কয়েক দিনের টানা বৃষ্টির পর দুই দিন কিছুটা স্বস্তি মিলেছিল নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলে। তবে শনিবার ভোর থেকেই আবার আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। দুপুরের পর শুরু হয় বৃষ্টি ও বজ্রপাত। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানির সঙ্গে মিলিত হয়ে এই বৃষ্টি জেলার বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলে বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি করেছে।
খালিয়াজুরি, মোহনগঞ্জ, মদন, কলমাকান্দা, বারহাট্টা, আটপাড়া ও কেন্দুয়াসহ বিভিন্ন উপজেলার হাওরে পাকা বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। কোথাও কোথাও ধান কাটার কাজ চললেও নতুন করে পানি বাড়ায় সেই কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
খালিয়াজুরি উপজেলার হায়াতপুর গ্রামের কৃষক দুলাল চন্দ্র সরকার বলেন, ধারদেনা করে চার একর জমিতে বোরো ধান চাষ করেছিলেন। কিন্তু একটানা বৃষ্টিতে অধিকাংশ ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। পরিবার নিয়ে পানিতে নেমে মাত্র ৮০ শতাংশ জমির ধান কাটতে পেরেছেন। কাটা ধানও শুকাতে না পারায় তাতে অঙ্কুর বের হতে শুরু করেছে বলে জানান তিনি।
শুক্রবার বিকেলে বারহাট্টা উপজেলার মনাস গ্রামের কলাভাঙ্গা হাওরে গিয়ে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ মাঠের ধান পানিতে ডুবে আছে। শ্রমিক সংকটের কারণে কৃষকেরা নিজেরাই পানিতে নেমে ধান কাটছেন। কেউ নৌকায় করে ধান পাড়ে আনছেন, আবার কেউ ভেজা ধান ও খড় সড়কে শুকানোর চেষ্টা করছেন।
এ সময় নেত্রকোনা-২ আসনের সংসদ সদস্য মো. আনোয়ারুল হক ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেন। তিনি কৃষকদের সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
মনাস গ্রামের কৃষক মনজুরুল হক জানান, সুদে টাকা এনে ১০ কাঠা জমিতে ধান আবাদ করেছিলেন। কিন্তু টানা বৃষ্টিতে পুরো ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। এখন ঋণ পরিশোধ ও পরিবার চালানো নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তিনি।
মদন উপজেলার বাগজান গ্রামের কৃষক ফয়েজ আহমেদ বলেন, পানি কমার কোনো লক্ষণ নেই। দেড় হাজার টাকা মজুরি দিয়েও শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। ধান কাটলেও লোকসান, না কাটলেও লোকসান।
কলমাকান্দা উপজেলার বড়খাপন গ্রামের কৃষক রুবেল তালুকদার জানান, শ্রমিকের উচ্চ মজুরি, নৌকা ভাড়া ও মাড়াই খরচ মিলিয়ে উৎপাদন খরচ আরও বেড়ে গেছে। গুড়াডোবা হাওরে তার নয় একর জমির ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জেলায় ১ লাখ ৮৬ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়েছে। এর মধ্যে হাওরাঞ্চলে রয়েছে ৪২ হাজার হেক্টর জমি। সরকারি হিসাবে এখন পর্যন্ত ১৩ হাজার ৪৬৬ হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, পানি আরও বাড়লে ক্ষতির পরিমাণও বাড়তে পারে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন জানান, কংস নদের পানি জারিয়া পয়েন্টে বিপৎসীমার ১ দশমিক ৩ মিটার এবং উব্দাখালী নদীর কলমাকান্দা পয়েন্টে বিপৎসীমার ৭৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে এখনো কোনো ফসল রক্ষা বাঁধ ভাঙেনি। দ্রুত ধান কেটে ফেলাই এখন সবচেয়ে নিরাপদ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
নেত্রকোনা জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে। মাঠপর্যায়ে প্রশাসনের কর্মকর্তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন।
এদিকে হাওর গবেষক সঞ্জয় সরকার বলেন, হাওর রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পরিকল্পনার অভাব রয়েছে। অপরিকল্পিত বাঁধ, পলি জমে পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং অধিকাংশ স্লুইসগেট অকেজো থাকায় বৃষ্টির পানি দ্রুত নামতে পারছে না। তিনি স্বল্পমেয়াদি জাতের ধান চাষে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা এবং হাওর এলাকায় ধান শুকানোর যন্ত্র স্থাপনের পরামর্শ দেন।