নওগাঁ প্রতিনিধি ১৮ আগস্ট ২০২৬ , ১২:২০:৫৬ প্রিন্ট সংস্করণ
দরিদ্র মানুষের ৪০ দিনের কর্মসংস্থান এবং স্থানীয় কৃষকদের সেচ সুবিধা বাড়ানোর লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছিল ১ কোটি ৮ লাখ টাকার সরকারি প্রকল্প। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী কোদাল-ঝুড়ি হাতে অন্তত ২৫০ জন অতিদরিদ্র দিনমজুরের মাঠে কাজ করার কথা থাকলেও বাস্তবে খালের পাড়ে শ্রমিকের উপস্থিতি দেখা যায়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, এক্সকাভেটর (ভেকু) দিয়ে দায়সারাভাবে খাল পুনঃখনন করে কাগজে-কলমে প্রায় ১০ হাজার শ্রমিকের উপস্থিতি দেখিয়ে শ্রমিক মজুরির প্রায় ৫০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।
নওগাঁর মান্দা উপজেলায় ইজিপিপির আওতায় ৩ দশমিক ৬ কিলোমিটার খাল পুনঃখননে এমন অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পের আওতায় কুসুম্বা ইউনিয়নের হারকিশোর মৌজার বিল উথরাইল ব্রিজ থেকে বাদলঘাটা ব্রিজ পর্যন্ত ১ দশমিক ৫ কিলোমিটার এবং ভারশোঁ ইউনিয়নের বাঁকাপুর মৌজার দফাদার মোড় মেইন রোড থেকে বিল উথরাইল পর্যন্ত ২ দশমিক ১ কিলোমিটার খাল পুনঃখনন করা হয়।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ৪০ দিন মেয়াদি এ প্রকল্পে মোট বরাদ্দ ছিল ১ কোটি ৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে ২৫০ জন শ্রমিকের দৈনিক ৫০০ টাকা মজুরি বাবদ ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়। বাকি অর্থ ভেকু পরিচালনা, গাছ লাগানো ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজে ব্যয়ের কথা।
হারকিশোর মৌজার খাল পুনঃখননে বরাদ্দ ছিল ৫৪ লাখ ১১ হাজার ৪৮০ টাকা। এর বিপরীতে ৫৪ লাখ ১ হাজার ১৫৩ টাকা ব্যয় দেখিয়ে মাত্র ১০ হাজার ৩২৭ টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে বাঁকাপুর মৌজার খাল পুনঃখননে ৫৪ লাখ ৬২ হাজার ৯৭৭ টাকা বরাদ্দের বিপরীতে ৫৪ লাখ ৪২ হাজার ৭৭৩ টাকা ব্যয় দেখিয়ে ৩০ হাজার ৫৩১ টাকা ফেরত দেওয়া হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি নথিতে কাজ যথাযথভাবে সম্পন্ন দেখানো হলেও বাস্তবে দুই খালেই দায়সারা কাজ করা হয়েছে। প্রকল্প এলাকায় ঘুরে বাঁকাপুর গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা মোখলেসুর রহমান দেওয়ান বলেন, ‘এই পথ দিয়েই প্রতিদিন যাতায়াত করি। প্রকল্পের কাজের এক মাসের বেশি সময়ে এক দিনের জন্যও কোনো দিনমজুরকে কোদাল হাতে কাজ করতে দেখিনি। ভেকু দিয়ে তড়িঘড়ি মাটি ছেঁটে পুরো টাকা পকেটে ভরেছে তারা।’
অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের নিয়ম না মেনে এবং কোনো ধরনের জমি অধিগ্রহণ ছাড়াই কৃষকদের ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির ওপর দিয়ে এক্সকাভেটর চালানো হয়েছে। ভুক্তভোগী প্রীতি রানী বলেন, তাঁর শেষ সম্বল ৫৩ শতক জমি জোর করে খালের মধ্যে নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করেও প্রতিকার পাননি বলে দাবি তাঁর।
