সারাদেশ

নেত্রকোনার পাহাড়ি অঞ্চলে বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট: দূষিত ভারতীয় ঝর্ণার পানিই একমাত্র ভরসা গারো আদিবাসীসহ লক্ষাধিক মানুষের

  সোহেল খান দূর্জয়, নেত্রকোনা ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ , ৭:৪৪:২১ প্রিন্ট সংস্করণ

নেত্রকোনার সীমান্তবর্তী পাহাড়ি জনপদে বিশুদ্ধ পানির সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। পাহাড়ি ঝর্ণা বা ছড়ার পানি পান করেই বছরের পর বছর জীবনধারণ করছেন দুর্গাপুরকলমাকান্দা উপজেলার গারো আদিবাসীসহ লক্ষাধিক মানুষ। ভারত থেকে প্রবাহিত দূষিত ছড়া ও ঝরনার পানিই এখানকার মানুষের একমাত্র ভরসা, যা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, সীমান্ত এলাকার পাহাড়ি জনগোষ্ঠী দীর্ঘ পথ হেঁটে ভারতীয় ছড়ার ধারে ছোট ছোট কোয়া তৈরি করে পানির ব্যবস্থা করছেন। চলতি বছরে সুপেয় পানির সংকট আরও তীব্র হওয়ায় পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করেছে।

বিশুদ্ধ পানির অভাবে এলাকাজুড়ে টাইফয়েড, ডায়রিয়া, চর্মরোগসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীরা জানান, বছরের বিভিন্ন সময়ে পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত রোগীদের হাসপাতালে ভিড় বেড়ে যায়। শিশু ও বৃদ্ধরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

আরাপাড়া এলাকার গারো যুবক বিনোদ সাংমা বলেন,“সীমান্ত এলাকায় কয়েকটা কোয়া বানানো হয়েছে, কিন্তু সেগুলো সারাতে কেউ আসে না। কয়েক বছর পর একবার দেখে চলে যায়। আমাদের দিনে দুই থেকে তিন কিলোমিটার হেঁটে পানি আনতে হয়। এইভাবে আর কতদিন চলবে?”

বিশুদ্ধ পানি সরবরাহে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর বিশেষ ব্যবস্থায় পাহাড়ি এলাকায় কোয়া তৈরি করে রিং বসিয়ে টিউবওয়েল স্থাপনের প্রকল্প গ্রহণ করে। তবে বরাদ্দ অপ্রতুল হওয়ায় তা সীমিত পরিসরে বাস্তবায়িত হয়েছে। যেখানে প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে, সেগুলোর অনেকগুলোই রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অচল হয়ে পড়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্প বাস্তবায়নে রাজনৈতিক বিবেচনা প্রাধান্য পাওয়ায় প্রকৃত দরিদ্র ও দুর্গম এলাকার মানুষ বঞ্চিত হচ্ছে। বিজয়পুর, রংছাতি, পাঁচগাঁও, কুল্লাগড়া, বিপিনগঞ্জসহ অর্ধশত গ্রামের মানুষের একমাত্র ভরসা এখনো ভারতীয় দূষিত পানি।

এলাকাবাসী জানান, এসব পাহাড়ি অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তরে রয়েছে শক্ত পাথর। ফলে গভীর নলকূপ বা সাবমার্সেবল স্থাপন অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এ কারণে কোয়া ও ঝর্ণার পানির ওপরই নির্ভরশীল থাকতে হচ্ছে স্থানীয়দের।

দুর্গাপুর উপজেলা জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা জানান, “পাহাড়ি এলাকায় গভীর নলকূপ স্থাপনে ডায়মন্ড কাটার মেশিন প্রয়োজন। সরকারিভাবে এই মেশিন সরবরাহ করা হলে ভবিষ্যতে বিশুদ্ধ পানির সংকট অনেকটাই কমানো সম্ভব।”

এ বিষয়ে নেত্রকোনা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর–এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নায়েব আলী খান বলেন, “বিশুদ্ধ পানি মানুষের মৌলিক অধিকার। গারো আদিবাসীসহ দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষ বছরের পর বছর এই অধিকার থেকে বঞ্চিত। এটি শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, পুরো সমাজের নৈতিক দায়।”

স্থানীয়রা অবিলম্বে কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পানি সরবরাহ প্রকল্প গ্রহণ, অচল কোয়াগুলোর সংস্কার এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত বরাদ্দ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। তা না হলে সীমান্তের এই পাহাড়ি জনপদে পানিবাহিত রোগ ও মানবিক সংকট আরও ভয়াবহ আকার নেবে বলে আশঙ্কা তাদের।

আরও খবর

Sponsered content