প্রতিনিধি ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫ , ১২:২৩:৪২ প্রিন্ট সংস্করণ
পড়ালেখা না করেই টাকার বিনিময়ে মিলছে শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ। বিদেশে কাজ করতে প্রয়োজন—এমন প্রায় সব ধরনের শিক্ষাগত সনদ এখন হাতের নাগালে। দীর্ঘদিন ধরেই একটি সংঘবদ্ধ চক্র বাংলাদেশের বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি, পাশাপাশি মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক বোর্ডের নম্বরপত্র ও সনদ তৈরি করে বিপুল অর্থের বিনিময়ে বিক্রি করে আসছে—এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে অনুসন্ধানে।
অভিযোগ রয়েছে, দেশের কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সরাসরি এই জাল সনদ চক্রের সঙ্গে জড়িত। তারা অর্থের বিনিময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনলাইন ডাটাবেজে এসব ভুয়া সনদ অন্তর্ভুক্ত করছে। ফলে কাগজে-কলমে ও অনলাইনে যাচাই করলে নকল ও আসল সনদের মধ্যে কোনো পার্থক্যই ধরা পড়ছে না। পড়াশোনা না করে কেনা সনদ আর প্রকৃত শিক্ষার মাধ্যমে অর্জিত সনদ—দুটোকেই সমানভাবে বৈধ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ভেদে একটি সনদ কিনতে গুনতে হচ্ছে ৩০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর এক গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ৫০ হাজার থেকে ৩ লাখ টাকা দিলেই পাওয়া যায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক সনদ। উচ্চশিক্ষাকে পণ্য বানিয়ে একশ্রেণির শিক্ষা বেনিয়ারা যেন খুলে বসেছেন সনদ বিক্রির দোকান।
ঢাকায় অন্তত ১৫টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে সনদ বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। ঢাকার বাইরের বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে অভিযোগ আরও গুরুতর—সেখানে সনদ বাণিজ্যই নাকি মূল কার্যক্রম। অবৈধ ক্যাম্পাস বন্ধে মাঝেমধ্যে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ চোখে পড়লেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
এই জাল সনদ বাণিজ্যের একটি স্পষ্ট উদাহরণ উঠে এসেছে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার দাঊদপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা রবিউল হোসেনের ঘটনায়। ঈসমাইল মিয়া ও নাজমা বেগমের সন্তান রবিউল হোসেনের জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর ৮২৬৩৬২৮০৩৭। সনদ অনুযায়ী তার জন্মতারিখ ১৬ এপ্রিল ২০০১।
তথ্য অনুযায়ী, রবিউল হোসেন ২০১৯ সালে এইচএসসি পাস করলেও কখনোই স্নাতকে ভর্তি হননি। অথচ আলাদিনের চেরাগের মতো করে তিনি পেয়ে গেছেন বিবিএ ডিগ্রি। সাংবাদিকদের হাতে আসা সনদের অনলাইন যাচাই লিংকে দেখা যায়, রবিউল হোসেন ২০২০ শিক্ষাবর্ষে ‘দ্য মিলিনিয়াম ইউনিভার্সটি’-তে ভর্তি হন এবং ১৩০ ক্রেডিট সম্পন্ন করে ৩.৫১ সিজিপিএ অর্জন করে ২৯ ডিসেম্বর ২০২৪ সালে মার্কেটিং বিষয়ে বিবিএ ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। সনদটির সিরিয়াল নম্বর ৩৪২১।
কিন্তু বিস্তৃত অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে ভয়াবহ তথ্য। রবিউল হোসেন কখনোই ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন না। বাস্তবে কোনো ক্লাস, পরীক্ষা কিংবা একাডেমিক কার্যক্রমে তার অংশগ্রহণের প্রমাণ নেই। তবুও বিশ্ববিদ্যালয়ের অনলাইন রেজাল্ট সিস্টেমে একজন পাশ করা শিক্ষার্থী হিসেবে তার নাম ও ফলাফল প্রকাশিত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এভাবে সনদসর্বস্ব গ্র্যাজুয়েট তৈরির প্রবণতা দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। যোগ্যতা ছাড়াই ডিগ্রিধারীদের কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ দেশের অর্থনীতি, প্রশাসন ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির জন্য ভয়ংকর হুমকি হয়ে উঠছে।
এ বিষয়ে দ্রুত তদন্ত, জড়িত প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অনলাইন ডাটাবেজের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।




