সরকারি নকশা অনুযায়ী খালের গভীরতা ১০ ফুট, তলদেশ ১২ ফুট এবং প্রস্থ ৩০ ফুট করার কথা। তবে সরেজমিনে অনেক স্থানে খালের তলদেশ ও পার্শ্ববর্তী ফসলি জমির উচ্চতা প্রায় সমান দেখা গেছে বলে স্থানীয়দের দাবি। কৃষক আনোয়ার হোসেনের আশঙ্কা, কার্যকর পানি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা না থাকায় বর্ষায় আশপাশের বিস্তীর্ণ কৃষিজমিতে জলাবদ্ধতা দেখা দিতে পারে।
এদিকে প্রকল্পের শ্রমিক তালিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অনুসন্ধানে স্থানীয়দের মধ্যে সচ্ছল কৃষক, মুদি দোকানদার, প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের নাম অতিদরিদ্র শ্রমিকের তালিকায় থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন অফিস সূত্রে জানা গেছে, নওগাঁ জেলার ১০টি উপজেলায় (সাপাহার বাদে) ১৩টি খাল পুনঃখননের জন্য মোট ৮ কোটি ৭০ লাখ ৩৯ হাজার ৩৯৭ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর মধ্যে প্রকৃত ব্যয় হয়েছে ৭ কোটি ৩০ লাখ ৮৪ হাজার ৪১৫ টাকা। অন্যান্য উপজেলায় অব্যয়িত অর্থের উল্লেখযোগ্য অংশ সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়া হলেও মান্দায় ফেরত দেওয়া হয়েছে মাত্র ৩০ হাজার ৫০০ টাকা।
অভিযোগ রয়েছে, মান্দা উপজেলা পিআইও মো. আরিফুল ইসলাম ৪০ দিনের প্রকল্পে ১০ হাজার শ্রমিকের মধ্যে ৯ হাজার ৯৩৯ জনকে উপস্থিত দেখিয়ে শ্রমিক মজুরির প্রায় পুরো অর্থ ব্যয় দেখিয়েছেন। মাত্র ৬১ জন শ্রমিক অনুপস্থিত দেখিয়ে ৩০ হাজার ৫০০ টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে।
প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) সভাপতি ছিলেন কুসুম্বা ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা নওফেল আলী মন্ডল। তাঁর বিরুদ্ধে পাশের ভারশোঁ ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক আওয়ামী লীগ মনোনীত চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান সুমনের সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগও তুলেছেন স্থানীয়রা।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে পিআইসি সভাপতি নওফেল আলী মন্ডল বলেন, ‘২৫০ জন শ্রমিকের তালিকা সম্পূর্ণ সঠিক। প্রতিদিন দুই-একজন ছাড়া সবাই উপস্থিত থেকে কাজ করেছেন। সচ্ছল ব্যক্তির নাম হয়তো ভুলবশত এসেছে। আমরা পিআইওর নির্দেশনা অনুসারেই কাজ শেষ করেছি।’
পিআইও মো. আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘অন্যান্য উপজেলা হয়তো সঠিকভাবে কাজ করাতে পারেনি বা শ্রমিক উপস্থিত করতে পারেনি, তাই তাদের বেশি টাকা বেঁচে গেছে এবং তারা ফেরত দিয়েছে। কিন্তু মান্দায় আমরা শতভাগ কাজের মান ও শতভাগ হতদরিদ্র শ্রমিকের উপস্থিতি নিশ্চিত করেছি, তাই টাকা কম ফেরত গেছে।’
মান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বলেন, খাল পুনঃখনন প্রকল্পে কোনো ধরনের অনিয়ম বা ভুয়া শ্রমিক দেখিয়ে অর্থ আত্মসাতের সুযোগ নেই। লিখিত বা সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয় সচেতন মহল ও ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা প্রকল্পের অর্থ ব্যয়, শ্রমিক তালিকা ও মাঠপর্যায়ের কাজের পরিমাণ যাচাই করে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের দাবি, সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ প্রমাণিত হলে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।















