সারাদেশ

নেত্রকোনার সীমান্তে থামছে না চোরাচালান, রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার

  সোহেল খান দূর্জয়, নেত্রকোনা : ২৪ জানুয়ারি ২০২৬ , ২:০০:৪৫ প্রিন্ট সংস্করণ


নেত্রকোনার সীমান্ত এলাকাগুলোতে কিছুতেই থামছে না নিষিদ্ধ চোরাচালান। প্রতিদিন জেলার দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা উপজেলার সীমান্তের অন্তত ২৫টি পয়েন্ট দিয়ে ঢুকছে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মাদক, ভারতীয় গরুসহ নানা পণ্যসামগ্রী। এতে সরকার হারাচ্ছে বিপুল রাজস্ব। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, চোরাচালানের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত রয়েছেন জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন, বিজিবি ও রাজস্ব বিভাগের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, জেলার কলমাকান্দা সীমান্তের পাঁচগাঁও, মোহনপুরসহ বিজিবির আওতাধীন বিভিন্ন এলাকা দিয়ে প্রতিদিনই পাচার হচ্ছে অসংখ্য ভারতীয় গরু ও পণ্য। গরুগুলো স্থানীয় প্রশাসনের চোখের সামনেই জেলার সবচেয়ে বড় গরুর বাজার বারহাট্টার নৈহাটিতে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে সেখানে নামমাত্র বৈধতা নিয়ে ট্রাকভর্তি করে রাজশাহী, চট্টগ্রাম, সিরাজগঞ্জ ও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয়। স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন ধরেই এমন চোরাচালান চলে আসছে।

এদিকে এলাকায় তেমন কর্মসংস্থান না থাকায় অনেকেই জড়িয়ে পড়ছেন এই অবৈধ ব্যবসায়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি গরু আমদানি হয় ৩১ বিজিবির আওতাধীন সুনামগঞ্জের মহেষখোলা ও টেকের ঘাট পয়েন্ট দিয়ে। প্রতি সপ্তাহে অন্তত সহস্রাধিক গরু কিনে আনেন এখানকার চোরাকারবারিরা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ব্যবসায়ী জানান, স্থানীয় বিজিবি, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও প্রশাসনকে ‘ম্যানেজ’ করেই চলে চোরাচালান। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী আদিবাসী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের ভারতের সঙ্গে আনাগোনা অনেক পুরোনো। মাতৃতান্ত্রিক সমাজের নারীরা প্রতিদিন সকালে দেশীয় নানা পণ্য নিয়ে পাহাড়ের চূড়ায় যান। দিনভর পাহাড়ের পাদদেশে মেঘালয়ের বিভিন্ন স্থানে কেনাবেচা হয় ভারতীয় পণ্যসামগ্রীর। বিকেলে ও রাতে বস্তাভর্তি জিরা, চিনি, বডি স্প্রে, মধু, শাড়ি, লুঙ্গি, শিশুদের নামি-দামি পোশাক, ফেনসিডিল ও বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মদ আনা হয়। পরে এসব পণ্য স্থানীয় সিন্ডিকেট কিনে নিয়ে দেশের বিভিন্ন অভিজাত হোটেল ও মার্কেটে বিক্রি করে।

স্থানীয়দের দাবি, চোরাচালানে সরাসরি সহায়তা করছে বিজিবি ও বিএসএফ কর্তৃক নিযুক্ত লাইনম্যানরা। তবে লাইনম্যান ছাড়া অন্য কোনো মাধ্যমে অবৈধ মালামাল আনা হলে তা বিজিবির কাছে ধরিয়ে দেওয়া হয় বলে জানান চোরাচালানে জড়িত অনেকে। সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে সিংহভাগ মালামাল পাচার হলেও ধরা পড়া কিছু চালান নিলাম করে জেলার রাজস্ব কর্মকর্তারা। সেখানেও রয়েছে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ।

অন্যদিকে চলতি মাসের ২০ জানুয়ারি মঙ্গলবার জেলার দুর্গাপুর সীমান্তে অভিযান চালিয়ে মালিকবিহীন অবস্থায় ভারতীয় মদ ও নিষিদ্ধ ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেট উদ্ধার করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (৩১ বিজিবি)। ওই দিন দুপুর সোয়া ১টার দিকে দুর্গাপুর উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের পার্শ্ববর্তী ভারতের সীমান্তসংলগ্ন এলাকা থেকে এসব মাদকদ্রব্য জব্দ করা হয়। বিজিবি সূত্রে জানা যায়, নিজস্ব গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে নেত্রকোনা ব্যাটালিয়নের (৩১ বিজিবি) অন্তর্গত ভারতপুর বিওপির চার সদস্যের একটি বিশেষ টহল দল অভিযান চালায়। সীমান্ত মেইন পিলার ১১৬৮/৪-এস থেকে প্রায় আড়াইশ গজ বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে তিন বোতল ভারতীয় ‘কিংফিশার’ ব্র্যান্ডের মদ ও ৮০ পিস ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়।

এছাড়া ২১ জানুয়ারি বুধবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কলমাকান্দা উপজেলার রংছাতি ইউনিয়নের পাতলাবন এলাকা থেকে মালিকবিহীন অবস্থায় আরও ১৬ বোতল ভারতীয় মদ উদ্ধার করে ৩১ বিজিবি। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বরুয়াকোনা বিওপির ছয় সদস্যের একটি বিশেষ টহল দল এ অভিযান চালায়। সীমান্ত মেইন পিলার ১১৮১ থেকে আনুমানিক তিনশ গজ বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পাতলাবন এলাকায় অবস্থান নিলে বিজিবির উপস্থিতি টের পেয়ে চোরাকারবারিরা পালিয়ে যায়। পরে সেখান থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ১৬ বোতল মদ উদ্ধার করা হয়।

নেত্রকোনা ব্যাটালিয়নের (৩১ বিজিবি) অধিনায়ক লে. কর্নেল তৌহিদুল বারী (পিএসসি) ২০ ও ২১ জানুয়ারির অভিযানের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। সরেজমিনে আরও জানা যায়, মূলত মাদক ছাড়া ভারতীয় অন্যসব মালামাল বৈধতা দেওয়ার জন্যই ধরিয়ে দেওয়া হয়। পরে সেগুলো নিলামে কিনে নেন সংশ্লিষ্ট চোরাচালানীরা। অল্প কিছু মালামালের বৈধতা দেখিয়ে পাচার হচ্ছে প্রায় কোটি টাকার পণ্যসামগ্রী—এমন অভিযোগ স্থানীয়দের।

আরও খবর

Sponsered content