সারাদেশ

ওসমানী হাসপাতালে দালাল-চোরচক্রের দৌরাত্ম্য, প্রতিদিনই প্রতারণার শিকার রোগী-স্বজন

  সিলেট প্রতিনিধি: ২৯ এপ্রিল ২০২৬ , ৯:০৯:৫২ প্রিন্ট সংস্করণ


সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দালাল ও চোরচক্রের দৌরাত্ম্য দিন দিন বেড়েই চলেছে। চিকিৎসা নিতে এসে প্রতিনিয়ত প্রতারণা, চুরি ও অতিরিক্ত দামে ওষুধ কেনার মতো ঘটনার শিকার হচ্ছেন রোগী ও তাদের স্বজনরা।

কানাইঘাট উপজেলার বাসিন্দা চল্লিশোর্ধ সালমা বেগম গত ২৯ এপ্রিল বেলা ১১টার দিকে হাসপাতালের বহির্বিভাগের সামনে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি জানান, অর্থোপেডিক বিভাগে ভর্তি থাকা তার কিশোর ছেলের জন্য ওষুধ কিনতে বের হলে এক নারী তার সঙ্গে পরিচয় করে একটি ফার্মেসিতে নিয়ে যায়। ওষুধের দাম ১ হাজার ৫০০ টাকা বলে তার কাছ থেকে টাকা নিয়ে ওই নারী উধাও হয়ে যায়। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করেও তাকে না পেয়ে অসহায় হয়ে পড়েন সালমা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতারণায় জড়িত ওই নারীর নাম খাদিজা বেগম। অভিযোগ রয়েছে, তিনি দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতাল এলাকায় দালালি ও চুরির সঙ্গে যুক্ত এবং একটি সংঘবদ্ধ চক্র পরিচালনা করেন।

এ ধরনের ঘটনা নতুন নয়। গত ১০ ফেব্রুয়ারি বশির উদ্দিন নামের এক ব্যক্তি তার ছেলের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে এসে একই ধরনের প্রতারণার শিকার হন। এক যুবক তাকে একটি ফার্মেসিতে নিয়ে গিয়ে ৩ হাজার ২৬০ টাকা দাম বলে। পরে অন্য দোকান থেকে একই ওষুধ কিনতে গিয়ে তিনি দেখেন, প্রকৃত দাম মাত্র ১ হাজার ৩৫০ টাকা।

এছাড়া হাসপাতালের ভেতরে চুরি-ছিনতাইও প্রায় নিত্যদিনের ঘটনা। গত ৭ আগস্ট এক গণমাধ্যমকর্মীর মানিব্যাগ চুরি হয় এবং ১৪ এপ্রিল একটি ওয়ার্ড থেকে এক মোবাইল চোরকে আটক করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, ওয়ার্ড থেকে রোগীর ওষুধ চুরি পর্যন্ত হচ্ছে, যেখানে কিছু নার্স, আয়া ও আউটসোর্সিং কর্মীদের সম্পৃক্ততার কথাও উঠে এসেছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে হাসপাতাল সংশ্লিষ্ট কয়েকজন জানান, দালাল ও চোরচক্র থেকে নিয়মিত অর্থ পায় একটি প্রভাবশালী মহল। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় পুলিশ ফাঁড়ি, দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্য, এমনকি কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীও এর সঙ্গে জড়িত। প্রতিদিন দালালরা পুলিশকে ৩০০ টাকা ও আনসার সদস্যদের ২০০ টাকা দিয়ে হাসপাতালে প্রবেশ করে বলে অভিযোগ রয়েছে।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ বলেন, পুলিশ নিয়মিত দালাল ও চোরদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছে এবং কাউকে চেনে না।

ওসমানী হাসপাতাল রোগী কল্যাণ সমিতির এক দাতা সদস্য বলেন, “দালাল ও চোরচক্রের কারণে হাসপাতালের সুনাম নষ্ট হচ্ছে। কর্তৃপক্ষ কঠোর নজরদারি বাড়ালে এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।”

সিলেট বিভাগের প্রধান সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই হাসপাতালে ৯০০ শয্যার বিপরীতে প্রায় আড়াই হাজার রোগী ভর্তি থাকে। বহির্বিভাগেও প্রতিদিন সমসংখ্যক রোগী চিকিৎসা নেন। বিপুল সংখ্যক রোগী ও স্বজনের ভিড়ের সুযোগ নিয়ে দালাল ও চোরচক্র সক্রিয় হয়ে উঠছে।

হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল বলেন, “একজন রোগীর সঙ্গে তিন থেকে পাঁচজন স্বজন থাকে। এতে কে দালাল আর কে প্রকৃত স্বজন, তা চিহ্নিত করা কঠিন। আমরা কাউকে জোর করে বের করে দিতে পারি না।”

হাসপাতাল সংশ্লিষ্টরা জানান, বিশেষ করে ১, ৩, ৬, ১১, ১৫ ও ২৬ নম্বর ওয়ার্ডে চুরির ঘটনা বেশি ঘটে। দালালরা রোগীর স্বজনদের কম দামে বা বাকিতে ওষুধ কিনে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে নিয়ে যায় এবং অনেক ক্ষেত্রে ৭০০ টাকার ওষুধ ৭ হাজার টাকায় বিক্রির ঘটনাও ঘটছে।

অভিযোগ রয়েছে, হাসপাতাল এলাকার কিছু ফার্মেসিও এই চক্রকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছে। বিশেষ করে ২ নম্বর গেটের সামনে মালিপাড়া গলিতে থাকা কয়েকটি ফার্মেসিকে ঘিরে এমন অভিযোগ বেশি শোনা যায়।

সংশ্লিষ্টদের মতে, কার্যকর নজরদারি ও সমন্বিত অভিযানের মাধ্যমে এই দালাল ও চোরচক্র দমন না করলে রোগীদের ভোগান্তি আরও বাড়বে।

আরও খবর

Sponsered content