প্রতিনিধি ১১ জুলাই ২০২৬ , ৮:২০:৫৫ প্রিন্ট সংস্করণ
এনসিপির আহ্বায়ক ও জাতীয় সাংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেছেন, সরকারি দলের এমপিরা যেই বরাদ্দ পায়, বিরোধী দলের এমপিরা সেই বরাদ্দের তিনভাগের একভাগও পাচ্ছে না।
আজ শনিবার বিকেলে রংপুর জিলা স্কুল মাঠে চার দফা দাবিতে ১১ দলীয় জোটের বিভাগীয় সমাবেশের সভাপতির বক্তব্যে এসব কথা বলেন নাহিদ ইসলাম।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন, গণভোটের রায় বাস্তবায়নে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, সীমান্ত হত্যা ও পুশইন বন্ধ এবং জনদুর্ভোগ নিরসনের দাবিতে ১১ দলীয় ঐক্য এই সমাবেশের আয়োজন করে।
তিনি বলেন, বাজেটে রংপুরে কোন বড় উন্নয়ন প্রজেক্ট রাখা হয়নি। বরাদ্দ সব যাচ্ছে বগুড়ার শিবগঞ্জে। গোপালগঞ্জ প্রতিস্থাপিত হয়েছে বগুড়ার শিবগঞ্জে। কিন্তু যারা প্রকৃত বৈষম্যের শিকার, সেই রংপুরবাসী কোনো বরাদ্দ পাচ্ছে না।
নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘রংপুর বিভাগ বাংলাদেশে দীর্ঘসময় ধরে আঞ্চলিক বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছে। আমরা আশা করেছিলাম, গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী এবারের নির্বাচনে যেই সরকার গঠিত হয়েছে, তাদের প্রথম বাজেটে রংপুর বিভাগের প্রতি সুদৃষ্টি সুনজর দেওয়া হবে। কিন্তু আমরা দেখলাম, এবারের বাজেটেও রংপুর বিভাগের সাথে বাজেট বৈষম্য করা হয়েছে। রংপুর বিভাগের বেশির ভাগ আসন বিরোধী দলের হওয়ার কারণে পরিকল্পিতভাবে বরাদ্দ কমিয়ে দেয়া হয়েছে।’
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফরের অর্জন শূন্য বলে মন্তব্য করে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ বলেন, ‘কিছুদিন আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীন সফরে গিয়েছিলেন। আমরা বিরোধীদলের পক্ষ থেকে সংসদে তাকে ধন্যবাদ জানিয়েছি। এরপরে হয়তো কিছু বলা উচিত না। কিন্তু বলতে বাধ্য হচ্ছি, চীন সফরের অর্জন কোথায়? চীন সফরের অর্জন হচ্ছে শূন্য। চীন সফরে তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে আমরা কোনো কমিটমেন্ট পাই নাই। রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্সন নিয়ে কোনো কমিটমেন্ট পাই নাই।’
নাহিদ ইসলাম বলেন, দেশে যদি জাতীয় ঐক্য না থাকে, তারেক রহমান পৃথিবীর কোনো দেশ থেকে কোনো ধরনের সাহায্য পাবে না। অলরেডি আইএমএফ তাদের (সরকারকে) বলে দিয়েছে, আর কোনো ঋণ দেবে না। পৃথিবীর কোনো দেশই তাদেরকে সহযোগিতা করবে না। গণঅভ্যুত্থান ও সংস্কারের সাথে প্রতারণা করলে কেউই সহযোগিতা করবে না।
তিনি আরও বলেন, ‘রংপুর থেকে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদ গণঅভ্যুত্থানের ডাক দিয়েছিল। গণঅভ্যুত্থানের সিপাহ সালাহ ছিল। কিন্তু আমরা দেখতে পেলাম নির্বাচনের পরে বিএনপি গণভোটের সাথে প্রতারণা করেছে। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পরে সকলের দাবি ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার। সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মাধ্যমেই বিএনপি ক্ষমতায় এসেছিল এবং এসেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে অস্বীকার করেছিল। তার ফলাফল কি হয়েছিল, বিএনপিকে এই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি তুলে রাজপথে নির্যাতিত হতে হয়েছিল।
এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, যেই গণঅভ্যুত্থান, গণভোট, সংস্কার ও জুলাই সনদের কারণে বিএনপি আজ ক্ষমতায় আসতে পেরেছে। এখন সেই গণভোটের সাথেই প্রতারণা করেছে। বিএনপি ৩১ দফার সাথে প্রতারণা করেছে। বিএনপি জুলাই সনদের সাথে প্রতারণা করেছে। বিএনপি গণতন্ত্রের সাথে প্রতারণা করেছে।
নাহিদ আরও বলেন, সারা বাংলাদেশে বিদ্যুৎ নেই। বাংলাদেশে গ্রামেগঞ্জে আবার মানুষ হারিকেন জ্বালাতে বাধ্য হয়েছে। এই সরকার বিগত সময়েও হারিকেন দিয়েছে, এবারো বাংলাদেশের মানুষের হাতে হারিকেন ধরিয়ে দিয়েছে। বিদ্যুৎ দিতে পারছে না। কর্মসংস্থান দিতে পারছে না।
