আন্তর্জাতিক

পাকিস্তানের পরমাণু নিরাপত্তায় সন্তুষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থা

  প্রতিনিধি ১০ অক্টোবর ২০২৬ , ২:২২:১৯ প্রিন্ট সংস্করণ

পরমাণু উপাদান ও স্থাপনার সুরক্ষায় পাকিস্তান একটি শক্তিশালী নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তুলেছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার বিশেষজ্ঞ দল। দেশটির পরমাণু নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে ১২ দিনব্যাপী বিস্তারিত পর্যালোচনা শেষে এ মূল্যায়ন দিয়েছে সংস্থাটি।

আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার আন্তর্জাতিক ভৌত সুরক্ষা পরামর্শক দলের এই প্রথম পাকিস্তান সফরে দেশটির পরমাণু উপাদান ও স্থাপনার নিরাপত্তাসংক্রান্ত আইনগত ও নিয়ন্ত্রণমূলক কাঠামো মূল্যায়ন করা হয়। পরিদর্শন করা একটি নির্দিষ্ট পরমাণু স্থাপনায় নিরাপত্তাব্যবস্থার যথাযথ প্রয়োগও লক্ষ্য করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

শুক্রবার প্রকাশিত সংস্থাটির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, নিয়মিত পর্যালোচনার মাধ্যমে পাকিস্তানের পরমাণু নিরাপত্তাব্যবস্থার ধারাবাহিক উন্নয়ন করা হচ্ছে। পাশাপাশি দেশটির সুপ্রতিষ্ঠিত দক্ষতা উন্নয়ন অবকাঠামো জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে পরমাণু নিরাপত্তায় অবদান রাখছে।

সাত সদস্যের বিশেষজ্ঞ দলের নেতৃত্ব দেন মরক্কোর পরমাণু ও বিকিরণ নিরাপত্তা সংস্থার সাবেক মহাপরিচালক খাম্মার ম্রাবিত। দলে চীন, রোমানিয়া, রাশিয়া ও স্লোভাকিয়ার বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার দুজন কর্মকর্তা ছিলেন।

পর্যালোচনা শেষে পাকিস্তানের পরমাণু নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট কার্যপ্রণালি আরও উন্নত করার লক্ষ্যে বিশেষজ্ঞ দলটি বিভিন্ন সুপারিশ দেয়। নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা ও স্থাপনা পর্যায়—উভয় ক্ষেত্রেই কয়েকটি প্রশংসনীয় চর্চা চিহ্নিত করা হয়।

পর্যালোচনা কার্যক্রমের সমাপনী অনুষ্ঠানে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার উপমহাপরিচালক ও পরমাণু নিরাপত্তা বিভাগের প্রধান কারিন হারভিউ বলেন, ‘পাকিস্তানে প্রথম আন্তর্জাতিক ভৌত সুরক্ষা পরামর্শক দলের কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে দেশটি তার সুপ্রতিষ্ঠিত পরমাণু নিরাপত্তাব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণমূলক ও পরিচালনাগত দিকগুলো আরও উন্নত করার অঙ্গীকার তুলে ধরেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘পরমাণু নিরাপত্তায় দক্ষ জনবল গড়ে তোলার ক্ষেত্রে পাকিস্তানের অবদান প্রশংসনীয় এবং এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী।’

পাকিস্তান সরকারের অনুরোধে দেশটির পরমাণু নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ এই পর্যালোচনা কার্যক্রমের আয়োজন করে। এর উদ্দেশ্য ছিল জাতীয় পরমাণু নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে দেশটিকে সহায়তা করা।

পাকিস্তানের পরমাণু নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান জিয়া হুসেইন শাহ বলেন, ‘আন্তর্জাতিক ভৌত সুরক্ষা পরামর্শক দলের কার্যক্রম আয়োজনের মধ্য দিয়ে পরমাণু স্থাপনা ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে শক্তিশালী নিরাপত্তাব্যবস্থা বজায় রাখার বিষয়ে পাকিস্তানের অবিচল অঙ্গীকার প্রকাশ পেয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ দলের মূল্যবান পর্যবেক্ষণ আমাদের শক্তিশালী ভৌত সুরক্ষাব্যবস্থার কার্যকারিতা যাচাইয়ের পাশাপাশি আইনগত ও নিয়ন্ত্রণমূলক কাঠামো, জাতীয় পরমাণু নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং স্থাপনা পর্যায়ের কার্যপদ্ধতি আরও উন্নত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেছে।’

