সম্পাদকীয়

সোনার ঝলক আর অর্থনীতির ধূসর বাস্তবতা

  এটিএম রাকিবুল বাসার ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫ , ১২:০৩:৫৫ প্রিন্ট সংস্করণ

বুধবার দেশের বাজারে সোনা ও রুপার দামে নতুন রেকর্ড তৈরি হয়েছে। একই সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক জানাল, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও সামান্য বেড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২২ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের মোট (গ্রস) বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩২.৭২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিপিএম–৬ হিসাব পদ্ধতিতে এই রিজার্ভের পরিমাণ প্রায় ২৮.০৪ বিলিয়ন ডলার। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে রিজার্ভের এই বৃদ্ধি সংখ্যাগতভাবে ইতিবাচক মনে হলেও বাস্তব অর্থনীতিতে এর প্রতিফলন খুব একটা চোখে পড়ে না।

কারণ, সাধারণ মানুষের জীবনে সোনার দাম বা রিজার্ভের অঙ্ক খুব কমই আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। তাদের ভাবনায় থাকে নিত্যপণ্যের দাম, কাজের নিশ্চয়তা আর মাসের শেষে সংসার চালানোর হিসাব। অথচ রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা বাড়লেই অর্থনীতির নানা সূচক নিয়ে জোর আলোচনা শুরু হয়—বিশেষজ্ঞরা হিসাব কষেন, বিশ্লেষণ দেন, কিন্তু বাস্তব জীবনের অনিশ্চয়তা তাতে খুব কমই কমে।

বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় এই অস্থিরতার প্রভাব সর্বত্র। কাঁচাবাজার থেকে শেয়ারবাজার—সবখানেই অনিশ্চয়তার ছাপ। বিনিয়োগ প্রায় স্থবির। মাঝে মধ্যে কিছু পরিসংখ্যান বা ঘোষণা দিয়ে আশাবাদের ঢেউ তোলার চেষ্টা হয়, কিন্তু বাস্তবে নতুন বিনিয়োগ নেই বললেই চলে। পুরোনো বিনিয়োগও ঝুঁকির মুখে। শিল্প উৎপাদন কমছে, কর্মসংস্থান সংকুচিত হচ্ছে, ছাঁটাই যেন নিত্যদিনের ঘটনা। এর ফল হিসেবে বেকার ও ছদ্মবেকারের সংখ্যা বাড়ছে নীরবে, কিন্তু ভয়াবহ গতিতে।

অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সঞ্চালনপথ পুঁজিবাজার দীর্ঘদিন ধরেই মন্দাগ্রস্ত। সাম্প্রতিক দেড় বছরে সেই মন্দা আরও গভীর হয়েছে। উৎপাদন ও উন্নয়ন কার্যক্রমে স্থবিরতার কারণে ব্যাংকগুলোতে জমে উঠেছে অলস তারল্য। তাত্ত্বিকভাবে এই অর্থ পুঁজিবাজারে প্রবাহিত হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা হচ্ছে না। অথচ বাজারের মূল্যায়ন এমন পর্যায়ে নেমেছে, যেখানে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হওয়ার কথা ছিল।

বিশ্বের যেকোনো দেশেই বিনিয়োগের মূল শর্ত হলো আস্থা—রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আইনের শাসন এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে পূর্বানুমেয়তা। বাংলাদেশে এই আস্থার সংকট দীর্ঘদিনের। রাজনৈতিক ও সামাজিক অনিশ্চয়তা কেবল বিনিয়োগ নয়, কর্মসংস্থান, মজুরি, কৃষি, সামাজিক নিরাপত্তা—সব ক্ষেত্রেই ভঙ্গুরতা তৈরি করছে। সমাজে বৈষম্য বাড়ছে, যা এক সময় পরিবর্তনের স্বপ্ন জাগানো আন্দোলনগুলোর মূল বিরোধী স্রোত।

এক সময় মনে হয়েছিল, বড় রাজনৈতিক পরিবর্তন নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলবে। কিন্তু নানা জটিলতায় সেই সম্ভাবনা আজ অনেকটাই ফিকে। মানুষ এখন বড় স্বপ্ন নয়, ন্যূনতম নিশ্চয়তা চায়—পেটভরে ভাত, মাথার ওপর ছাদ আর ভবিষ্যৎ নিয়ে একটু ভরসা।

এই প্রেক্ষাপটে সরকারও স্বস্তিতে আছে—এ কথা বলা কঠিন। ঘাটতি মেটাতে সরকারকে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম কয়েক মাসেই সঞ্চয়পত্র থেকে আবার নিট ঋণ নিতে শুরু করেছে সরকার, যেখানে আগের কয়েক বছর নিট বিক্রি ছিল ঋণাত্মক। ব্যাংক ব্যবস্থা থেকেও বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে সরকারি বহু প্রতিষ্ঠান উচ্চ আর্থিক ঝুঁকিতে রয়েছে—যার বোঝা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকেই বইতে হবে।

কিন্তু সরকার ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের যেখানে পুনর্গঠন বা ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ আছে, সেখানে ব্যবসায়ী বা সাধারণ মানুষের কোনো সুরক্ষা নেই। তাদের টিকে থাকতে হয় নিজস্ব আয়েই—উৎপাদন, শ্রম আর সীমিত সঞ্চয়ের ওপর ভর করে। একটু ভুল হলেই জীবনযাত্রা এলোমেলো হয়ে যায়।

সোনার দাম বাড়া কিংবা রিজার্ভের অঙ্ক সামান্য বাড়া তাই বড় কোনো স্বস্তির বার্তা দেয় না। প্রকৃত স্বস্তি আসবে তখনই, যখন বিনিয়োগ ফিরবে, কর্মসংস্থান বাড়বে এবং মানুষ ভবিষ্যৎ নিয়ে আবার বিশ্বাস করতে পারবে। অর্থনীতির আসল শক্তি সংখ্যায় নয়, মানুষের আস্থায়—এই সত্যটি নতুন করে উপলব্ধি করার সময় এখনই।

লিখেছেন: এটিএম রাকিবুল বাসার , সম্পাদক দৈনিক মতপ্রকাশ ।

আরও খবর

Sponsered content