হামিদুল ইসলাম , মেহেরপুর জেলা প্রতিনিধিঃ ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫ , ৫:০৯:২৫ প্রিন্ট সংস্করণ
যার জীবন আছে, তার মৃত্যু অনিবার্য। মৃত্যুর এ অবধারিত পরিণতিতে একজন মানুষের শেষ ঠিকানা হয় কবর। মৃতদেহ গোসল করিয়ে কাফন পরানো হয়, জানাজা শেষে চিরদিনের জন্য তাকে শুইয়ে দেওয়া হয় কবরে। আর এই শেষ ঠিকানাটি প্রস্তুত করতে যাঁরা নিঃস্বার্থভাবে এগিয়ে আসেন, তারাই গোরখোদক—নীরব মানবতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার দেবীপুর গ্রামে কয়েকজন গোরখোদক কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই মৃত ব্যক্তির কবর খোঁড়ার কাজে ব্যস্ত। মৃত্যুর সংবাদ পেলেই নিজেদের কাজ ফেলে দ্রুত ছুটে আসেন তারা। এ কাজকে তারা দায়িত্ব নয়, বরং ইবাদত হিসেবেই গ্রহণ করেছেন।
স্থানীয়রা জানান, গ্রামের যাঁরা কবর খোঁড়ার দায়িত্ব পালন করেন, তারা স্বেচ্ছায় এই দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। নিজেদের কাজ যতই জরুরি হোক না কেন, গ্রামে কেউ মারা গেলে তারা সব ছেড়ে কবর খোঁড়ার কাজে নেমে পড়েন। বিনিময়ে কখনো কোনো অর্থ গ্রহণ করেন না। এই মহৎ কাজের জন্য এলাকাবাসী তাদের সুস্থতা ও দীর্ঘায়ুর জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করেন।
গোরখোদক মজিরুল ইসলাম বলেন, “আমি প্রায় ৫৫ বছর ধরে কবর খোঁড়ার কাজ করছি। যতদিন সুস্থ থাকবো, ততদিন এ কাজ চালিয়ে যাব। শুধু আমাদের গ্রাম নয়, অন্য গ্রাম থেকেও ডাক এলে সেখানেও যাই। ওস্তাদের কাছে ডালি ধরা থেকেই এ কাজ শিখেছি। আমি গরিব মানুষ, কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করি। তারপরও কেউ মারা গেলে এক মুহূর্ত দেরি না করে কবর খোঁড়ার কাজে চলে আসি। এটা এখন আমার নেশায় পরিণত হয়েছে। নতুন প্রজন্মকেও শেখানোর চেষ্টা করছি, যেন তারা ভবিষ্যতে এই কাজ করে যেতে পারে।”
গোরখোদক শাকের আলী বলেন, “আমরা সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থভাবে এই কাজ করি। কোনো টাকা-পয়সা নেই। নিজেদের কাজ থাকলেও মৃত্যুর খবর পেলেই সব ছেড়ে কবর খোঁড়তে চলে আসি।”
আরেক গোরখোদক ফুয়াদ হোসেন বলেন, “অন্য গ্রাম থেকেও ডাক এলে আমরা যাব। এই কাজের জন্য কখনো পারিশ্রমিক নেই না। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই কবর খুঁড়ি। সবাই আমাদের জন্য দোয়া করবেন, যেন সুস্থ থেকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এই কাজটা করতে পারি।”
স্থানীয় বাসিন্দা মো. শাজাহান আলী বলেন,“আমাদের গ্রামের গোরখোদকরা যেখানে থাকুন না কেন, কেউ মারা গেলে সঙ্গে সঙ্গে ছুটে আসেন। কবর খোঁড়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও দায়িত্বশীল কাজ। আমরা সবাই তাদের জন্য দোয়া করি।”
এ বিষয়ে মাওলানা মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, “মৃত ব্যক্তির জন্য কবর খোঁড়া নিঃসন্দেহে একটি মহৎ আমল। হাদিসে রয়েছে—‘যারা কবর খোঁড়ার কাজ করে, আল্লাহ তায়ালা তাদের জন্য জান্নাতে একটি ঘর নির্মাণ করবেন।’ আমরা দোয়া করি, যারা এই কাজ করেন আল্লাহ তাদের সুস্থ রাখুন।”
নীরবে, নিভৃতে, বিনা পারিশ্রমিকে আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় কবর খুঁড়ে যাচ্ছেন দেবীপুর গ্রামের এই মানুষগুলো। মানবতার শেষ যাত্রায় তাদের অবদান নিঃসন্দেহে সমাজের জন্য এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।




















