আন্তর্জাতিক

লন্ডনে রাত্রি যাপনকারী পর্যটকদের জন্য কর আরোপের প্রস্তাব

  প্রতিনিধি ৫ ডিসেম্বর ২০২৫ , ৭:৫০:১৯ প্রিন্ট সংস্করণ

লন্ডনে রাত্রি যাপনকারী পর্যটকদের ওপর কর আরোপের প্রস্তাব ওঠেছে। এ প্রস্তাবনাকেস্বাগত জানিয়েছেন মেয়র সাদিক খান। বিবিসির প্রতিবেদনে জানা যায়, যুক্তরাজ্যের চ্যান্সেলর রেচেল রিভস ইংলিশ ডিভলিউশন অ্যান্ড কমিউনিটি এমপাওয়ারমেন্ট বিলের মাধ্যমে লন্ডনের মেয়র ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে এই কর আরোপের ক্ষমতা দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন। বিলটি বর্তমানে পার্লামেন্টে প্রক্রিয়াধীন।

মেয়র সাদিক খান দীর্ঘদিন ধরে এই ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের দাবি জানিয়ে আসছেন। প্রাথমিক হিসেবে দেখা গেছে, লন্ডনে পর্যটক কর চালু হলে বছরে প্রায় ২৪০ মিলিয়ন পাউন্ড পর্যন্ত রাজস্ব আসতে পারে। ২০২৪ সালে শহরটিতে রাতযাপনকারী পর্যটকের সংখ্যা ছিল ৮৯ মিলিয়ন।

জি৭ দেশের মধ্যে ব্যতিক্রম ইংল্যান্ড

বিবিসির তথ্যমতে, জি৭–এর সদস্য দেশগুলোর মধ্যে কেবল ইংল্যান্ডেই স্থানীয় সরকার পর্যটক কর আরোপে জাতীয় সরকারের বাধার মুখে পড়ে। স্কটল্যান্ড ও ওয়েলস ইতোমধ্যেই ভিন্ন কাঠামোয় রাতযাপনের ওপর কর আদায় শুরু করেছে।

২০২৬ সাল থেকে ওয়েলসে প্রতি রাতের জন্য ১.৩০ পাউন্ড করে নেওয়া হবে।

লন্ডনে করের ধরন কী হতে পারে?

গ্রেটার লন্ডন অথরিটি (জিএলএ) সম্প্রতি থিঙ্কট্যাঙ্ক সেন্টার ফর সিটিজ–কে সম্ভাব্য কর কাঠামো নিয়ে গবেষণা করতে বলে। তাদের বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিশ্বের বড় শহর—প্যারিস, মিলান, মিউনিখ, নিউইয়র্ক, টোকিও এবং টরন্টো—তিন ধরনের পদ্ধতিতে পর্যটক কর নেয়।

নিউইয়র্ক ও টরন্টো: থাকার বিলের শতাংশ হিসেবে কর—নিউইয়র্ক বছরে আদায় করে ৪৯৩ মিলিয়ন পাউন্ড।

টোকিও: সব ধরনের থাকার জন্য একক নির্দিষ্ট ফি—আয় ৩৫ মিলিয়ন পাউন্ড, যদিও শহরটিতে রাতযাপনকারী পর্যটক সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি।

ফ্রান্স ও ইতালি: হোটেলের মান, অবস্থান ও তারকা–রেটিং অনুসারে কর নির্ধারণ।

যুক্তরাজ্যে জাতীয় পর্যায়ে কোনো বাধ্যতামূলক ‘স্টার–রেটিং’ নেই—এ কারণে লন্ডনের জন্য শতাংশভিত্তিক বা নির্দিষ্ট ফি–পদ্ধতি দুটিই উপযোগী হতে পারে বলে মনে করে সেন্টার ফর সিটিজ।

জিএলএর ২০১৭ সালের এক পূর্বানুমানে বলা হয়েছিল, প্রতিদিন মাত্র ১ পাউন্ড কর আরোপ করলে বছরে ৯১ মিলিয়ন পাউন্ড, আর ৫% কর আরোপ করলে ২৪০ মিলিয়ন পাউন্ড রাজস্ব আসতে পারে।

গবেষণা আরও বলছে, বড় শহরগুলোতে দর্শনার্থীরা সাধারণত করের প্রভাবকে খুব একটা গুরুত্ব দেয় না। তাই লন্ডনে মাঝারি মাত্রার কর আরোপ করলে দর্শনার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমার আশঙ্কা নেই।

অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহায়ক হতে পারে

সেন্টার ফর সিটিজ মনে করে, সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে পারলে পর্যটক কর লন্ডনের অবকাঠামো–উন্নয়ন, ব্যবসায়িক পরিবেশ, এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি—সবকিছুতেই ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। কর হার নির্ধারণ ও রাজস্ব ব্যবহারের ক্ষমতা মেয়রের হাতে থাকলে বাজারের পরিস্থিতি অনুযায়ী দ্রুত পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে—যেমনটা টরন্টো আগামী বিশ্বকাপকে সামনে রেখে করেছে।

প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী অ্যান্ড্রু কার্টার বলেন, `স্কটল্যান্ডে যে নমনীয় মডেলে কর নেওয়া হচ্ছে—লন্ডনের জন্য সেটিই সবচেয়ে উপযোগী। চাহিদা বাড়লে বা কমলে কর হারও সামঞ্জস্য করা সম্ভব।”

তিনি আরও বলেন, করের অর্থ স্থানীয় সরকারের হাতে এলে তা লন্ডনের পর্যটন ও অর্থনীতিকে দৃঢ় করবে এবং ভবিষ্যতে আরও বিকেন্দ্রীকরণ সম্ভব হবে।’

হসপিটালিটি খাতে সমালোচনা

তবে পর্যটন করের ধারণায় উদ্বেগ জানাচ্ছে হোটেল এবং রেস্তোরাঁ খাত। ইউকে হসপিটালিটি–র চেয়ার কেট নিকলস বিবিসি–কে বলেন,

“এটি ব্রিটিশ পরিবার এবং ব্যবসায়িক ভ্রমণকারীদের ওপর বড় ধরনের বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। অনেকেই লন্ডনকে এড়াতে চাইবে।”

তার মতে, যুক্তরাজ্যে ভ্যাট হার ২০% হওয়ায় নতুন একটি কর যোগ হলে খরচ আরও বেড়ে যাবে এবং তা চাকরি ও বিনিয়োগের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

লন্ডনের বারোগুলি কি সমর্থন দেবে?

ওয়েস্টমিনস্টারের কাউন্সিল প্রধান অ্যাডাম হাগ বলেন,

“আমাদের দিনে জনসংখ্যা এক মিলিয়নের বেশি, রাতে মাত্র দুই লাখ। স্থানীয় করদাতারা পুরো লন্ডনের সুবিধা বহন করছেন—সেটা ঠিক নয়। রাতযাপন কর এই ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে পারে।”

সাউথওয়ার্ক ও ব্রেন্টসহ আরও কয়েকটি বরো ইতোমধ্যেই কর আরোপের পক্ষে মত দিয়েছে।

মেয়রের অবস্থান

যদিও প্রস্তাবটি নিয়ে চূড়ান্ত ঘোষণা এখনো আসেনি, লন্ডন মেয়রের কার্যালয় জানায়,

“আন্তর্জাতিক শহরগুলোর মতো সামান্য পর্যটক কর লন্ডনের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবে এবং শহরের বৈশ্বিক অবস্থান আরও মজবুত করবে।”

পরবর্তী পদক্ষেপ

চ্যান্সেলর রিভস আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ইতোমধ্যে রিচমন্ড কাউন্সিল স্থানীয় পর্যটক কর চালুর জন্য একটি অ্যাকমোডেশন বিজনেস ইমপ্রুভমেন্ট ডিস্ট্রিক্ট (ABID) গঠনের পরিকল্পনা করছে। তবে পুরো লন্ডনজুড়ে কর চালু হলে এসব স্থানীয় স্কিম বাতিল হয়ে যেতে পারে।

 

 

যুক্তরাজ্যে ফেসিয়াল রিকগনিশন ব্যবহারে নতুন আইন প্রণয়নের পথে সরকার

 

 

যুক্তরাজ্য সরকার জাতীয় নিরাপত্তা ও অপরাধ দমনে ফেসিয়াল রিকগনিশন এবং বায়োমেট্রিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে আনুষ্ঠানিক পরামর্শ প্রক্রিয়া শুরু করেছে। সরকারের দাবি—এই প্রযুক্তি প্রয়োগ করলে পুলিশ বাহিনী অপরাধী শনাক্তে এমন এক যুগান্তকারী সুবিধা পাবে, যা ডিএনএ পরীক্ষার পর আর কখনো দেখা যায়নি।

ফেসিয়াল রিকগনিশনে পুলিশের ক্রমবর্ধমান সাফল্য

মেট্রোপলিটন পুলিশের তথ্য বলছে, গত দুই বছরে এই প্রযুক্তির সাহায্যে ১,৩০০ অপরাধী গ্রেপ্তার হয়েছে। যৌন অপরাধ, পারিবারিক সহিংসতা ও গুরুতর হামলার মতো অপরাধে জড়িত অনেকেই এই প্রক্রিয়ায় ধরা পড়েছে। পাশাপাশি শর্ত ভঙ্গ করা শতাধিক যৌন অপরাধীকেও ট্র্যাক করা সম্ভব হয়েছে।

ক্রাইম অ্যান্ড পুলিশিং মন্ত্রী সারা জোন্স মনে করেন,

“অপরাধ দমনে ফেসিয়াল রিকগনিশন এক বৈপ্লবিক ধাপ—যা আমাদের নিরাপত্তা কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করবে।”

কীভাবে প্রযুক্তি ব্যবহার হচ্ছে?

