নেত্রকোনা প্রতিনিধি ২ মার্চ ২০২৬ , ৭:৪৭:৪৬ প্রিন্ট সংস্করণ
হাওর, পাহাড়, নদী, আদিবাসী সংস্কৃতি ও সাহিত্যের অনন্য সমন্বয়ে গড়ে ওঠা নেত্রকোনা জেলা দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় পর্যটন এলাকা। তবে পরিকল্পিত উন্নয়ন, পর্যাপ্ত অবকাঠামো ও পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাপনার অভাবে জেলার বিপুল পর্যটন সম্ভাবনা এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। পর্যটন সংশ্লিষ্ট ও স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ না নিলে জেলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও ঐতিহ্য মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে।
জেলার মোহনগঞ্জ উপজেলা, মদন উপজেলা ও খালিয়াজুরী উপজেলা-র বিস্তীর্ণ হাওর অঞ্চল বর্ষা মৌসুমে বিশাল জলরাশিতে পরিণত হয়। মোহনগঞ্জের ডিঙ্গাপোতা হাওর, খালিয়াজুরীর হাওর এবং ধনু নদীর জলপথ বর্ষায় নৌভ্রমণের বিশেষ আকর্ষণ তৈরি করে। শীত মৌসুমে অতিথি পাখির আগমন দেশ-বিদেশের পর্যটকদের টানে।
তবে নিরাপদ নৌযান, জেটি, প্রশিক্ষিত মাঝি, পর্যটক গাইড ও মানসম্মত আবাসন সুবিধার অভাবে হাওরভিত্তিক পর্যটন এখনো অনিয়ন্ত্রিত ও ঝুঁকিপূর্ণ। বর্ষাকালে খালিয়াজুরী উপজেলায় পুরো এলাকা কার্যত পানিবন্দী হয়ে পড়ায় স্থানীয়দের জীবনযাত্রাও চরম অনিশ্চয়তায় পড়ে।
পাহাড়ি অঞ্চলে দুর্গাপুর উপজেলা-র বিজয়পুরের সাদা মাটির পাহাড় নেত্রকোনার সবচেয়ে পরিচিত পর্যটন কেন্দ্র। প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক পর্যটকের আগমন হলেও অপরিকল্পিত ভ্রমণ, পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব এবং অতীতে নির্বিচারে সাদা মাটি উত্তোলনের কারণে পাহাড় ধস ও জীববৈচিত্র্য বিনষ্ট হয়েছে।
একই উপজেলার সোমেশ্বরী নদী স্বচ্ছ পানি ও পাহাড়ঘেরা সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত হলেও নদীভাঙন, পর্যটক নিরাপত্তা ও অবকাঠামোগত ঘাটতির কারণে সম্ভাবনাটি পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
কলমাকান্দা উপজেলা-র পাতলাবন এলাকায় আদিবাসী গারো জনগোষ্ঠীর বসবাস ও সংস্কৃতি ভিন্নমাত্রার পর্যটন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। গারো নারীদের নেতৃত্বে পরিবার পরিচালনা, ঐতিহ্যবাহী জীবনধারা ও সংস্কৃতি পর্যটকদের আকর্ষণ করতে পারে। তবে সড়ক যোগাযোগ, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপদ পানীয় জলের সংকটে এখানকার মানুষের জীবনমান যেমন ঝুঁকিতে, তেমনি পর্যটন বিকাশও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একই উপজেলার মহাদেও নদীও পাহাড়ঘেরা নৈসর্গিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ হলেও যোগাযোগ ব্যবস্থার বেহাল দশায় পর্যটক আগমন কম।
ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক পর্যটনের ক্ষেত্রেও নেত্রকোনা সমৃদ্ধ। কেন্দুয়া উপজেলার সাজিউড়া গ্রামে ব্রিটিশ আমলের অর্থমন্ত্রী নলিনী সরকারের পৈতৃক বাড়ি, রোয়াইলবাড়ির মোঘল আমলের স্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন সম্পদ। পাশাপাশি বারহাট্টা উপজেলার কাশতলা গ্রামে কবি নির্মলেন্দু গুণ-এর পৈতৃক বাড়ি এবং কেন্দুয়ার কুতুবপুরে কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ-এর পৈতৃক ভিটা ও তাঁর প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সাহিত্যভিত্তিক পর্যটনের বড় আকর্ষণ হতে পারত। কিন্তু এসব স্থাপনার অধিকাংশই এখনো সংরক্ষণ, তথ্যকেন্দ্র ও পর্যটকবান্ধব সুবিধার বাইরে রয়ে গেছে।
পর্যটকদের মতে, নেত্রকোনার পর্যটন বিকাশের প্রধান অন্তরায় হলো—সমন্বিত পর্যটন মাস্টারপ্ল্যানের অভাব, দুর্বল সড়ক ও নৌ যোগাযোগ ব্যবস্থা, পর্যটকদের নিরাপত্তা ও আবাসন সংকট, সরকারি–বেসরকারি বিনিয়োগের সীমাবদ্ধতা এবং পরিবেশ সংরক্ষণে কার্যকর নজরদারির ঘাটতি।
নেত্রকোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সংযুক্তা পাল বলেন, “সরকারি ও বেসরকারি যৌথ উদ্যোগ, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং পর্যটক সুরক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে নেত্রকোনা হাওর ও পাহাড়কেন্দ্রিক একটি টেকসই পর্যটন গন্তব্যে পরিণত হতে পারে।”
নেত্রকোনা স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক মো. আরিফুল ইসলাম সরদার জানান, জেলার সম্ভাবনাময় পর্যটন এলাকাগুলো চিহ্নিত করে পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন নিশ্চিত করা হবে। যোগাযোগ অবকাঠামো সম্প্রসারণ ও ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে ধাপে ধাপে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।




















