গঙ্গাচড়া (রংপুর), প্রতিনিধি: ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ , ১০:২৬:৫৭ প্রিন্ট সংস্করণ
রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার বড়বিল ইউনিয়নের দক্ষিণ পানাপুকুর এলাকায় বিএডিসি অনুমোদিত সেচ ক্যাচমেন্ট এরিয়ায় আইন বহির্ভূতভাবে পাইপলাইন সম্প্রসারণের ঘটনায় উপজেলা সেচ কমিটির নীতিগত সিদ্ধান্ত বানচালের অভিযোগ উঠেছে। প্রশাসনিক প্রক্রিয়া প্রভাবিত করতে কৃত্রিম সেচ চাহিদা দেখিয়ে পুনরায় অভিযোগ দাখিল, ভুয়া কৃষক তালিকা প্রস্তুত এবং বাস্তবতার সঙ্গে অসংগত তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে বলে দাবি স্থানীয় কৃষক ও সচেতন মহলের।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দক্ষিণ পানাপুকুর এলাকায় বাচ্চা মিয়াসহ চারজন কৃষকের বিএডিসি অনুমোদিত সেচ এলাকার মধ্যে অবৈধভাবে পাইপলাইন সম্প্রসারণ করে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ)। এ ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পক্ষ থেকে উপজেলা সেচ কমিটির সভাপতি বরাবর লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলে বিষয়টি নিয়ে একাধিক দফা যাচাই কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
যাচাই শেষে উপজেলা সেচ কমিটি অবৈধভাবে বরেন্দ্রের নতুন আউটলেট বন্ধের বিষয়ে নীতিগত অবস্থান গ্রহণ করে। এ সংক্রান্ত বিষয়ে গত ১৬ জানুয়ারি উপজেলা প্রশাসনের কার্যালয়ে বিএডিসি ও বিএমডিএ’র সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে একটি সমন্বয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে সেচ ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত বিষয়গুলো পর্যালোচনা করা হয় এবং কৃষকদের ন্যায্যমূল্যে সেচ সুবিধা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
তবে অভিযোগ রয়েছে, ওই প্রক্রিয়া কার্যকর হওয়ার আগেই বিএমডিএ’র পক্ষ থেকে কৃত্রিম সেচ চাহিদা দেখিয়ে কৃষকদের একটি নামমাত্র তালিকা প্রস্তুত করা হয়। গত ১৮ জানুয়ারি ওই তালিকা সংযুক্ত করে পুনরায় একটি অভিযোগ দাখিল করা হয়, যার মাধ্যমে সেচ কমিটির অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করা হয়েছে বলে দাবি কৃষকদের।
পুনরায় দাখিল করা অভিযোগের প্রেক্ষিতে অভিযোগকারীরা প্রকৃত কৃষক কি না—তা যাচাইয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয় উপজেলা কৃষি অফিসকে। দায়িত্ব পেয়ে বড়বিল ইউনিয়নের দায়িত্বরত উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা জীবন নাহার একটি প্রতিবেদন দাখিল করেন। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, বিএমডিএ কর্তৃক স্থাপিত আউটলেটসংলগ্ন ২২ জন কৃষকের পানির চাহিদা রয়েছে এবং পানির অভাবে ফসল নষ্ট হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়।
তবে সরেজমিনে গিয়ে স্থানীয়রা জানান, প্রতিবেদনের সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল পাওয়া যায়নি। প্রতিবেদনে উল্লেখিত অনেক কৃষকের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি এবং এলাকায় ফসল ক্ষতির কোনো ঘটনাও ঘটেনি। দীর্ঘদিন ধরেই এলাকা বিএডিসি সেচের আওতায় থাকায় নিয়মিত পানি পাওয়া যাচ্ছে বলেও জানান তারা।
বিএডিসি ক্যাচমেন্ট এলাকার কৃষক মোজাম্মেল হোসেন বলেন, সরকারি নির্ধারিত মূল্যে পানি পেলে তাদের কোনো আপত্তি নেই। একই এলাকার কৃষক বেলাল হোসেন বলেন, বরেন্দ্রের পাইপলাইনের পানির কোনো প্রয়োজন তাদের নেই।
বিএডিসি সেচ মালিক সাইফুল ইসলাম বলেন, “আমাদের একনা দোলার মধ্যে চারটি সেচ মোটর রয়েছে। নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও কেন বরেন্দ্র পাইপলাইন স্থাপন করেছে, তা আমার জানা নেই।”
ঘাঘটটারী এলাকার কৃষক ফিরোজ বলেন, তিনি দীর্ঘদিন ধরে বাচ্চা মিয়ার সেচ থেকে পানি নিচ্ছেন এবং কোনো সমস্যা হয়নি।
কৃষক মুসকুর বলেন, “মাত্র চারজন কৃষকের জন্য বরেন্দ্র রাস্তার ভেতর খনন করে পাইপলাইন এনেছে। কাজ বন্ধ করে দিলেও তারা জোর করেই রাতারাতি পাইপ বসায়। এর কোনো দরকার নেই।”
বিএডিসি সেচ মালিক বাচ্চা মিয়া বলেন, তিনি তার ক্যাচমেন্ট এলাকার সব কৃষককে পানি দিতে রাজি আছেন। কেউ পানি না নিলে তিনি জোর করে দিতে পারবেন না বলেও জানান তিনি।
এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রুবেল হোসেন বলেন, অভিযোগকারীরা প্রকৃত কৃষক কি না—শুধু সেটি যাচাইয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার দেওয়া প্রতিবেদন সংযুক্ত করেই তা সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।
এ বক্তব্যের পর তদন্ত প্রতিবেদনের দায়ভার কার—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের মতে, বিতর্কিত প্রতিবেদনের মাধ্যমে সেচ ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া প্রভাবিত করার চেষ্টা হলে তা গুরুতর অনিয়ম হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত।
উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা জীবন নাহারের বক্তব্য জানতে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
স্থানীয় কৃষক ও সচেতন মহলের দাবি, কৃত্রিম সেচ চাহিদা দেখিয়ে সেচ কমিটির প্রক্রিয়া প্রভাবিত করার অভিযোগটি নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হোক।




















