প্রচ্ছদ » অপরাধ » নেত্রকোনায় নারী-শিশু নির্যাতন নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ, তিন বছরে ধর্ষণের ৪০৮ মামলার রেকর্ড
নেত্রকোনায় নারী-শিশু নির্যাতন নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ, তিন বছরে ধর্ষণের ৪০৮ মামলার রেকর্ড
সোহেল খান দূর্জয়-নেত্রকোনা : ১৪ আগস্ট ২০২৬ , ১২:৩৩:৩৩প্রিন্ট
সংস্করণ
নেত্রকোনায় ধর্ষণের মামলা কমেছে। তবে শিশু ধর্ষণের একের পর এক ঘটনা সামনে আসায় নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় অভিযুক্তদের কেউ বাবা, কেউ শিক্ষক, আবার কেউ পরিচিত ব্যক্তি। এর মধ্যে ১১ বছর বয়সী এক শিশু ধর্ষণের শিকার হয়ে সন্তান প্রসব করেছে বলে পরিবারের দাবি। একই বয়সী আরেক শিশু সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা। দুটি ঘটনায়ই অভিযুক্ত পরিচিত ব্যক্তি। অভিযোগগুলোর ধরন ও অভিযুক্তদের পরিচয় উদ্বেগের মাত্রা বহুগুণ বৃদ্ধি করছে। জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে নেত্রকোনায় ধর্ষণের ঘটনায় ২৬৭টি মামলা হয়েছিল। পরের বছর সেই সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ১১৩টিতে। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত মামলা হয়েছে ২৮টি। অর্থাৎ তিন বছরে থানায় ধর্ষণের মামলা হয়েছে ৪০৮টি। কিন্তু মামলা কমার এই পরিসংখ্যানের বিপরীতে স্থানীয় সালিশে ঘটনা মীমাংসার চেষ্টা এবং সামাজিক চাপের অভিযোগও রয়েছে। এমন ঘটনার পর পুলিশের পরিসংখ্যানে ধর্ষণের মামলা কমে যাওয়ার বিষয়টি নতুন প্রশ্ন উত্তাপন করছে।
শিশুর নিরাপত্তা কোথায়, সম্প্রতি মদন উপজেলায় ১১ বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে তারই মাদ্রাসা শিক্ষকের বিরুদ্ধে। পরিবারের দাবি, ধর্ষণের শিকার হয়ে শিশুটি সন্তান প্রসব করেছে। একই বয়সী আরেক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে মোহনগঞ্জে। ওই শিশুটি বর্তমানে সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা বলে জানা গেছে। দুটি ঘটনাই বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন। পূর্বধলায় ১২ বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে তার বাবার বিরুদ্ধে। একই উপজেলায় বাবার বিরুদ্ধে মেয়েকে ধর্ষণের অভিযোগের আরেকটি ঘটনাও সামনে এসেছে। চলতি বছরের এসব ঘটনায় শুধু ধর্ষণের অভিযোগই সামনে আসেনি, প্রশ্ন উঠেছে শিশুদের নিরাপত্তার সবচেয়ে কাছের জায়গাগুলো নিয়েও। পরিবারের সদস্য, শিক্ষক কিংবা পরিচিত ব্যক্তির কাছেই যখন শিশুরা নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিযোগ ওঠে, তখন পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তাদের সুরক্ষার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর-সে প্রশ্নও সামনে আসছে।
মামলার বাইরের চিত্র অজানা, মানবাধিকারকর্মী কোহিনূর বেগম বলেন, সামাজিক সম্মান, পারিবারিক চাপ ও নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে অনেক পরিবার নির্যাতনের ঘটনা প্রকাশ করতে চায় না। মামলা করার পরও ভুক্তভোগী পরিবারকে নানা ধরনের চাপ মোকাবিলা করতে হয়। অভিযুক্ত ব্যক্তি প্রভাবশালী হলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। তিনি বলেন, থানায় হওয়া মামলার সংখ্যা দিয়ে ধর্ষণের প্রকৃত চিত্র পুরোপুরি বোঝা যায় না। কোনো ঘটনা স্থানীয়ভাবে সালিশে মীমাংসার চেষ্টা হলে কিংবা পরিবার মামলা না করলে সেটি পুলিশের হিসাবেও আসে না। সম্প্রতি জেলায় শিশু ধর্ষণের একটি ঘটনা পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা করে গ্রাম্য সালিশে মীমাংসার চেষ্টা করে গ্রামের মাতব্বরেরা। সালিশের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি ব্যাপক আলোচনায় আসে। ভিডিওটি পুলিশের নজরে এলে তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে তদন্ত শুরু করে। পরে পুলিশের সহযোগিতায় ভুক্তভোগীর বাবা বাদী হয়ে থানায় মামলা করেন। এমন ঘটনার পর পুলিশের পরিসংখ্যানে ধর্ষণের মামলা কমে যাওয়ার বিষয়টি নতুন প্রশ্ন সামনে আনছে-সামাজিক চাপের কারণে কতটি ঘটনা পরিবার প্রকাশ করছে না, কতটি অভিযোগ মামলা পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে না, আর কতটি ঘটনা স্থানীয়ভাবে মীমাংসার চেষ্টায় চাপা পড়ে যাচ্ছে?
দ্রুত বিচার ও নিরাপত্তার তাগিদ, নেত্রকোনা বারের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. আরিফা জেসমিন নাহীন বলেন, ধর্ষণ ও নারী-শিশু নির্যাতনের ঘটনায় দ্রুত তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট নুরুল কবীর রুবেল বলেন, আগের তুলনায় বর্তমানে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলাগুলো কম সময়ে নিষ্পত্তি হচ্ছে। গত দুই বছরে তিন হাজারের বেশি নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে বলেও জানান তিনি।অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. হাফিজুল ইসলাম জানান, ধর্ষণের ঘটনায় গ্রাম্য সালিশ করার কোন সুযোগ নেই। নারী ও শিশু নির্যাতনের কোনো ঘটনা ঘটলে স্থানীয় সালিশে না গিয়ে দ্রুত থানায় জানাতে হবে। এসব অপরাধ প্রতিরোধে পুলিশের পক্ষ থেকে নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রমও চালানো হচ্ছে।