আন্তর্জাতিক ভৌত সুরক্ষা পরামর্শক দলের কার্যক্রমের মাধ্যমে পরমাণু উপাদানের সুরক্ষা বিষয়ে আন্তর্জাতিক চুক্তি ও আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার নির্দেশনা বাস্তবায়নে বিভিন্ন দেশকে পরামর্শ দেওয়া হয়।

এ ধরনের পর্যালোচনায় আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা কোনো দেশের ভৌত সুরক্ষাব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন, আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চার সঙ্গে তা তুলনা করেন এবং দেশব্যাপী ও নির্দিষ্ট স্থাপনার নিরাপত্তা উন্নয়নে সুপারিশ দেন।

পর্যালোচনা চলাকালে বিশেষজ্ঞ দলটি পাকিস্তানের পরমাণু নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ, পাকিস্তান পরমাণু শক্তি কমিশন এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য জাতীয় প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে। তারা করাচি পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রে অবস্থিত কানুপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের অবসায়ন প্রকল্পও পরিদর্শন করেন। এটি পাকিস্তানের প্রথম পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র।

কানুপ বিদ্যুৎকেন্দ্রে কানাডীয় ডিউটেরিয়াম-ইউরেনিয়াম চুল্লিটি ১৯৭১ সাল থেকে ২০২১ সালে স্থায়ীভাবে বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত চালু ছিল। পরিদর্শনের সময় বিশেষজ্ঞরা চুল্লি অবসায়নের চলমান কার্যক্রম এবং ব্যবহৃত জ্বালানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন।

পাকিস্তান পরমাণু উপাদানের ভৌত সুরক্ষাবিষয়ক আন্তর্জাতিক সনদের সদস্য। দেশটি ২০১৬ সালে সনদটির ২০০৫ সালের সংশোধনী অনুমোদন করে। এই সংশোধনীর মাধ্যমে মূল সনদের আওতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়। এতে দেশের অভ্যন্তরে শান্তিপূর্ণ কাজে ব্যবহৃত, সংরক্ষিত বা পরিবাহিত সব পরমাণু উপাদান এবং পরমাণু স্থাপনার ভৌত সুরক্ষা নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা যুক্ত হয়েছে।

এদিকে পাকিস্তানের পরমাণু নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার সহযোগিতায় পরমাণু নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট কাজে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত সরঞ্জামের উপযুক্ততা যাচাই নিয়ে পাঁচ দিনের একটি জাতীয় কর্মশালা সফলভাবে সম্পন্ন করেছে।

আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার সহযোগী কেন্দ্র জাতীয় নিরাপত্তা ও সুরক্ষা ইনস্টিটিউটের আয়োজনে বৃহস্পতিবার কর্মশালাটি শেষ হয়। এতে নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার কর্মকর্তা, পরমাণু স্থাপনার পরিচালনাকারী এবং সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন পক্ষ অংশ নেয়।

কর্মশালায় বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত সরঞ্জাম পরমাণু নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট কাজে ব্যবহারের উপযোগী কি না, তা যাচাইয়ের প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করা হয়।

অনুষ্ঠানে পাকিস্তানের পরমাণু নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের নির্বাহী সদস্য শহিদ রশিদ পরমাণু স্থাপনার নিরাপদ পরিচালনায় নির্ভরযোগ্য ও যথাযথভাবে যাচাইকৃত সরঞ্জামের গুরুত্ব তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, ‘প্রযুক্তির অগ্রগতি, সরঞ্জামের মেয়াদোত্তীর্ণতা এবং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার পরিবর্তনের মতো বিষয়গুলো পরমাণু স্থাপনার জন্য বিশেষভাবে তৈরি যন্ত্রাংশের প্রাপ্যতায় প্রভাব ফেলতে পারে।’

তিনি আরও বলেন, ‘বাণিজ্যিকভাবে পাওয়া সরঞ্জাম নির্ধারিত পরমাণু স্থাপনায় ব্যবহারের প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করতে সক্ষম কি না, সে বিষয়ে আস্থা তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি হলো সেগুলোর উপযুক্ততা যাচাই।’

পাকিস্তানের পরমাণু নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই কর্মশালা পরমাণু নিরাপত্তা এবং সরবরাহব্যবস্থার তদারকিতে দেশটির সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করেছে। একই সঙ্গে প্রযোজ্য বিধিবিধান ও আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা কঠোরভাবে অনুসরণের বিষয়টিও এতে গুরুত্ব পেয়েছে।

আরও খবর

Sponsered content