নেত্রকোনার হাওরাঞ্চল বছরের প্রায় অর্ধেক সময় পানিতে ডুবে থাকে। আগাম বন্যা, খরা ও নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করেই জীবনযাপন করেন এখানকার মানুষ। বর্ষা মৌসুম এলেই কমে যায় কাজের সুযোগ, বাড়ে অনিশ্চয়তা। এমন বাস্তবতায় মদন উপজেলার কুটুরীকোণা গ্রামে গড়ে ওঠা সনাতনী হাঁসের হ্যাচারি এখন হাওরাঞ্চলের মানুষের জন্য বিকল্প অর্থনীতির বড় সম্ভাবনা হয়ে উঠেছে।
একসময় ছোট পরিসরে শুরু হওয়া হাঁসের বাচ্চা উৎপাদনের উদ্যোগ এখন শুধু একটি গ্রামের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এটি পুরো হাওরাঞ্চলের অন্যতম কর্মসংস্থানের খাতে পরিণত হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, সরাসরি ও পরোক্ষভাবে এই খাতের সঙ্গে যুক্ত হয়ে প্রায় দুই লাখ নারী-পুরুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।
মদন, মোহনগঞ্জ ও খালিয়াজুরীসহ বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলে বর্ষা মৌসুমে কৃষিকাজ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। নদী-খাল-বিল ভরাট, আগাম বন্যা ও জলাবদ্ধতায় কৃষি ও মৎস্য খাতেও বেড়েছে অনিশ্চয়তা। ফলে জীবিকার তাগিদে প্রতিবছর বহু মানুষ শহরমুখী হন। তবে কুটুরীকোণার হাঁসের হ্যাচারি সেই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে।
১৯৯০ সালে কুটুরীকোণা গ্রামের ইদ্রিস মিয়া মাত্র ১২ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন ‘নাজাহ হাঁসের খামার ও হ্যাচারি’। পরে তার ছেলে আমিনুল ইসলাম উদ্যোগটিকে আরও সম্প্রসারণ করেন। বর্তমানে খামারটিতে প্রায় ৩০ লাখ টাকার বিনিয়োগ রয়েছে।
খামার সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিন উৎপাদিত এক দিন বয়সী হাঁসের বাচ্চা ৩৫ টাকা দরে বিক্রি হয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দামও বাড়ে। মাস শেষে এই খামার থেকে তিন থেকে চার লাখ টাকা পর্যন্ত লাভ হয়। দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরাসরি ও অনলাইনের মাধ্যমে এসব হাঁসের বাচ্চা বিক্রি করা হচ্ছে।
উদ্যোক্তা আমিনুল ইসলাম বলেন, “বাবা খুব ছোট পরিসরে কাজ শুরু করেছিলেন। এখন আমরা বড় আকারে কাজ করছি। সঠিক পরিচর্যা করলে এই খাতে ভালো লাভ করা সম্ভব। আমার ধারণা, সারা দেশে প্রায় দুই লাখ নারী-পুরুষ এই খাতের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছেন।”
তার সফলতা দেখে গ্রামের আরও অনেক পরিবার হাঁসের বাচ্চা উৎপাদনে যুক্ত হয়েছে। ফলে বর্ষাকালের কর্মহীন সময়েও স্থানীয় মানুষের আয় হচ্ছে। কমছে শহরমুখী মানুষের চাপ, বাড়ছে গ্রামভিত্তিক কর্মসংস্থান।
গ্রামের টিনশেড বা কাঁচা ঘরের ভেতরে তৈরি ছোট ছোট হ্যাচারিতে সারিবদ্ধভাবে রাখা হয় ডিম। হ্যারিকেনের আলো ও তুষের তাপে প্রয়োজনীয় উষ্ণতা তৈরি করা হয়। অভিজ্ঞ কারিগরদের তত্ত্বাবধানে ২৭ থেকে ২৮ দিনের মধ্যেই ডিম ফুটে বের হয় হাঁসের বাচ্চা।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সনাতনী পদ্ধতিতে উৎপাদিত হাঁসের বাচ্চার মৃত্যুহার তুলনামূলক কম এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতাও বেশি। এ কারণে বাজারে এসব বাচ্চার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।
শুধু হ্যাচারির মালিকরাই নন, আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ডিম সংগ্রহ ও সরবরাহ করেও আয় করছেন অনেক মানুষ। ফলে এই উদ্যোগকে ঘিরে গড়ে উঠেছে একটি বড় অর্থনৈতিক চক্র।
ক্রেতাদের ভাষ্য, কুটুরীকোণার হাঁসের বাচ্চার মান ভালো হওয়ায় তারা এখান থেকেই কিনতে আগ্রহী।
জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ জানিয়েছে, কুটুরীকোণা গ্রামে বছরে প্রায় তিন কোটি হাঁসের বাচ্চা উৎপাদন হয়। স্থানীয় অর্থনীতির পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে এই খাত।
প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, হাঁসের হ্যাচারি শিল্পকে আরও সম্প্রসারণে সরকারি সহায়তা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।