লালপুর (নাটোর) প্রতিনিধি: ৩ জুন ২০২৬ , ৩:২৩:৩৬ প্রিন্ট সংস্করণ
নাটোরের লালপুর উপজেলার গোপালপুরে অবস্থিত ঐতিহাসিক আজিমনগর রেলওয়ে স্টেশন একদিকে যেমন উত্তরবঙ্গের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ কেন্দ্র, অন্যদিকে তেমনি মহান মুক্তিযুদ্ধের এক রক্তস্নাত স্মৃতিরও ধারক। তবে গৌরবময় ইতিহাসের অধিকারী এই স্টেশনটি দীর্ঘদিন ধরে জনবল সংকটে ভুগছে, যার কারণে যাত্রীসেবা ব্যাহত হচ্ছে এবং বারবার বন্ধ হওয়ার শঙ্কা দেখা দিচ্ছে।
১৮৭৯ সালে ব্রিটিশ আমলে ‘গোপালপুর রেলস্টেশন’ নামে যাত্রা শুরু করে স্টেশনটি। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ১৯৭১ সালের ৫ মে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলে বর্বর হত্যাকাণ্ড চালায়। এ ঘটনায় মিলের তৎকালীন প্রশাসক লেফটেন্যান্ট আনোয়ারুল আজিমসহ বহু কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিক নিহত হন। পরে শহীদ আনোয়ারুল আজিমের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ১৯৭৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারি স্টেশনটির নাম পরিবর্তন করে ‘আজিমনগর রেলস্টেশন’ রাখা হয়।
রাজধানী ঢাকা ও উত্তরবঙ্গের মধ্যে যোগাযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই স্টেশন দিয়ে প্রতিদিন হাজারো যাত্রী যাতায়াত করেন। এছাড়া নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের পণ্য পরিবহন এবং ঈশ্বরদী ইপিজেডের শ্রমিকদের যাতায়াতে স্টেশনটির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমানে টুঙ্গিপাড়া এক্সপ্রেস, কপোতাক্ষ এক্সপ্রেস, সাগরদাঁড়ি এক্সপ্রেস, লালমনি এক্সপ্রেস, পঞ্চগড় এক্সপ্রেস, বনলতা এক্সপ্রেস, রূপসা এক্সপ্রেস, সীমান্ত এক্সপ্রেস, ধূমকেতু এক্সপ্রেস, পদ্মা এক্সপ্রেস, সিল্কসিটি এক্সপ্রেস, একতা এক্সপ্রেস, দ্রুতযান এক্সপ্রেস, বুড়িমারী এক্সপ্রেস, নীলসাগর এক্সপ্রেস, কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস, রংপুর এক্সপ্রেস ও চিলাহাটি এক্সপ্রেসসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রেন এ স্টেশনে যাত্রাবিরতি করে।
তবে দীর্ঘদিন ধরে স্টেশনটি স্টেশন মাস্টার ও পয়েন্টসম্যানসহ প্রয়োজনীয় জনবলের তীব্র সংকটে রয়েছে। এ কারণে ২০১৩, ২০১৭, ২০২০, ২০২১, ২০২২ এবং ২০২৩ সালে বিভিন্ন সময় স্টেশনটির কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। প্রতিবারই স্থানীয় যাত্রী, ব্যবসায়ী ও এলাকাবাসীর আন্দোলনের মুখে কর্তৃপক্ষ সাময়িকভাবে স্টেশনটি চালু করলেও সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি।
স্থানীয় ব্যবসায়ী মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, “আজিমনগর স্টেশন শুধু যাতায়াতের মাধ্যম নয়, এটি আমাদের এলাকার গর্ব। অথচ সামান্য জনবল সংকটের কারণে বারবার আমাদের আন্দোলন করতে হয়। আমরা স্থায়ী সমাধান চাই।”
নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের এক শ্রমিক বলেন, “এত গুরুত্বপূর্ণ একটি স্টেশন জনবল সংকটে বারবার বন্ধ হওয়ার মুখে পড়বে, এটা মেনে নেওয়া যায় না। ট্রেনের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং যাত্রীসেবার মান উন্নয়ন এখন সময়ের দাবি।”
এলাকাবাসী ও রেলযাত্রী কল্যাণ পরিষদের নেতারা অবিলম্বে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ, স্টেশনের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম সচল রাখা, প্ল্যাটফর্মের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং যাত্রী ছাউনির আধুনিকায়নের দাবি জানিয়েছেন।
তাদের মতে, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত এবং উত্তরবঙ্গের গুরুত্বপূর্ণ এই রেলস্টেশনকে অবহেলার মধ্যে ফেলে রাখা উচিত নয়। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে আজিমনগর রেলস্টেশনের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে।














