংস্করণ
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাত ক্রমেই বিস্তৃত আকার ধারণ করছে। সামরিক সংঘর্ষের পাশাপাশি এর তীব্র প্রভাব পড়ছে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে। বিশেষ করে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি ঘিরে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা বিশ্ব অর্থনীতিকে নতুন এক বড় জ্বালানি সংকটের দিকে ঠেলে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। বিশ্বে প্রতিদিন প্রায় ১০ কোটি ব্যারেল তেলের চাহিদা রয়েছে। এর প্রায় এক-পঞ্চমাংশই এই সরু নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এখানে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হলে তা ইতিহাসের সবচেয়ে বড় তেল সংকটে রূপ নিতে পারে।
তেলের দামে হঠাৎ উল্লম্ফন
যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বাড়ছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম প্রায় ২০ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১১১ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে। একই সময়ে মার্কিন ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের দামও ১০৬ ডলারের বেশি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে স্বল্প সময়ের মধ্যে তেলের দাম ১২০ থেকে ১৩০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি যুক্তরাষ্ট্রের জ¦ালানি প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী প্রতিদিন প্রায় দুই কোটি ব্যারেল তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়।
এটি বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ, সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের এক-চতুর্থাংশের বেশি। এই তেলের বড় অংশ যায় এশিয়ার বড় অর্থনীতিগুলোতেÑ চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায়।
ফলে এই নৌপথে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে সবচেয়ে বেশি চাপ পড়বে এশিয়ার শিল্প ও অর্থনীতির ওপর।
অতীতের তুলনায় চারগুণ বড় তেল সংকট
হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল বিশ্ববাজার থেকে হারিয়ে যেতে পারে।
তুলনায় অতীতের বড় সংকটগুলো ছিল অনেক ছোটÑ ইয়োম কিপুর যুদ্ধে দৈনিক সংকট ছিল প্রায় ৪০-৫৫ লাখ ব্যারেল, ইরান বিপ্লবের সময় এই সংকট ছিল দৈনিক প্রায় ৪০-৬০ লাখ ব্যারেল, ইরাক-ইরান যুদ্ধের সময়ও দৈনিক একই পরিমাণ জ¦ালানির সংকট হয়েছিল।
অর্থাৎ সম্ভাব্য নতুন সংকট অতীতের যে কোনো তেল ধাক্কার তুলনায় প্রায় চারগুণ বড় হতে পারে।
বিকল্প সরবরাহ কতটা সম্ভব
যদিও পুরো সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কম বলে মনে করা হচ্ছে। কিছু বিকল্প ব্যবস্থা রয়েছেÑ সৌদি আরব পাইপলাইনের মাধ্যমে লোহিত সাগর হয়ে তেল পাঠাতে পারে, সংযুক্ত আরব আমিরাত কিছু তেল বিকল্প রুটে রপ্তানি করতে পারে, বিভিন্ন দেশের কৌশলগত তেল মজুদ বাজারে ছাড়া হতে পারে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, এসব ব্যবস্থা পুরো ঘাটতি পূরণ করতে পারবে না।
জি-৭ দেশের জরুরি উদ্যোগ
পরিস্থিতি সামাল দিতে জি-সেভেন দেশগুলো কৌশলগত মজুদ থেকে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ কোটি ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে।
এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বাজারে সাময়িক স্বস্তি আসতে পারে। এর আগে ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের সময় আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি সমন্বিতভাবে ২৪ কোটি ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়ে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, সরবরাহ পরিস্থিতি পরিষ্কার না হলে দাম খুব বেশি কমার সম্ভাবনা কম।
উপসাগরীয় অঞ্চলে হামলার বিস্তার
যুদ্ধের প্রভাব ইতোমধ্যে উপসাগরীয় দেশগুলোতেও ছড়িয়ে পড়েছে। কাতার লক্ষ্য করে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ করা হয়েছে, বাহরাইনের সিতরায় ড্রোন হামলায় তেল শোধনাগারে আগুন লাগে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ শিল্পাঞ্চলে ড্রোন ধ্বংসের পর তেল ডিপোতে আগুন ধরে, সৌদি আরবের শায়বাহ তেলক্ষেত্র লক্ষ্য করে আসা ড্রোন প্রতিরোধ করা হয়েছে। এই হামলাগুলো জ্বালানি অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে ‘স্ট্যাগফ্লেশন’-এর আশঙ্কা
অর্থনীতিবিদদের মতে, তেলের দাম দীর্ঘসময় ধরে বেশি থাকলে বিশ্ব অর্থনীতি স্ট্যাফ্লেশনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। বিশ্লেষণ অনুযায়ীÑ তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫ ডলার বাড়লে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি প্রায় ০.২ শতাংশ কমতে পারে, মুদ্রাস্ফীতি বাড়তে পারে প্রায় ০.৫ শতাংশ, বিশেষ করে চীনের মতো বড় শিল্প অর্থনীতিগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
যুদ্ধ থামাতে কূটনৈতিক তৎপরতা
সংঘাত থামাতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কূটনৈতিক তৎপরতাও শুরু হয়েছে। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন। চীন দ্রুত যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছে। চীনের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষ দূত ঝাই জুন ইতোমধ্যে সৌদি আরব সফর করে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
অনিশ্চয়তার মধ্যে বিশ্ব জ্বালানি বাজার
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত কতদিন চলবে এবং হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি কীভাবে বদলাবেÑ তার ওপরই নির্ভর করছে বিশ্ব জ্বালানি বাজারের ভবিষ্যৎ।
তবে একটি বিষয় স্পষ্টÑ হরমুজ প্রণালি ঘিরে অনিশ্চয়তা যতদিন থাকবে, ততদিন বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও বিশ্ব অর্থনীতি অস্থিরই থাকবে।














