সারাদেশ

মান্দায় মাদ্রাসা-এতিমখানার জমি দখল ও পুকুর খননের অভিযোগ

  নওগাঁ প্রতিনিধি: ১১ আগস্ট ২০২৬ , ১:০৯:১৭ প্রিন্ট সংস্করণ

নওগাঁর মান্দা উপজেলার দক্ষিণ শ্রীরামপুর আইজান বেওয়া নূরানী হাফেজিয়া লিল্লাহ বোর্ডিং মাদ্রাসা ও এতিমখানার প্রায় সাড়ে তিন বিঘা জমি দখল, ধানি জমি কেটে পুকুর খনন, গভীর নলকূপ (এসটিডব্লিউ) স্থাপন এবং কোটি টাকার সম্পত্তি আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় একটি প্রভাবশালী মহল ও সাবেক পরিচালনা কমিটির কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগে প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত আবেদন এবং আদালতে একাধিক মামলা হলেও দীর্ঘদিনেও কার্যকর প্রতিকার মেলেনি বলে দাবি করেছে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ।

সরেজমিনে দেখা যায়, মাদ্রাসার নামে থাকা ধানি জমির একটি বড় অংশ এক্সকাভেটর দিয়ে কেটে পুকুর খনন করা হয়েছে। অন্য একটি জমিতে স্থাপন করা হয়েছে গভীর নলকূপ (এসটিডব্লিউ)। স্থানীয়দের অভিযোগ, নলকূপটিও বর্তমানে দখলদারদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এ নিয়ে মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসীর মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে।

মাদ্রাসা সূত্রে জানা যায়, ১৯৭৮ সালে এলাকার দুই দানশীল নারী আইজান বেওয়া ও রহিমন বেওয়া গোবিন্দপুর মৌজার হাল ৪০১ নম্বর খতিয়ানের অধীনে প্রায় সাড়ে তিন বিঘা জমি দানপত্রের মাধ্যমে মাদ্রাসার নামে হস্তান্তর করেন। দীর্ঘদিন ধরে ওই জমি চাষাবাদ করে পাওয়া অর্থ এতিম ও লিল্লাহ বোর্ডিংয়ের শিক্ষার্থীদের ভরণপোষণ এবং প্রতিষ্ঠানের ব্যয় নির্বাহে ব্যবহার করা হতো।

অভিযোগ রয়েছে, ২০২১ সালে তৎকালীন পরিচালনা কমিটির প্রচার সম্পাদক আব্দুল মালেক আকন্দ বছরে ৭০ হাজার টাকায় জমিটি লিজ নেন। পরে তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আলহাজ জাহাঙ্গীর আলম প্রভাব খাটিয়ে লিজের মূল কাগজপত্র নিজের কাছে নিয়ে নেন এবং কমিটির অনুমোদন ছাড়াই জমিটি স্থানীয় ইটভাটা ব্যবসায়ী নাজমুল হক মিলনের কাছে হস্তান্তর করেন বলে দাবি বর্তমান কমিটির।

মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের আরও অভিযোগ, ভূমি অফিসের কিছু কর্মচারীর যোগসাজশে প্রকৃত তথ্য গোপন করে নাজমুল হক মিলন জমিটি নিজের নামে নামজারি করে নেন। পরে তিনি ওই জমি এক যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসীর কাছে বিক্রি করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

২০২৪ সালের মে মাসে ওই প্রবাসীর ভাড়াটে লোকজন জমির পাকা ধান কাটতে গেলে এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ মোতায়েন করা হয়। এ ঘটনায় আব্দুল মালেক আকন্দ আদালতে মামলা করেন।

পরে নবগঠিত পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক রবিউল ইসলাম সুজা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে নামজারি বাতিলের আবেদন করেন। শুনানিতে বিবাদীপক্ষ উপস্থিত না থাকায় তৎকালীন সহকারী কমিশনার (ভূমি) একতরফা আদেশে বিষয়টি পুনঃতদন্তের নির্দেশ দেন। তবে ওই তদন্ত এখনো শেষ হয়নি বলে জানিয়েছে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ।

বর্তমান কমিটির দাবি, এ সুযোগে দখলদাররা জমির শ্রেণি পরিবর্তন করেছেন। ৪০১ নম্বর খতিয়ানের ১৩৪৪ নম্বর দাগের ধানি জমি কেটে পুকুর খনন এবং ৪০২ নম্বর খতিয়ানের ১২৯৩ নম্বর দাগে এসটিডব্লিউ স্থাপন করা হয়েছে। এতে জমির বর্তমান অবস্থা পরিবর্তিত হওয়ায় ভবিষ্যতে আইনি জটিলতা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ।

এদিকে জমি নিয়ে বিরোধের জেরে একের পর এক মামলা-মোকদ্দমায় মাদ্রাসার স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে। মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, প্রতিপক্ষের আলতাফ হোসেন বিভিন্ন সময়ে পরস্পরবিরোধী দাবি তুলে মামলা করেছেন। কখনো জমিটি ক্রয়সূত্রে নিজের বলে দাবি করেছেন, আবার অন্য মামলায় ওয়ারিশসূত্রে পাওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন।

মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক রবিউল ইসলাম সুজা ও প্রচার সম্পাদক আব্দুল মালেক আকন্দ বলেন, “এটি এতিম শিশুদের সম্পত্তি। আমরা আইনের আশ্রয় নিয়েছি, কিন্তু কার্যকর প্রতিকার পাচ্ছি না। চলতি মৌসুমে জমিতে ধান তুলতে গেলেও প্রতিপক্ষের লোকজন প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছে।”

অভিযুক্ত নাজমুল হক মিলনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

তবে আলতাফ হোসেন অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “উল্লেখিত দাগে মাদ্রাসার কোনো জমি আছে কি না, তা আমাদের জানা নেই। বৈধ কাগজপত্র দেখাতে পারলে আমরা জমি ছেড়ে দেব।”

মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সভাপতি রাশেদ ইকবাল বলেন, “বিগত কমিটির সময়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করে এই সম্পত্তি হস্তান্তরের ঘটনা ঘটেছে। বর্তমানে আদালতে একাধিক মামলা চলমান। আমরা এতিমখানার জমি উদ্ধার এবং দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা চাই।”

মান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খোরশেদ আলম বলেন, “লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, দীর্ঘদিনের এ বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তি না হলে মাদ্রাসা ও এতিমখানার অবশিষ্ট সম্পত্তিও দখলের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তারা বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ভূমি প্রশাসন ও জেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

আরও খবর

Sponsered content