জাতীয় বাজেট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এই বাজেটে কোনো অর্থনৈতিক সংস্কারের রূপরেখা রাখা হয়নি। ব্যাংকগুলো কিভাবে ঠিক হবে, দেশ থেকে পাচার হওয়া টাকা কিভাবে ফেরত আসবে, কোনো ধরণের সুপরিকল্পনা এই সরকারের নেই। ফলে আমরা বলব আপনি (তারেক রহমান) এভাবে দেশ চালাতে পারবেন না। দেশ চালাতে অলরেডি ব্যর্থ হয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোকাবেলায় ব্যর্থ হয়েছেন। কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ব্যর্থ হয়েছেন। সংস্কার দিতে ব্যর্থ হয়েছেন।’
তারেক রহমানের উদ্দেশে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ বলেন, ‘যদি দেশ পরিচালনা সঠিকভাবে করতে হয় তাহলে আপনাকে অবিলম্বে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে হবে। অবিলম্বে অর্থনৈতিক সংস্কার করতে হবে। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। দেশের তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। সীমান্তে পুশইন ও সীমান্ত হত্যা প্রতিরোধ করতে হবে। যদি সীমান্ত হত্যা, পুশইন প্রতিরোধ করতে না পারেন তাহলে নিজেদের দল থেকে জাতীয়তাবাদী শব্দটি কেটে ফেলে দেন। জাতীয়তাবাদের নামে ব্যবসা করবেন, নিজেদেরকে দেশপ্রেমিক দেখাবেন। অথচ সীমান্ত হত্যা, পুশইন রোধ করতে পারবেন না, তাহলে দেশের জনগণ আপনাদেরকে ক্ষমতায় থাকার ম্যান্ডেন্ট দেবে না।’
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা প্রসঙ্গে এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, ‘ডিসেম্বরে কেউ একজন দেশে আসার পরিকল্পনা করছে। আমরা ফাঁসির দঁড়ি রেডি করে অপেক্ষা করছি। আপনি (শেখ হাসিনা) ডিসেম্বরে আসুন আর যখনই আসুন, ফাঁসির দঁড়িতে ঝুলতেই হবে। বাংলাদেশ থেকে যে পালিয়ে যায়, সে আর বাংলাদেশে কখনো ফিরে আসে না। পাকিস্তানিরাও এর থেকে সম্মানজনকভাবে বিদায় নিয়েছিল। ইংরেজরাও এর থেকে সম্মানজনকভাবে বিদায় নিয়েছিল। কিন্তু শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগ সরকার এত অসম্মানজনকভাবে কাপুরুষোচিত ভাবে এই দেশ থেকে পালিয়ে গিয়ে ভারতের কোলে আশ্রয় নিয়েছে। তিনি আর এই দেশে আসার সৎ সাহস কখনো রাখবে না।’
নাহিদ ইসলাম বলেন, শেখ হাসিনা আসবে কি আসবে না, এটা দিল্লীর সাথে ঢাকাকে নির্ধারণ করতে হবে। এই সরকার থেকে দিল্লীকে ম্যাসেজ দিতে হবে। শেখ হাসিনা দিল্লিতে বসে দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। ফ্যাসিস্ট মিডিয়ার দোসররা সেই সকল তথ্য প্রচার করছে। বাংলাদেশের জনগণ এটা মেনে নেবে না।
এ সময় সংস্কার, গণভোট, জুলাই সনদসহ ১১ দলীয় ঐক্যের দাবি বাস্তবায়নে অচিরেই নতুন করে আন্দোলনের ডাক আসবে বলে জানান তিনি। সেই আন্দোলনে সফল হবার প্রত্যয় ব্যক্ত করে প্রায় ১০ মিনিটের বক্তব্য শেষ করেন।
সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। বিশেষ অতিথি হিসেবে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির সভাপতি কর্নেল (অব.) ড. অলী আহমদ বীর বিক্রম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালাল উদ্দিন, নেজামে ইসলাম পার্টির ভারপ্রাপ্ত আমির আল্লামা আবদুল কাইয়ুম সুবহানী, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সহসভাপতি ও মুখপাত্র রাশেদ প্রধান, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট এ কে এম আনোয়ারুল ইসলাম চাঁন বক্তব্য দেন।
এছাড়াও সমাবেশের শুরুতে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মাওলানা মমতাজ উদ্দিন, রংপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান বেলাল, রংপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম রব্বানী, রংপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য রায়হান সিরাজী, রংপুর মহানগর জামায়াতে ইসলামীর আমির এটিএম আজম খান, সেক্রেটারি কে এম আনোয়ারুল হক কাজল, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) রংপুর জেলা আহ্বায়ক আল মামুন, মহানগরের সদস্য সচিব আব্দুল মালেকসহ ১১ দলীয় ঐক্যের স্থানীয় নেতৃবৃন্দ বক্তব্য দেন।















