রুকুনুজ্জামান, পার্বতীপুর প্রতিনিধি: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ , ১১:৩২:০৯ প্রিন্ট সংস্করণ
দিনাজপুরের পার্বতীপুরে দেশের একমাত্র ভূগর্ভস্থ কঠিন শিলা খনি মধ্যপাড়ায় দীর্ঘ বিরতির পর আবারও পাথর উত্তোলনে গতি ফিরেছে। বিস্ফোরক সংকটে ৫২ দিন উৎপাদন বন্ধ থাকার পর গত ১১ জুলাই থেকে পুনরায় পাথর উত্তোলন শুরু হয়। উৎপাদন ও বিক্রি বাড়ায় সরকারের রাজস্ব আয়ও বেড়েছে। তবে উৎপাদন স্বাভাবিক হলেও খনিটির দীর্ঘদিনের কয়েকটি সংকট এখনো পুরোপুরি কাটেনি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ১৯ মে অ্যামোনিয়াম নাইট্রেটের মজুত শেষ হয়ে যাওয়ায় মধ্যপাড়া খনিতে পাথর উত্তোলন বন্ধ হয়ে যায়। ভূগর্ভে পাথর কাটার কাজে ব্যবহৃত বিস্ফোরকের সরবরাহ না থাকায় উৎপাদন কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে। প্রয়োজনীয় বিস্ফোরক সরবরাহ পাওয়ার পর দীর্ঘ ৫২ দিন শেষে ১১ জুলাই থেকে আবার পাথর উত্তোলন শুরু হয়।
খনির উৎপাদন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জার্মানিয়া-ট্রেস্ট কনসোর্টিয়াম (জিটিসি)। প্রকাশিত বিভিন্ন তথ্যে দেখা যায়, অতীতেও বিস্ফোরক সরবরাহের সংকটে খনিটির উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। ফলে উৎপাদন অব্যাহত রাখতে বিস্ফোরকের মজুত ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় স্থায়ী সমাধানের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
সর্বশেষ ২৫ আগস্ট প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, মধ্যপাড়া খনিতে জিটিসির পাথর উৎপাদন রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে পাথর বিক্রিও বেড়েছে। ফলে সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। খনি থেকে উত্তোলিত পাথরের বড় অংশ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পে সরবরাহ করা হচ্ছে। জিটিসি প্রতি মাসে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টন পাথর উত্তোলনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ করছে।
মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের ৩ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হওয়া ছয় বছর মেয়াদি চুক্তির আওতায় জিটিসির ১৪টি স্টোপ উন্নয়নের মাধ্যমে ৮৮ লাখ ৬০ হাজার মেট্রিক টন পাথর উৎপাদনের কথা রয়েছে। এর আগে পৃথক চুক্তির অধীনে ৯২ লাখ টন পাথর উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা, বাস্তব উৎপাদন ও চুক্তির আর্থিক কাঠামো নিয়ে অতীতেও নানা প্রশ্ন উঠেছে। ফলে ভবিষ্যৎ উৎপাদন পরিকল্পনা, চুক্তির শর্ত বাস্তবায়ন এবং সরকারি স্বার্থ সংরক্ষণের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।
তবে উৎপাদন বাড়লেও বিক্রি সে অনুপাতে না হলে খনিতে বিপুল পরিমাণ পাথর জমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। চলতি বছরের মার্চে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে খনিতে প্রায় ১৫ লাখ টন অবিক্রীত পাথর মজুত থাকার কথা বলা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে পাথর বিক্রি বাড়ায় সেই চাপ কিছুটা কমেছে বলে সর্বশেষ প্রতিবেদনে ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ফলে উৎপাদনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্থায়ী বাজার নিশ্চিত করাও এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
মধ্যপাড়া খনির আরেকটি বড় সমস্যা পাথর পরিবহন। ভবানীপুর থেকে মধ্যপাড়া পর্যন্ত প্রায় ১৩ কিলোমিটার রেলপথ দীর্ঘদিন অচল থাকায় খনির পাথর মূলত সড়কপথে পরিবহন করতে হচ্ছে। প্রায় ১৫ বছর বন্ধ থাকার পর ভবানীপুর-মধ্যপাড়া রেলপথ সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য প্রায় ১৩৪ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প গ্রহণের খবরও প্রকাশিত হয়েছে।
রেলপথটি পুনরায় চালু করা গেলে একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ পাথর পরিবহন সম্ভব হবে। এতে পরিবহন ব্যয় কমার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মধ্যপাড়ার পাথর সরবরাহ সহজ হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
এদিকে খনির ঠিকাদারি চুক্তির আর্থিক কাঠামোতেও বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার প্রভাব ফেলছে। প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়েছে, চুক্তির সময় ডলারের বিনিময় হার ছিল প্রায় ৮৫ টাকা। পরবর্তী সময়ে তা বেড়ে প্রায় ১২২ টাকায় পৌঁছায়। এতে ঠিকাদারের বিল পরিশোধে বাড়তি অর্থের প্রয়োজন হয়েছে এবং খনির আর্থিক ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে মধ্যপাড়া খনিতে উৎপাদন সচল হওয়া এবং পাথর বিক্রি বাড়া ইতিবাচক দিক। তবে দীর্ঘমেয়াদে খনিটিকে লাভজনক ও টেকসই করতে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। এর মধ্যে রয়েছে অ্যামোনিয়াম নাইট্রেটসহ প্রয়োজনীয় বিস্ফোরকের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা, উৎপাদনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পাথরের বাজার সম্প্রসারণ এবং অবিক্রীত পাথরের মজুত কমানো। একই সঙ্গে ভবানীপুর-মধ্যপাড়া রেলপথ দ্রুত সংস্কার করে রেলযোগে পাথর পরিবহন চালু করাও জরুরি।
দেশের একমাত্র ভূগর্ভস্থ কঠিন শিলা খনি হিসেবে মধ্যপাড়ার কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে। উৎপাদন ও পাথর বিক্রি বাড়ার ফলে সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধির সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। তবে বিস্ফোরক সরবরাহ বা পরিবহন সংকটের কারণে আবারও উৎপাদন ব্যাহত হলে এ সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই শুধু উৎপাদন বাড়ানো নয়, নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন, নিশ্চিত বাজার, কম খরচে পরিবহন এবং চুক্তির স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনাই মধ্যপাড়া কঠিন শিলা খনির টেকসই ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।





















