সারাদেশ

খুলনায় ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে ডেঙ্গু, ৪ ওয়ার্ডে ‘রেড জোন’

  প্রতিনিধি ২২ আগস্ট ২০২৬ , ২:৪১:৪৪ প্রিন্ট সংস্করণ

খুলনায় দিন দিন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে ডেঙ্গু পরিস্থিতি। প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা, সেই সঙ্গে বাড়ছে হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ। অন্যদিকে নগরজুড়ে মশার উপদ্রবও চরম আকার ধারণ করেছে। ড্রেন-নালা, ময়লার স্তূপ, পরিত্যক্ত পাত্র ও বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানিতে নির্বিঘ্নে বংশবিস্তার করছে মশা। বর্ষার পানিতে এডিস মশার প্রজনন ক্ষেত্র বাড়ায় ডেঙ্গুর ঝুঁকিও ক্রমেই বাড়ছে।

নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, অনেক ড্রেন-নালা দীর্ঘদিন ধরে অপরিষ্কার। কোথাও জমে আছে ময়লা-আবর্জনা, কোথাও আবার পরিত্যক্ত পাত্র ও বিভিন্ন স্থাপনার আশপাশে জমে রয়েছে পানি। বৃষ্টির পর এসব স্থানে জমে থাকা পানিতে এডিস মশার লার্ভা জন্মানোর আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। সন্ধ্যা নামার পর নগরীর বিভিন্ন এলাকায় মশার উপদ্রব আরও বেড়ে যায়।

নগরীর নতুন বাজার এলাকার বাসিন্দা মো. ইয়াহিয়া বলেন, দিন-রাত সমানতালে মশার অত্যাচার চলছে। শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে আতঙ্কে থাকতে হচ্ছে। ঘরে মশারি টাঙিয়ে রাখা, কয়েল কিংবা ইলেকট্রিক ব্যাট ব্যবহার করেও স্বস্তি মিলছে না। সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে মাঝে মধ্যে ওষুধ ছিটানো হলেও এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

টুটপাড়া এলাকার গৃহিণী সুমনা মামুন বলেন, একটি জায়গায় কয়েক মিনিট দাঁড়ানোও কঠিন হয়ে পড়েছে। মশার ঝাঁক ঘিরে ধরে। কেসিসি থেকে যে ওষুধ ছিটানো হচ্ছে, তা যদি কার্যকর হয়, তাহলে মশার উৎপাত এতটা বাড়ছে কেন—এ প্রশ্নের জবাব চান নগরবাসী।

নিরালা এলাকার বাসিন্দা নেয়ামুল বারী হুজাইফা বলেন, দিন দিন ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছে। আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ায় নগরবাসীর মধ্যে আতঙ্কও বাড়ছে। মাঝে মধ্যে ওষুধ ছিটানো হলেও মশার সংখ্যা কমছে না।

হাসপাতালে বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর চাপ

মশার এমন বেপরোয়া উপদ্রবের মধ্যেই খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর চাপ।

সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহে নতুন করে প্রায় ২০০ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। জেলার অন্যান্য হাসপাতালেও ভর্তি হয়েছেন আরও প্রায় ২৯৮ জন। বর্তমানে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ১২৫ জনসহ খুলনা বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে ৫ শতাধিক ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন।

জ্বর, গায়ে ব্যথা, দুর্বলতাসহ নানা উপসর্গ নিয়ে প্রতিদিনই হাসপাতালে আসছেন রোগীরা। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, রোগীর চাপ বাড়তে থাকায় চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।

শুধু খুলনা নগরী নয়, পুরো খুলনা বিভাগেই ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছে। বিশেষ করে বাগেরহাট, যশোর, ঝিনাইদহ ও কুষ্টিয়ায় রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য।

স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর খুলনায় ডেঙ্গুতে ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে।

বর্ষা শেষে আরও বাড়ার আশঙ্কা

চিকিৎসকদের আশঙ্কা, বর্ষা শেষে ডেঙ্গুর সংক্রমণ আরও বাড়তে পারে। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. সুজাত আহমেদ বলেন, বর্ষা শেষে ডেঙ্গু রোগীর চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ অবস্থায় মশক নিধন কার্যক্রম জোরদারের পাশাপাশি নগরীর পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা জরুরি। জ্বর, গায়ে ব্যথাসহ ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

চার ওয়ার্ডে ‘রেড জোন’

কেসিসির স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, নগরীর ২২, ২৮, ২৯ ও ৩০ নম্বর ওয়ার্ডে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। এসব এলাকাকে রেড জোন হিসেবে চিহ্নিত করে বিশেষ মশক নিধন কর্মসূচি পরিচালনা করছে খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি)। নিয়মিত ফগিং, ড্রেন পরিষ্কার, লার্ভিসাইড প্রয়োগ এবং পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানো হচ্ছে বলে জানিয়েছে কেসিসি।

কেসিসি প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে রেড জোনগুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি নগরবাসীকেও নিজ নিজ বাড়ি, ছাদ, আঙিনা ও আশপাশের এলাকা পরিষ্কার রাখতে হবে। কোথাও যেন পানি জমে না থাকে, সেদিকে সবাইকে নজর দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

কোটি কোটি টাকা ব্যয়, তবুও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন

মশক নিধনে ব্যাপক অর্থ ব্যয়ের পরও নগরীতে মশার উৎপাত কমছে না কেন—এ প্রশ্ন এখন নগরবাসীর মুখে মুখে।

কেসিসির তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে মশক নিধন কার্যক্রমে ১৫ কোটি টাকারও বেশি ব্যয় হয়েছে। বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও যদি মশার দাপট নিয়ন্ত্রণে না আসে এবং ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে থাকে, তাহলে মশক নিধন কর্মসূচির পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।

নগরবাসীর অভিযোগ, শুধু নিয়মিত ফগিং করলেই মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। মশার প্রজননস্থল চিহ্নিত করে ধ্বংস করা, ড্রেন-নালা ও ময়লা-আবর্জনা দ্রুত পরিষ্কার করা এবং জমে থাকা পানি অপসারণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হওয়ার আগেই নগরীর মশক নিধন ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন নগরবাসী। একই সঙ্গে বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও প্রত্যাশিত ফল না আসার কারণ খতিয়ে দেখে মশক নিধন কার্যক্রমের কার্যকারিতা মূল্যায়নেরও দাবি উঠেছে।

আরও খবর

Sponsered content