বর্তমানে পুলিশ তিন ধরনের ফেসিয়াল রিকগনিশন সিস্টেম ব্যবহার করছে—

• অতীতচিত্র বিশ্লেষণ (রেট্রোস্পেকটিভ): ঘটনাস্থলের সিসিটিভি বা ভিডিও ফুটেজ দেখে সন্দেহভাজন মিলিয়ে দেখা।

• রিয়েল–টাইম শনাক্তকরণ: লাইভ ক্যামেরা ফুটেজে সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে তালিকার সঙ্গে মেলানো।

• মোবাইল শনাক্তকরণ: পুলিশ কর্মকর্তাদের মোবাইল অ্যাপে দ্রুত পরিচয় যাচাইয়ের সুবিধা।

জনমত, নীতি ও সুরক্ষা– সবই আলোচনায়

দশ সপ্তাহের এই পরামর্শ সময়কালে প্রযুক্তির গ্রহণযোগ্যতা, গোপনীয়তার ঝুঁকি, প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং ব্যবহারের সঠিক ক্ষেত্র নির্ধারণ নিয়ে আলোচনা হবে। পাশাপাশি, বায়োমেট্রিক ও ফেসিয়াল রিকগনিশনের ব্যবহার পর্যবেক্ষণের জন্য একটি একক নিয়ন্ত্রক সংস্থা গঠনের প্রস্তাবও সামনে এসেছে।

হোম অফিসের নতুন গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, জনসাধারণের মধ্যে রেট্রোস্পেকটিভ ফেসিয়াল রিকগনিশনের গ্রহণযোগ্যতা অত্যন্ত বেশি—৯৭% মানুষ অন্তত কিছু ক্ষেত্রে এর ব্যবহার অনুমোদন করেন। লাইভ ফেসিয়াল রিকগনিশনের ক্ষেত্রেও সমর্থন উল্লেখযোগ্য—৮৮% মানুষ এর প্রয়োগকে সুবিধাজনক মনে করেন।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

ন্যাশনাল পুলিশ চিফস’ কাউন্সিলের প্রতিনিধি লিন্ডসি চিসউইক জানান, প্রযুক্তিটি নিখোঁজ মানুষ শনাক্ত করা এবং নজরদারির আওতাধীন ব্যক্তিদের ট্র্যাক করার ক্ষেত্রে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। তার মতে, বর্তমান সুরক্ষাব্যবস্থা যথেষ্ট হলেও আরও পরিমার্জন প্রয়োজন।

সাবেক কাউন্টার টেররিজম প্রধান নিল বাসু প্রযুক্তির সুবিধা তুলে ধরে বলেন,

“অপরাধীদের শনাক্ত করতে এটি আধুনিক যুগের ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা ডিএনএ–র সমতুল্য। তবে যথাযথ আইনি কাঠামো এবং মানবিক যাচাই–বাছাই অবশ্যই থাকা দরকার।”

টেকইউকে–এর ডিরেক্টর সু ডেইলি উদ্বেগ ও সম্ভাবনা দুটোই উল্লেখ করেন—প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে নিশ্চিত ও পরিষ্কার নীতিমালা না থাকলে দীর্ঘমেয়াদে জনবিশ্বাস ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।

নিখোঁজ ব্যক্তিদের নিয়ে কাজ করা সংস্থা মিসিং পিপলের পরিচালক সুজানা ড্রুরি মনে করেন, দায়িত্বশীল ব্যবহারে প্রযুক্তিটি অনেক প্রাণ বাঁচাতে পারে; তবে নৈতিক প্রশ্নগুলো এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়।

অর্থায়ন বাড়াচ্ছে সরকার

ফেসিয়াল রিকগনিশনের উন্নয়ন ও বিস্তারে গত বছর সরকার ১২.৬ মিলিয়ন পাউন্ড ব্যয় করেছে। এ বছর আরও একটি জাতীয় ফেসিয়াল–ম্যাচিং সেবা তৈরির জন্য বড় অঙ্কের বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

সরকার বলছে, তাদের লক্ষ্য একটাই—অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত করা এবং দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আধুনিক প্রযুক্তি দিয়ে আরও মজবুত করা। এই পরামর্শ প্রক্রিয়ার ফলাফলের ওপরই নির্ভর করবে ভবিষ্যতে আইন ও নির্দেশিকা কীভাবে সাজানো হবে।

আরও খবর

Sponsered content