প্রতিনিধি ২৭ জুলাই ২০২৫ , ১:৩৪:৫৭ প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) লাইসেন্সিং শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-পরিচালক নাহিদুল হাসানকে ঘিরে একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগ উঠে এসেছে। সম্প্রতি ওই শাখায় তার পদায়নের পর থেকে আইএসপি (ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার) সেক্টরের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ, নীতিমালার বাইরে গিয়ে লাইসেন্স প্রদান, অস্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর মতো গুরুতর অভিযোগ এনেছেন সংশ্লিষ্টরা।
৩০১টি আইএসপি লাইসেন্স বাতিল, তারপরই শুরু হয় অস্বচ্ছ পুনরায় চালুর প্রক্রিয়া
সূত্র জানায়, দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই নাহিদুল হাসান যাচাই-বাছাই ছাড়াই বিভিন্ন ক্যাটাগরির ৩০১টি আইএসপি লাইসেন্স মেয়াদোত্তীর্ণ দেখিয়ে বাতিল করেন। এরপর ওই লাইসেন্সগুলো পুনরায় সচল করার নামে শুরু হয় তদবির, ঘুষ লেনদেন ও অনিয়মের অভিযোগ।
আইন ভেঙে জাতীয় আইএসপি লাইসেন্স দেওয়ার চেষ্টা, সংবাদে প্রকাশের পর প্রক্রিয়া স্থগিত
“আইএসপি গাইডলাইন” ও “সংখ্যা নিরূপণ নীতিমালা” উপেক্ষা করে তিনি সম্প্রতি একটি ন্যাশনওয়াইড আইএসপি লাইসেন্স প্রদান করতে উদ্যত হন। কিন্তু ২৬ এপ্রিল ২০২৫ টেকশোর প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের পর বিষয়টি চেপে যাওয়া হয়। এখনো পর্যন্ত এ নিয়ে কোনো তদন্ত শুরু হয়নি।
ভিতরের প্রতিরোধ ব্যর্থ, রাজনৈতিক প্রভাবে অপ্রতিরোধ্য অবস্থান
কমিশনের ভেতরের একাধিক সূত্র বলছে, নাহিদুল হাসান চেয়ারম্যান ও ইএন্ডও বিভাগের কমিশনারের ঘনিষ্ঠ হওয়ায় কেউ মুখ খুলতে সাহস পান না। আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে তিনি আস্থার প্রতীক হিসেবে অবস্থান পাকাপোক্ত করেছেন।
শোকজের বদলে বদলি, লাইসেন্স বইতে স্বাক্ষরের অডিট গরমিল
বিভাগীয় মহাপরিচালক কিছু বিধি বহির্ভূত লাইসেন্স ইস্যু বিষয়ে শোকজ করলেও—সিনিয়র সহকারী পরিচালক জাহিদুল ইসলাম, হামিদুল ইসলাম ও রাইসুল ইসলামসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে শাস্তি না দিয়ে বরং বদলির সুপারিশ করেন নাহিদুল। অভিযোগ রয়েছে, লাইসেন্স বইতে বিনা অনুমতিতে শতাধিক স্বাক্ষরও দিয়েছেন তিনি, যার কোনো অডিট ট্রেইল নেই।
পেছনের ইতিহাসেও দুর্নীতি, মাসোহারা, সফটওয়্যার লবিং ও এসওএফ দুর্নীতির অভিযোগ
নাহিদুল হাসানের অতীত নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়েও অডিট আপত্তি রয়েছে। গোপালগঞ্জের একজন আওয়ামী লীগ নেতার সন্তান ও সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দ মোদাচ্ছের আলীর ভাতিজা হওয়ার সুবাদে কোনো লিখিত পরীক্ষা ছাড়াই নিয়োগ পেয়েছেন বলে অভিযোগ।
ইন্ডও বিভাগে দায়িত্বে থাকা অবস্থায় তিনি লাইসেন্সবিহীন আইএসপি’র মাধ্যমে মাসোহারা নিতেন। DIS বিভাগে ব্যান্ডউইডথ ফাঁকির সঙ্গে জড়িত থাকা, ভেন্ডর লবিং করে সফটওয়্যার কিনতে আইআইজিদের চাপ প্রয়োগ, এমনকি এসএস বিভাগে এসওএফ তহবিল বরাদ্দে ঘুষ ছাড়া অর্থ ছাড় না করার অভিযোগও রয়েছে।
জাতীয় স্বার্থবিরোধী তৎপরতার অভিযোগ
সবচেয়ে উদ্বেগজনক অভিযোগ—তিনি দীর্ঘদিন ধরে ‘ফ্যাসিবাদের দোসর’ হিসেবে কাজ করছেন এবং একাধিক জাতীয় স্বার্থবিরোধী সিদ্ধান্তে তার ভূমিকা রয়েছে। তার উচ্চশিক্ষা ভারতে হওয়াকে এই তৎপরতার সঙ্গে যুক্ত করেছেন কয়েকটি সূত্র।
কোনো ব্যবস্থা নয়, তদন্তও হয়নি
একাধিক গুরুতর অভিযোগ ও নথিভিত্তিক প্রমাণ থাকার পরেও আজ পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে কোনো দৃশ্যমান তদন্ত বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এতে বিটিআরসির স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের মত:
টেলিকম খাতের বিশ্লেষকরা বলছেন, “যদি অবিলম্বে স্বতন্ত্র ও স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করে অভিযোগ যাচাই না করা হয়, তাহলে বিটিআরসির গোটা লাইসেন্সিং ব্যবস্থার ওপর থেকেই জনগণের আস্থা উঠে যাবে।”




















