প্রতিনিধি ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ , ৭:৪৪:২৯ প্রিন্ট সংস্করণ
লোহিতসাগরের দক্ষিণ প্রবেশপথের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা। এ ছাড়া তারা প্রণালির মধ্যবর্তী গুরুত্বপূর্ণ মায়ুন বা পেরিম দ্বীপ এবং উপকূলীয় শহর মোখা দখল করেছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে হুথিদের প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এতে বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকরা।
আজ শুক্রবার মার্কিন বার্তা সংস্থা এপি ও রয়টার্সের প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী পিছু হটার পর হুথি যোদ্ধারা মায়ুন দ্বীপ ও লোহিতসাগর উপকূলের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে অবস্থান নিয়েছে। এর আগে গতকাল বৃহস্পতিবার তারা কৌশলগত বন্দরনগরী মোখার নিয়ন্ত্রণ নেয়।
মায়ুন দ্বীপটি বাব আল-মান্দেবের মাঝামাঝি অবস্থিত। দ্বীপটির নিয়ন্ত্রণ প্রণালির নৌ চলাচল পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এপি জানিয়েছে, ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের একজন জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা এবং একজন হুথি কর্মকর্তা মায়ুন দখলের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
গত সপ্তাহ থেকে সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে বড় ধরনের অভিযান শুরু করে হুথিরা। কয়েক দিনের তীব্র লড়াইয়ের পর তারা লোহিতসাগর উপকূলের বিস্তীর্ণ এলাকা এবং মোখার নিয়ন্ত্রণ নেয়। এরপর তারা বাব আল-মান্দেবের আরও কাছাকাছি পৌঁছে যায়।
হুথিদের অগ্রযাত্রার মধ্যে সৌদি আরব পাল্টা বিমান হামলা চালিয়েছে। হুথি-নিয়ন্ত্রিত একটি সম্প্রচারমাধ্যমের বরাত দিয়ে এপি জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার মোখার বিমানবন্দরে সৌদি বাহিনী হামলা চালায়। তবে তাৎক্ষণিকভাবে হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।
বাব আল-মান্দেব প্রণালি লোহিতসাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এর মাধ্যমে সুয়েজ খাল হয়ে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে পণ্য পরিবহন হয়। ফলে প্রণালিটি বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হুথিদের হামলার কারণে এই পথে জাহাজ চলাচল আগেও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছিল।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বাব আল-মান্দেব সৌদি আরবের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাতের মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল ব্যাপকভাবে ব্যাহত হওয়ায় সৌদি আরবের তেল রপ্তানির বিকল্প পথ হিসেবে লোহিতসাগর ও বাব আল-মান্দেবের গুরুত্ব বেড়েছে।
চ্যাথাম হাউসের গবেষক ফারেয়া আল-মুসলিমি এএফপিকে বলেন, ‘সৌদি আরব যুদ্ধ এড়ানোর সব চেষ্টা করলেও পরিস্থিতি এখন হাতের বাইরে চলে গেছে। হুতিরা সব সীমা অতিক্রম করেছে এবং এখন ব্যবস্থা না নিলে সৌদি আরবকে ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ মূল্য দিতে হবে।’
হুথিদের অগ্রযাত্রার পর আন্তর্জাতিক বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে উঠে ১০৯ ডলার ছাড়ায় এবং ডব্লিউটিআইও ১০০ ডলারের ওপরে ওঠে। তবে এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে শুধু বাব আল-মান্দেবের পরিস্থিতিই নয়, হরমুজ প্রণালির সংকটসহ মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক উত্তেজনাও ভূমিকা রাখছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাব আল-মান্দেবের নিয়ন্ত্রণ হুথিদের হাতে আরও শক্তিশালী হলে বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিও যখন সংঘাতের কারণে কার্যত অচল অবস্থায় রয়েছে, তখন লোহিতসাগরের এই গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথে হুথিদের অগ্রযাত্রা মধ্যপ্রাচ্যের সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে।
এদিকে, ইয়েমেনে নতুন করে তীব্র লড়াই শুরু হওয়ায় ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতি ভেঙে পূর্ণমাত্রার সংঘাত ফিরে আসার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহের লড়াইয়ে ৪৬ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।















