সারাদেশ

বর্ষায় শাপলাই ভরসা আগৈলঝাড়ার কয়েক শ পরিবারের : বিনা পুঁজিতে বিল থেকে সংগ্রহ, শাপলা বিক্রিতে দিনে আয় ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত

  আগৈলঝাড়া (বরিশাল) প্রতিনিধি ১১ আগস্ট ২০২৬ , ১১:২০:০৩ প্রিন্ট সংস্করণ

জাতীয় ফুল শাপলা। বর্ষার জলে বিল-ঝিল, খাল-বাঁওড় কিংবা পানিতে ডুবে থাকা কৃষিজমিতে ফুটে থাকা সেই শাপলাই এখন বরিশালের আগৈলঝাড়ার কয়েক শ পরিবারের জীবিকার অবলম্বন। বর্ষায় কৃষিজমি পানির নিচে থাকায় মাঠের কাজ কমে যায়। এ সময় কোনো পুঁজি ছাড়াই বিল থেকে শাপলা সংগ্রহ করে বিক্রি করে সংসারের খরচ মেটাচ্ছেন উপজেলার বিভিন্ন এলাকার মানুষ।

ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে নৌকা নিয়ে বিলে নামেন শাপলা সংগ্রহকারীরা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা পানিতে ঘুরে শাপলা সংগ্রহ করে তা নিয়ে আসেন স্থানীয় পাইকারদের কাছে। পাইকাররা এসব শাপলা কিনে ভ্যানযোগে উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজার এবং পাশের গৌরনদী ও উজিরপুর উপজেলার গ্রামাঞ্চলে বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিক্রি করেন। কেউ কেউ সরাসরি বাজারেও বসেন।

আগৈলঝাড়ার চেংগুটিয়া-চৌদ্দমেদা বিলসহ বিভিন্ন বিল ও জলাবদ্ধ কৃষিজমিতে এখন শাপলা সংগ্রহের ব্যস্ততা। উপজেলার রাজিহার, গৈলা, বাকাল, বাগধা ও রত্নপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকার মানুষ এ মৌসুমি পেশায় যুক্ত হয়েছেন।

চেংগুটিয়া-চৌদ্দমেদা বিলের শাপলা সংগ্রহকারী মো. আহ আলম বলেন, ‘বর্ষায় কৃষিজমি পানির নিচে থাকে। তখন কৃষিকাজ তেমন থাকে না। তাই ভোরে নৌকা নিয়ে বিলে যাই। দিনে ২০০ থেকে ৪০০ মুঠা পর্যন্ত শাপলা সংগ্রহ করতে পারি।’

সংগ্রহকারীদের কাছ থেকে পাইকাররা মুঠাপ্রতি প্রায় পাঁচ টাকা দরে শাপলা কিনে নেন। পরে ভ্যানযোগে বিভিন্ন এলাকায় নিয়ে তা খুচরা বিক্রি করেন। এতে পাইকারদেরও তৈরি হয়েছে মৌসুমি আয়ের সুযোগ।

পাইকার অসিম মন্ডল বলেন, ‘সংগ্রহকারীদের কাছ থেকে এক মুঠা শাপলা পাঁচ টাকা দরে কিনি। পরে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ১০ টাকা করে বিক্রি করি। প্রতিদিন প্রায় ২০০ থেকে ৩০০ মুঠা বিক্রি হয়। সব খরচ বাদ দিয়ে ভালোই আয় থাকে।’

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্ষা মৌসুমে একজন সংগ্রহকারী প্রতিদিন গড়ে ২০০ থেকে ২৫০ মুঠা শাপলা সংগ্রহ করতে পারেন। ভালো দিনে কারও কারও আয় দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকা পর্যন্ত হয়। অন্যদিকে পাইকারি কেনাবেচায় যুক্তদের দৈনিক বিক্রি দুই থেকে তিন হাজার টাকা বা তারও বেশি হতে পারে।

শাপলা সংগ্রহকারী মজিবুর রহমান বলেন, বছরের প্রায় চার মাস তিনি এ কাজ করেন। তাঁর ভাষায়, ‘এই সময় জমিতে কাজ থাকে না। শাপলা তুলে বিক্রি করে যে টাকা পাই, তা দিয়ে সংসারের প্রয়োজনীয় খরচ চালাই। কোনো পুঁজি লাগে না, তাই বর্ষায় এটি আমাদের জন্য বড় ভরসা।’

স্থানীয়ভাবে শাপলা মূলত সবজি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। শাপলার ডাঁটা দিয়ে তৈরি তরকারি গ্রামাঞ্চলের পরিচিত খাবার। সাম্প্রতিক সময়ে শহরাঞ্চলেও এর চাহিদা বাড়ছে। ফলে বর্ষাকালে বিল, ডোবা ও জলাশয় থেকে বিনা খরচে পাওয়া শাপলা স্থানীয় বাজারে অর্থকরী পণ্যে পরিণত হয়েছে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, আষাঢ় থেকে ভাদ্র—এই তিন-চার মাস শাপলার মৌসুম। বর্ষার পানিতে ডুবে থাকা ধান, পাট ও ধঞ্চের জমির পাশাপাশি খাল-বিল, পুকুর ও ডোবাতেও প্রাকৃতিকভাবে শাপলা জন্মে। উৎপাদনের জন্য আলাদা বিনিয়োগ করতে হয় না বলে এটি নিম্নআয়ের মানুষের কাছে বাড়তি আয়ের সহজ সুযোগ তৈরি করেছে।

আগৈলঝাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুনীতি কুমার সাহা বলেন, ‘শাপলা প্রচলিত কৃষিপণ্যের আওতাভুক্ত নয়। এটি মূলত প্রাকৃতিকভাবে কৃষিজমি, পুকুর, ডোবা ও জলাশয়ে জন্মে। ফলে এ বিষয়ে কৃষি বিভাগের সরাসরি পরামর্শ দেওয়ার সুযোগ সীমিত। তবে কৃষকদের বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করার চেষ্টা করা হয়।’ শাপলা কিছুটা বেশি সময় সংরক্ষণ করা যায় কীভাবে, সে বিষয়েও পরামর্শ দেওয়া হয় বলে জানান তিনি।

বর্ষায় আগৈলঝাড়ার বিলাঞ্চলের মানুষের জন্য শাপলা যেন পানির ওপর ভেসে ওঠা এক জীবিকার সুযোগ। কৃষিজমি পানিতে তলিয়ে গেলে যেখানে মাঠের কাজ কমে যায়, সেখানেই বিনা পুঁজিতে শাপলা সংগ্রহ করে আয় করছেন অনেকে। তাঁদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন পাইকার ও ভ্যানচালকরাও। এভাবে শাপলা সংগ্রহ, পাইকারি ও খুচরা বিক্রিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে ছোট একটি মৌসুমি অর্থনৈতিক বলয়।

জাতীয় ফুল শাপলা তাই আগৈলঝাড়ার মানুষের কাছে শুধু বর্ষার সৌন্দর্যের প্রতীক নয়; বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে এটি হয়ে উঠেছে বহু পরিবারের সংসার চালানোর নীরব অবলম্বন।

আরও খবর

Sponsered content