আন্তর্জাতিক

উত্তর কোরিয়া-রাশিয়ার প্রথম সড়ক সেতু চালু

  প্রতিনিধি ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ , ১০:০০:১৩ প্রিন্ট সংস্করণ

উত্তর কোরিয়া ও রাশিয়ার মধ্যে প্রথমবারের মতো সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপন হয়েছে। দুই দেশের সীমান্তবর্তী তুমেন নদীর ওপর নির্মিত এক কিলোমিটার দীর্ঘ সড়ক সেতুটি সোমবার আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করা হয়েছে। সেতুটি চালুর মধ্য দিয়ে মস্কো ও পিয়ংইয়ংয়ের ক্রমবর্ধমান কৌশলগত অংশীদারত্বে নতুন মাত্রা যোগ হলো।

সোমবার সেতু দিয়ে পতাকাসজ্জিত প্রথম কয়েকটি ট্রাক চলাচল করে। এ সময় ভিডিও সংযোগের মাধ্যমে দুই দেশের শ্রমিক ও সরকারি কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মিখাইল মিশুস্তিন ও উত্তর কোরিয়ার প্রধানমন্ত্রী পাক থায়ে সং। বার্তাসংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এ সব ওঠয় জানা যায়।

দুই লেনের নতুন সেতুটির নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল গত বছরের এপ্রিলে। ২০২৪ সালে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের উত্তর কোরিয়া সফরের সময় প্রকল্পটির বিষয়ে দুই দেশ চুক্তিতে পৌঁছানোর পর এর নির্মাণ শুরু হয়।

মস্কো ও পিয়ংইয়ংয়ের মধ্যে আগে থেকেই সরাসরি বিমান ও রেল যোগাযোগ রয়েছে। তবে সোমবারের আগে দুই দেশের মধ্যে কোনো পূর্ণাঙ্গ সড়ক যোগাযোগ ছিল না। ১৯৫৯ সাল থেকে বিশেষ ব্যবস্থায় পাশের রেলসেতুর ওপর কাঠের তক্তা বসিয়ে যানবাহন পারাপার করা হতো। এতদিন সেটিই ছিল দুই দেশের মধ্যে স্থলসীমান্ত পারাপারের একমাত্র পথ।

সেতু উদ্বোধনের সময় মিশুস্তিন বলেন, সীমান্তপারের পরিবহন অবকাঠামোর সম্প্রসারণ দুই দেশের বাণিজ্য, অর্থনীতি, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও সাংস্কৃতিক সহযোগিতা আরও জোরদারে শক্তিশালী ভূমিকা রাখবে। মস্কো ও পিয়ংইয়ংয়ের সম্পর্ক ‘অভূতপূর্ব উচ্চতায়’ পৌঁছেছে উল্লেখ করে তিনি সেতুটিকে ‘সত্যিকার অর্থে ঐতিহাসিক ঘটনা’ বলে অভিহিত করেন।

তিনি আরও বলেন, এটি শুধু একটি প্রকৌশল প্রকল্প নয়; বরং দুই দেশের বন্ধুত্বের ‘নতুন প্রতীক’।

রুশ সরকারের তথ্য অনুযায়ী, সেতুটি দিয়ে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৩০০টি যান চলাচল করতে পারবে। এটি রাশিয়ার ফেডারেল সড়ক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হবে এবং দূরপ্রাচ্যের শহর ভ্লাদিভস্তক থেকে সেন্ট পিটার্সবার্গ পর্যন্ত বিস্তৃত পরিবহন করিডরের সঙ্গে সহজ সংযোগ তৈরি করবে। সেতুটি দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে পণ্যবাহী ট্রাক চলাচল শুরু হবে। চলতি বছরের শেষ নাগাদ এটি পুরোপুরি চালু হলে যাত্রীবাহী যানও চলাচল করতে পারবে।

নতুন সেতুটি ১৯৫৯ সালে চালু হওয়া পুরোনো ‘ফ্রেন্ডশিপ ব্রিজ’-এর কাছেই নির্মাণ করা হয়েছে। কোরীয় যুদ্ধের পর নির্মিত ওই সেতুটি এতদিন দুই দেশের মধ্যে প্রধান সীমান্ত সংযোগ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল।

নতুন সেতুটির নাম দেওয়া হয়েছে ইয়াকভ নোভিচেঙ্কোর নামে। তিনি ছিলেন সোভিয়েত রেড আর্মির একজন সেনা সদস্য। উত্তর কোরিয়ার প্রথম নেতা কিম ইল সুংকে ১৯৪৬ সালে হত্যাচেষ্টার সময় তার দিকে ছোড়া একটি গ্রেনেড নিজের শরীর দিয়ে ঠেকিয়ে কিমের জীবন রক্ষা করেছিলেন বলে পিয়ংইয়ংয়ের দাবি।

উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম কেসিএনএ মঙ্গলবার জানিয়েছে, নতুন সেতুটি দুই মিত্র দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো তৈরি করেছে। এর মাধ্যমে বাণিজ্যের পাশাপাশি পর্যটন ও দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগও বাড়বে বলে উল্লেখ করা হয়।

২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ শুরুর পর থেকে মস্কো ও পিয়ংইয়ংয়ের সম্পর্ক দ্রুত ঘনিষ্ঠ হয়েছে। ২০২৪ সালে ইউক্রেনীয় বাহিনীর কুরস্ক অঞ্চলে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে রাশিয়াকে সহায়তা করতে উত্তর কোরিয়া হাজার হাজার সেনা পাঠায়। সোমবারের বক্তব্যে মিশুস্তিনও রাশিয়ার সেনাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রুশ ভূখণ্ড রক্ষায় লড়াই করা ‘কোরীয় বীরদের’ কথা উল্লেখ করেন।

দক্ষিণ কোরিয়ার কিউংনাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর ফার ইস্টার্ন স্টাডিজের অধ্যাপক লিম উল-চুল মনে করেন, নতুন সেতুটি উত্তর কোরিয়ার ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাগুলোকে ক্রমেই অকার্যকর করে তুলছে।

তার মতে, উত্তর কোরিয়া নিজেদের স্বার্থ সর্বোচ্চ পর্যায়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে, আর রাশিয়া এই সেতুর মাধ্যমে সরাসরি সড়কপথে সামরিক সরঞ্জাম, গোলাবারুদ ও জনবল এমনকি সেনাসদস্যদেরও দীর্ঘস্থায়ী ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য পরিবহনের সুযোগ পাচ্ছে।

আরও খবর

Sponsered content